শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

‘প্লিজ, আপনি জেগে ওঠুন ঐশ্বরিকভাবে, অলৌকিক শক্তিতে’

| প্রকাশিতঃ ২৩ ডিসেম্বর ২০২০ | ১০:৪৯ পূর্বাহ্ন


জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : নগরের আলকরণ ওয়ার্ড থেকে ১৯৯৪, ২০০০, ২০০৫ ও ২০১৫ সালে বিপুল ভোটে কমিশনার নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের কাণ্ডারি, নেতা বানানোর কারিগর হিসেবে পরিচিত তারেক সোলেমান সেলিম। সেই তিনিই ২০২০ সালের ২৬ মার্চ স্থগিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাননি। মনোনয়ন দানের দায়িত্বে থাকা ‘নেতাবিশেষের’ পছন্দ-অপছন্দের কারণে সৎ, ত্যাগী, নির্মোহ, নির্লোভ স্বভাবের তারেক সোলেমান সেলিম ছিটকে পড়েন। এমপি কিংবা তারও বেশি কিছুর জন্য যোগ্য-উপযুক্ত সেলিমের এই বঞ্চনা ‘টক অব দ্যা সিটি’তে পরিণত হয়েছিল তখন। তারেক সোলেমান সেলিমের মতো ইস্পাত-কঠিন আদর্শিক নেতার প্রতি যদি এমন অবনমন-অবিচার হয়, তাহলে দলের তৃণমূলশক্তি পথ হারাবে, আর তা হবে তৃণমূল শক্তির উপর টিকে থাকা আওয়ামী লীগের জন্য দুঃসংবাদ।

তাই আলকরণবাসী শুধু নয়, চট্টগ্রামের রাজনীতি-সচেতনরাও সেলিমের এই অবনমন মানতে পারেননি। তাই সবাই একাট্টা হয়েছিলেন, জোট বেঁধেছিলেন ‘জনপ্রতিপ্রতিনিধির সৌন্দর্য’ তারেক সোলেমান সেলিমকে দলীয় প্রার্থীর বিপরীতে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করে অবনমনের প্রতিশোধ নিতে।

সেই লক্ষ্যে চলছিল সবকিছু। গণযোগাযোগ-গণসংযোগে মুখর ছিলেন স্বতন্ত্র কাউন্সিলর প্রার্থী সেলিমও। কিন্তু করোনা মহামারির আচমকা থাবায় স্থগিত হয়ে যায় নির্বাচনী কার্যক্রম। দীর্ঘ ১০ মাস পর আগামি ২৭ জানুয়ারি সেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আবারও সরগরম নগরী, প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ, উৎসমুখরতা। কেবল উৎসব নেই কাউন্সিলর প্রার্থী তারেক সোলেমান সেলিমের ঘরে। আছে বরং কাতরতা, শোক। প্রায় ৭ মাস ধরে মরণব্যাধী বোন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন তিনি। আজকের দিনে যিনিও মুখর থাকতেন নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি আজ অনেকটাই নিস্তেজ, নীরব, নিস্তব্ধ।

তারেক সোলেমান সেলিমের ভাই মো. তারেক ইমতিয়াজ একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন, ‘দেশের বেশ কয়েকটি হাসপাতালে অসুস্থ সেলিমের চিকিৎসা করানো হয়েছে। নিয়মিত কেমো ও রেডিও থেরাপি দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু বোন ক্যান্সার শরীরের অনেকটা অংশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ায় তার অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উন্নত চিকিৎসার জন্য বর্তমানে তিনি কলকাতার টাটা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।’

মো. তারেক ইমতিয়াজ বলেন, ‘ভাইয়ের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক। শরীরের অবস্থা এতটাই খারাপ যে, তাকে আর থেরাপি দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। রাইসটিউব দিয়ে তাকে খাবার দেওয়া হচ্ছে। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানিয়ে দিয়েছেন তার অবস্থার উন্নতি হওয়ার তেমন কোনো সুযোগ নেই। তাই আমরা তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। আপনারা সবাই আমার ভাইয়ের জন্য দোয়া করবেন।’

রাজনৈতিক সচেতন মহলের মতে, পরিবার থেকেই রাজনৈতিক আদর্শের শিক্ষা পেয়েছিলেন তারেক সোলেমান সেলিম। তাঁর পিতা মােহাম্মদ ছালেহ ছিলেন আলকরণ ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ছোটবেলা থেকেই আওয়ামী রাজনীতির সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করা তারেক সোলেমান সেলিম বিভিন্ন চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে শুদ্ধতম রাজজনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়েছিলেন।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর কিশাের বয়সেই বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের দাবিতে রাজপথে নেমে পড়েছিলেন তিনি। স্বৈরচারবিরোধী আন্দোলন ও ১/১১ এর সময় সামনের সারির নেতা ছিলেন।

১৯৭৮ সালে সিটি কলেজে অধ্যায়নরত অবস্থায় আলকরণ ওয়ার্ড ছাত্রলীগের পুনর্গঠন করে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরবর্তীতে সরকারি সিটি কলেজ ও মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সদস্যের দায়িত্বও পান তিনি।

১৯৭৯ সালে নিউ মার্কেট মোড়ে আওয়ামী লীগের মিছিলে হামলা করেছিল সন্ত্রাসীরা। হামলাকারীরা এমএ ওয়াহাব, এমএ মান্নান এবং ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে আটকে রাখে। সেদিন যে ২৫ জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী পাল্টা হামলা করে সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে নেতাদের উদ্ধার করে এনেছিলেন তারেক সোলেমান সেলিম সেই কাফেলার সাহসী বীর।

বিভিন্ন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথের সারথী, অকুতোভয় সেলিম অনেক অত্যাচার, জুলুম, নির্যাতন শিকার হয়েছেন। হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন, কারাবরণ করেছেন বহুবার। ২০০৪ সালে ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদে আন্দোলন করতে গিয়ে সন্ত্রাসদমন আইনে গ্রেফতার হন তিনি। কিন্তু রাজনীতি যার নেশা তাকে কি থামানো যায়? ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় একের পর এক মামলা। একই সময়ে তার উপর একাধিকবার প্রাণঘাতি হামলা চালায় বিএনপি-জামায়াত।

রাজনীতিকে হাতিয়ার করে অনেকেই তৈরি করেছেন প্রাচুর্য ও অর্থের সাম্রাজ্য। সতীর্থরা বলছেন, যেখানে একবার কাউন্সিলরের চেয়ারে বসে আর্থিকভাবে ফুলেফেঁপে উঠেছেন অনেকেই, সেখানে তারেক সোলেমান সেলিমের প্রাপ্তি বলতে শুধু নেতাকর্মীদের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং জনগণের আস্থা। পরিশুদ্ধ রাজনীতিতে বিশ্বাসী তারেক সোলেমান ব্যক্তিগত জীবনে ভীষণরকম সৎ ও নির্ভীক। এজন্যই হয়তো অনেকের মতো সম্পদের পাহাড় গড়তে পারেননি। চার চারবার কাউন্সিলর, মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেছেন দুবার, ছিলেন ডাঁকসাইটে ছাত্রনেতা। তবুও এতটুকুন পরিবর্তন ঘটেনি তার চলাফেরায়, ব্যক্তিজীবনে। তার পৈত্রিক ঘরটা (যে বাড়িতে থাকেন) এখনো স্যাঁতস্যাতে। ড্রয়িং রুমটা বিবর্ণ। চেয়ারগুলো পুরোনো, জীণশীর্ণ। অর্থের জোরে নয়, মেধার জোরেই পড়ালেখা করছেন তার দুই সন্তান।

এমনই আর্থিক টানাপোড়েনে চিকিৎসা চালাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছে, হচ্ছে তাকে। চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করার আকুতি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে খোলা চিঠিও লিখেছেন তারেক সোলেমান। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন-

‘প্রাণপ্রিয় নেত্রী আপনি মাদার অব হিউম্যানিটি। আপনার মমতাময়ী মনের রূপ আজ সারা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। বর্তমানে আমার এই কষ্টদায়ক পরিস্থিতিতে আপনার মমতাময়ী হাত সদয়ভাবে বাড়িয়ে দেবেন এটা আশা করতে পারি। আমার চিকিৎসা চালিয়ে নিতে আপনার সদয় আর্থিক সহযোগিতায় আমাকে বাধিত করবেন।’

কিন্তু অজানা কারণে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আওয়ামী রাজনীতির অলঙ্কার, অহঙ্কার খ্যাত তারেক সোলেমান সেলিমের জীবনরক্ষায় খুব একটা সাড়া মেলেনি। তবে তার চিকিৎসায় শুরু থেকে পাশে ছিলেন চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। তিনি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে বিভিন্ন সময় আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার পাশাপাশি ৫৫ জন কাউন্সিলরের মধ্য থেকে ৪১ জনের একমাসের বেতন বাবদ প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ টাকা নিয়ে দিয়েছিলেন।

তারেক সোলেমান সেলিমের চিকিৎসার জন্য গত ২৯ জুলাই নগদ এক লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয় সিএমপির পক্ষ থেকে। এক লাখ টাকার চিকিৎসা-সহায়তা দিয়েছেন সরকার দলীয় হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর পুত্র, পটিয়া ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন। মূলত এগুলোই তার চিকিৎসায় আর্থিক প্রণোদনা।

বর্তমানে তারেক সোলেমান সেলিমের অবস্থা ভালো নয়। পৃথিবীর সমস্ত অর্থ এক জায়গায় করেও তার জীবনরক্ষা হবে কিনা পুরোপুরি জানেন না ডাক্তাররাও। এরপরও মানুষের কীসের বড়াই, কীসের দাম্ভিকতা, অর্থ-ক্ষমতার মোহে কেন এত ছুটোছুটি? এমন প্রশ্ন রেখে অনেকেই বলছেন, তারেক সোলেমানের মতো নিষ্কলুষ রাজনৈতিক কর্মী, আদর্শিক জনপ্রতিনিধির জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার আছে অনেক কিছুই। সেই সাথে তাদের প্রার্থনা-প্রিয় সেলিম ভাই, প্লিজ জেগে ওঠুন ঐশ্বরিকভাবে, অলৌকিক শক্তির জোরে। রাজনীতির নিষ্পাপ মানুষগুলো এত সহজে ফুরিয়ে যায় না, যেতে পারে না।

একুশে/জেইএস/এটি