
শরীফুল রুকন : নুরুল আমিন (৫০)। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের গুয়াপঞ্চক গ্রামের বাসিন্দা মৃত আলতাফ আলীর ছেলে তিনি। সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১০ টাকা কেজি দরে চাল কেনার কার্ড পেয়েছেন নুরুল আমিন। অথচ তিনি আনোয়ারার স্টার ল্যাব ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক এবং তার দুইটি পাকা দালানও আছে।
এ বিষয়ে জানতে নুরুল আমিনের বাড়িতে গেলে তার স্ত্রী রোখসানা বেগম একুশে পত্রিকাকে জানান, ‘২-৩ বছর ধরে চাল পাচ্ছেন তারা।’ স্বচ্ছল হয়েও গরিবের চাল নেয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ তথ্যটি কে দিয়েছে? যাক সমস্যা নেই। যা ইচ্ছা তা করতে পারবেন, আমরা কিছু বলবো না। এক সময় দিয়েছে, সেটা এখনো আছে আর কি।’ নুরুল আমিনের নাম্বারে বারবার কল দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি।
ভবন ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক নুরুল আমিনকে কার্ড দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বৈরাগ ইউনিয়নের ৫ নং গুয়াপঞ্চক ওয়ার্ডের মেম্বার মো. সোলাইমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ওনার (নুরুল আমিন) আগে কিছু ছিল না। তাই কার্ড দেয়া হয়েছিল। এখন জায়গা-জমি বিক্রি করে এসব করেছে। এখন বাদ দেয়ার সুযোগ থাকলে বাদ দেব।’
শুধু নুরুল আমিন নয়, একই এলাকার মৃত বদিউজ্জামানের ছেলে ও স্থানীয় মেম্বারের খালার স্বামী মো. সোলায়মানও (৫৫) ‘দরিদ্র’ হিসেবে কার্ড পেয়েছেন। যদিও বর্তমানে কেইপিজেডে চাকরি করছেন সোলায়মান; তার দুই ছেলে বিদেশে থাকেন এবং দুই ছেলে দেশে চাকরি করেন। স্বচ্ছল হওয়ার পরও দরিদ্র হিসেবে সরকারি চাল গ্রহণের বিষয়ে জানতে চাইলে সোলায়মান বলেন, ‘মেম্বার চালের কার্ড দিয়েছে, তাই নিচ্ছি। এটা কি অপরাধ? অপরাধ হলে আর নেব না।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে ৫ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সোলাইমান বলেন, ‘৫ বছর আগে তালিকাটা যখন করেছি, তখন তারা (সোলায়মান) গরিব ছিল। এখন সুযোগ থাকলে বাদ দেব।’
খাদ্যবান্ধব নীতিমালা অনুযায়ী, সুবিধাভোগীদের অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্র থাকতে হবে। কিন্তু সাতকানিয়ার নলুয়া ইউনিয়নের সুবিধাভোগী ৪১০ জনের মধ্যে মাত্র ৪৪ জনের জাতীয় পরিচয়পত্র নাম্বার দেয়া হয়েছে তালিকায়। নলুয়ার বাসিন্দা রিকশাচালক আজগর আলী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘২০১৮ সালে আমাকে কার্ড দেয়া হয়েছিল। এরপর ৮ বার চাল পেয়েছি। লকডাউনের সময় ঈদের আগে চাল দিয়েছিল, তখন অসুখের জন্য আমি চাল কিনতে যেতে পারিনি। তখন আমার কার্ড বাতিল করে আরেকজনকে দিয়ে ফেলেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকায় যারা চাল পাচ্ছে তাদের প্রায় সবাই স্বচ্ছল মানুষ, কারও ভবন আছে, কেউ দোকানের মালিক। আমি রিকশা চালিয়ে ভাত খাই, আমারটা কেড়ে নিয়েছে।’
রিকশাচালক আজগর আলী অভিযোগ করে জানান, নলুয়ার ৯ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবুল বশরের তেলের দোকান আছে কেরানিহাটে, ভবনও আছে। অথচ তাকেই চালের কার্ড দেয়া হয়েছে। আবুল কাশেমের স্ত্রী মনোয়ারা বেগমকেও কার্ড দেয়া হয়েছে। অথচ তার স্বামী সৌদিআরবে থাকেন, তাদের পাকা বাড়িও আছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আবুল বশর একুশে পত্রিকাকে জানান, তিনি ১০ টাকা দরে সরকারি চাল কেনেন না। যদিও নলুয়া ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ৯ নং ওয়ার্ডের সুবিধাভোগীর তালিকায় বশরের নাম আছে। এমনকি মনোয়ারার নামও আছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মনোয়ারা বেগম মুঠোফোনে বলেন, ‘পাকা ঘর থাকলেও আমি অভাবে আছি। স্বামী ঠিকমতো টাকা পাঠান না। তাই সরকারি চাল নিচ্ছি।’
এসব বিষয়ে গত ৫ জানুয়ারি জানতে চাইলে নলুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তছলিমা আবছার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘তথ্যগুলো দেয়ার জন্য ধন্যবাদ। আমি এখনই খোঁজ নিচ্ছি।’ পরদিন আবার যোগাযোগ করা হলে চেয়ারম্যান তছলিমা বলেন, ‘বশর ও মনোয়ারার নামে কার্ড আছে বলে জেনেছি। তাদেরকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে ইউপি সেক্রেটারিকে বলেছি।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় চট্টগ্রামের প্রায় ৮০ হাজার দরিদ্র পরিবারকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তারা প্রতি কেজি চাল কিনতে পারছেন ১০ টাকায়। তালিকা অনুযায়ী দরিদ্র ব্যক্তিদের চাল কেনার কার্ড পাওয়ার কথা। কিন্তু যারা কার্ড পেয়েছেন, তাদের মধ্যে অনেক ধনী ব্যক্তি আছেন। এছাড়া ঠিকমতো চাল বিতরণ না করে ডিলার ও জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে আত্মসাৎ করার অভিযোগও উঠেছে। এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে কার্ড কেড়ে নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। চট্টগ্রামের যেসব এলাকায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সুবিধাভোগীর তালিকা যাচাই করা সম্ভব হয়েছে, সেখানেই মিলেছে কোনো না কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি।
জানা গেছে, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রামে সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি শুরু হয়। এ কর্মসূচির আওতায় চট্টগ্রামের ৮০ হাজার (প্রতি ইউনিয়নে গড়ে ৪২১ পরিবার) দরিদ্র পরিবারকে ১০ টাকা কেজি দরে মাসে ৩০ কেজি চাল দেওয়ার কথা। প্রতিবছর মার্চ ও এপ্রিল এবং সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর-এই পাঁচ মাস এ খাদ্যসহায়তা দেওয়া হয়। তবে করোনার কারণে ২০২০ সালে ৬ মাস খাদ্যসহায়তা দেয়া হয়। সে হিসেবে প্রতি বছর একটি পরিবার ১৫০ কেজি চাল কিনতে পারলেও গতবছর কিনতে পারার কথা ১৮০ কেজি।
এজন্য ২০২০-২১ অর্থবছরেও ১০ টাকা কেজি দরে ১২ হাজার লাখ মেট্রিক টন চাল বিতরণের পরিকল্পনা নিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়। এত বরাদ্দের কারণে আশা করা যায় যে গরীব ও স্বল্প আয়ের মানুষেরা এর সুবিধা পাবেন। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তার উল্টোটা ঘটছে। অভিযোগ আছে, স্থানীয় অসাধু জনপ্রতিনিধি ও ডিলারদের যোগসাজশে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল অনেক ক্ষেত্রে গরিবদের দেয়া হচ্ছে না। অভিযোগ উঠলে অথবা নানা কারণে বিভিন্ন সময় পুরনোদের বাদ দিয়ে তালিকায় নতুন নাম যুক্ত করা হয়। কিন্তু অনিয়ম-দুর্নীতি আর দূর হয় না।
এদিকে আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগের গুয়াপঞ্চক গ্রামের বাসিন্দা নুর মোহাম্মদ একুশে পত্রিকাকে বলেছেন, ২০২০ সালের মে মাসে কার্ড পাওয়ার পাশাপাশি ১০ টাকা কেজি দরে ৩০ কেজি চাল কিনেছেন তিনি। এরপর আর চাল কিনতে পারেননি। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে ৩০ কেজি করে আরও ৯০ কেজি চাল কিনতে পারার কথা তার। নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘চাল কেনার জন্য খবর পাইনি। একবার দুপুরে খবর পেয়ে গিয়ে দেখি, চাল শেষ।’ যদিও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি নীতিমালা অনুযায়ী, সপ্তাহের দুই বা তিনদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দোকান খোলা রেখে চাল বিক্রি করতে হবে ডিলারকে।
একই অভিযোগ করে আনোয়ারার বৈরাগের সুবিধাভোগীর তালিকায় ১০৫ নাম্বারে থাকা মো. হাশেম বলেন, ২০২০ সালের মে মাসে কার্ড পেলেও একবারের জন্যও তিনি চাল কিনতে পারেননি। মে মাসে চাল কিনতে গেলে হাশেমকে স্থানীয় ইউপি সদস্য বলেন, আগামীতে দেওয়া হবে। পরে আরও দুইবার চাল দেওয়ার জন্য বলেন হাশেম। এরপর আবার চাল দিতে বললে নতুন করে কার্ড ইস্যুর কথা বলে কার্ডটি কেড়ে নেয়া হয় বলে হাশেম অভিযোগ করেছেন।
চাল না পাওয়ার এসব অভিযোগের বিষয়ে বৈরাগ ইউনিয়নের ডিলার মো. মনিরুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এসব তো আমি মুখস্ত বলতে পারবো না। আমি সব নথিপত্র উপজেলা অফিসে জমা দিয়েছি। কে নিয়েছে, না নিয়েছে সেটা তো আমি এখন বলতে পারবো না।’ সর্বশেষ ২০২০ সালে ৬ মাস কার্ডধারীর কাছে ৩০ কেজি করে ১৮০ কেজি চাল বিক্রি করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
ধনীদের হাতে চালের কার্ড যাওয়া প্রসঙ্গে মনিরুল বলেন, ‘কার্ড দেয়ার দায়িত্ব মেম্বার-চেয়ারম্যানের। এটার দায়ভার আমার উপর নেই। চাল দেয়ার সময় মেম্বার-চেয়ারম্যানরা উপস্থিত থাকেন।’ ধনী ব্যক্তিদের হাতে গরিবের চাল তুলে দেয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বৈরাগ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সোলায়মান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আনোয়ারায় এসব অসংগতি খুঁজে ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্বে থাকা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় আছে নানা সংকটে। সেখানে লোকবল নেই বললেই চলে। খাদ্য পরিদর্শক, উপ-পরিদর্শক, কম্পিউটার অপারেটর, অফিস সহকারী পদ শুন্য। দুইজন নিরাপত্তা প্রহরীকে নিয়ে কাজ করছেন আনোয়ারা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক তপন কুমার বড়ুয়া। এছাড়া সাতকানিয়া উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদেও তাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
জানতে চাইলে আনোয়ারা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক তপন কুমার বড়ুয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি গত বছরের আগস্টে আনোয়ারায় যোগদান করেছি। তখন ধনী ব্যক্তিদের হাতে কার্ড যাওয়ার কিছু অভিযোগ আমি পেয়েছি। ইউএনও স্যারের সাথে পরামর্শ করে ১৫ দিনের মধ্যে বেশকিছু কাজ করেছি, স্বচ্ছলদের বাদ দিয়ে তাৎক্ষণিক গরিব লোকদের প্রতিস্থাপন করেছি। এরপরও কিছু কিছু থাকবে। এক্ষেত্রে আমাকে জানালে অবশ্যই দ্রুত ব্যবস্থা নেব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে, লোকবল কম। দুইজন নিরাপত্তা প্রহরীকে নিয়ে আমি কাজগুলো করি। কিন্তু নিরাপত্তা প্রহরী দিয়ে এত বড় কাজ করা সত্যিই কঠিন। আমি একাই যাই, যতটুকু পারি করছি। আমিও চাই কোনো ধনী ব্যক্তি যাতে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে যুক্ত হতে না পারেন। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমকর্মীসহ সবার সহযোগিতা চাই আমি।’
কার্ড থাকার পরও চাল না দেয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে আনোয়ারার খাদ্য নিয়ন্ত্রক তপন কুমার বড়ুয়া বলেন, ‘দায়িত্ব নেয়ার পর গত সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর তিন মাস আমি চাল বিতরণ করেছি। এ সময়ে কারও কাছ থেকে কোনো অনিয়মের অভিযোগ পাইনি। না পাওয়ার যে অভিযোগ এখন আসছে সেটি আমি দেখবো। ডিলার চাল বিক্রি করেননি, এমনও হতে পারে। তবে প্রমাণ পেলে নীতিমালা অনুযায়ী ডিলারের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’
এদিকে আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নেও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজির চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উপকারভোগীদের অভিযোগ, বারখাইন ইউনিয়নের ডিলার মোজাম্মেল হক ওজনে এক থেকে দুই কেজি চাল কম দিচ্ছেন। এছাড়া ৩০ কেজি চালের মোট মূল্য থেকে বাড়তি ১০ টাকা করে বেশি নিচ্ছেন।
বারখাইন ইউনিয়নের সৈয়দ কুচিয়া রাস্তার মাথায় ডিলারের পরিবেশন ও সংরক্ষণ স্থানে গতকাল (১৬ জানুয়ারি) সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, একটা ভাঙ্গারি দোকানে নোংরা পরিবেশে চালগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে।
অথচ খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা হিসেবে উল্লেখ আছে, “ডিলারের দোকানের মেঝে পাকা হতে হবে এবং খাদ্যশস্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে সংরক্ষণের উপযোগী হতে হবে। ডিলারের দোকান বা গুদামে কমপক্ষে ১৫ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।”
এদিকে গতকাল সরেজমিন দেখা গেছে, ভাঙ্গারি দোকানে আগে থেকে চালগুলো আলাদা প্যাকেট করে রাখা হয়েছে। উপকারভোগীদের কাছ থেকে চাল নিয়ে মেপে দেখলে কোনটাতে ২ কেজি আবার কোনটাতে এক কেজি করে কম পাওয়া গেছে। উপস্থিত ভুক্তভোগীরা একুশে পত্রিকাকে জানান, ৩০ কেজি চালের জন্য ৩০০ টাকা নেয়ার কথা। কিন্তু নেয়া হচ্ছে ৩১০ টাকা।
তবে এ সময় বারখাইন ইউনিয়নের ডিলার মোজাম্মেল হক উপস্থিত ছিলেন। তার হয়ে দুইজন যুবক চাল বিক্রি করছেন। তাদের কাছ থেকে নাম্বার নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বারখাইন ইউনিয়নের ডিলার মোজাম্মেল হক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ডিলারশিপের ব্যবসাটি আমার পূর্বপুরুষও করে এসেছেন। তারা যেভাবে ব্যবসা করেছেন, আমিও সেভাবে করছি।’ বলেই কল কেটে দেন তিনি।
পরক্ষণে গিয়াস উদ্দীন নামের এক ব্যক্তি নিজেকে বৈরাগ এলাকার বাসিন্দা ও আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয় দিয়ে এ প্রতিবেদককে ফোন করেন। তখন তিনি বলেন, ‘আপনার সাথে মোজাম্মেলের কি সমস্যা?’ প্রতিবেদক অনিয়মের অভিযোগগুলো তুলে ধরলে গিয়াস বলেন, ‘এলাকার মানুষ দুইটা পয়সা ইনকাম করলে আপনার কী সমস্যা? আপনি মোজাম্মেলের সাথে যোগাযোগ করিয়েন।’ বলেই সংযোগ কেটে দেন তিনি।

বারখাইন ইউনিয়নে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ট্যাগ অফিসার ও উপজেলার সহকারী শিক্ষা অফিসার আশিষ কুমার আচার্য্যকে চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগগুলো জানানো হয়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ করার ভিডিও ফুটেজ দেখে তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘অভিযোগগুলো আমি খতিয়ে দেখবো। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে এই বিষয়ে কথা বলবো।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আনোয়ারা উপজেলা খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সভাপতি ও আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ জুবায়ের আহমেদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘খাদ্যবান্ধবের চাল বিক্রিতে যাতে কোন অনিয়ম না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে দুই-তিনটি ইউনিয়ন মিলে একজন ট্যাগ অফিসার দেয়া হয়। এরপরও অনিয়ম যে হবে না, সে নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। তবে এখন যে অভিযোগগুলো এসেছে, তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।’
এদিকে চট্টগ্রামে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সুবিধাভোগীর তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কোন ইউনিয়নে সুবিধাভোগীর সংখ্যা পাঁচশ’র কাছাকাছি আবার কোন ইউনিয়নে একশ’র কিছু বেশি। এ বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, দারিদ্রের প্রকোপ, দুঃস্থতা বিবেচনায় উপজেলা খাদ্যবান্ধব কমিটি ঠিক করে দেয়, কোন ইউনিয়নে কতজন সুবিধাভোগী কার্ড পাবেন। ইউনিয়ন পর্যায়ে উপকারভোগীর সংখ্যা বিভাজনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ আছে। অন্যদিকে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে সভাপতি ও সচিবকে সদস্য-সচিব করে ইউনিয়ন খাদ্যবান্ধব কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে সকল ইউপি সদস্য ও দুইজন গণমান্য ব্যক্তি সদস্য হিসেবে থাকেন। এই কমিটির প্রধান কাজ উপকারভোগী পরিবার নির্বাচন এবং অনুমোদনের জন্য উপজেলা কমিটির কাছে উপস্থাপন। আর তালিকা করার ক্ষমতা পেয়ে তারাও নিয়ম না মেনে যা খুশি তাই করছেন বলে অভিযোগ আছে।
লোহাগাড়ার জঙ্গল পদুয়ার ফাতেমা বেগম খাদ্যবান্ধবের কার্ড পেয়েছেন। তিনি একুশে পত্রিকাকে জানান, ‘কার্ড পেয়েছেন এক বছর হচ্ছে। গতবছর চাল পেয়েছেন তিনবার, মোট ৯০ কেজি।’ যদি এ সময়ে তার ৬ বার বা ১৮০ কেজি চাল পাওয়ার কথা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পদুয়া ইউনিয়নের ডিলার সেলিম উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সরকার যতবার চাল বিক্রি করার জন্য আমাকে দিয়েছে, আমি ততবারই বিক্রি করেছি। কম-বেশি হয়নি।’ গত এক বছরে কতবার চাল বিক্রি করেছেন জানতে চাইলে সেলিম বলেন, ‘সেটা খাতা দেখে বলতে হবে। পরে যোগাযোগ করিয়েন।’ একই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে লোহাগাড়া উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আওয়াই মং চাক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘গত বছর লোহাগাড়ায় ৬ বার চাল বিক্রির জন্য ডিলারদের বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। কোনো ডিলার যদি ৬ বার বিক্রি না করে থাকেন, তাহলে সংশ্লিষ্টরা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন।’
লোহাগাড়ার জঙ্গল পদুয়ার হোসেন সিকদার পাড়ার মৃত দুলা মিয়ার ছেলে সমশু মিয়াও কার্ড পেয়েছেন। সমশু মিয়া আমিন জুটমিলের চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। তার ছেলে চট্টগ্রাম নগরের চকবাজারে দোকান পরিচালনা করেন। এ বিষয়ে জানতে সমশু মিয়ার নাম্বারে কল করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে। লোহাগাড়ার জঙ্গল পদুয়ার হোসেন সিকদার পাড়ার জয়নাল আবেদীনের স্ত্রী রেহানা বেগমও কার্ড পেয়েছেন। এলাকায় তার স্বামী জয়নাল আবেদীনের মুদি দোকান আছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এ বিষয়ে জানতে রেহানা বেগমের দেয়া নাম্বারে কল করা হলে সেটি স্থগিত আছে বলে জানানো হয়। এসব অসংগতির বিষয়ে জানতে চাইলে পদুয়া ইউনিয়নের ডিলার সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘স্বচ্ছল মানুষজন কার্ড পেয়েছেন, কথা সত্য। তবে কার্ড তো আমি দিইনি। যারা দিয়েছে তাদেরকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করুন।’
জানতে চাইলে পদুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন বলেন, ‘মোটামুটি টাকা-পয়সা আছে, এরকম কেউ কেউ সরকারি চাল নিচ্ছেন বলে আমিও জেনেছি। এজন্য সুবিধাভোগীদের তালিকা হালনাগাদ করার উদ্যোগ নিয়েছি। আর চাল কম দেওয়ার অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে আমি ব্যবস্থা নেব।’
এদিকে বোয়ালখালীর পশ্চিম শাকপুরার সুবিধাভোগী দুইজনের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দেয়া হয়নি তালিকায়; যদিও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর দেয়া বাধ্যতামূলক। পশ্চিম শাকপুরার বাসিন্দা আমিন শরীফের বৃদ্ধা স্ত্রী ছকিনা খাতুন ‘দিনমজুর’ পরিচয়ে পেয়েছেন ১০ টাকার চালের কার্ড। শ্বশুর বাড়িতে বসবাস করা ছকিনার মেয়ে সেলিনা আক্তার একুশে পত্রিকাকে জানান, তার মায়ের বয়স ৭০ বছরের কম হবে না। তার মা ‘প্রতি মাসে’ ৩০ কেজি চাল পাচ্ছেন বলেও জানান সেলিনা। যদিও বছরে চাল দেয়া হয়েছে সর্বোচ্চ ছয়বার।
বোয়ালখালীর তালিকায় ৪৯০ নম্বরে থাকা মধ্য শাকপুরার বাসিন্দা সুরুত জানের নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে একজন নারী ফোন ধরে বলেন, সুরুত জান তার মামী। গত বছর ৫ বার ৩০ কেজি করে চাল পেয়েছেন বলে জানান তিনি। করোনার কারণে অতিরিক্ত এক মাসসহ ৬ মাস চাল পাওয়ার কথা জানালে তিনি জানান, ৬ মাস পাননি।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে গেলে জানা যায়, পশ্চিম শাকপুরার ডিলার ওসমান গণি দেশেই নেই। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে অবস্থান করছেন। ওসমানের হয়ে তার ভাই হারুন ডিলারের ব্যবসা চালিয়ে নিচ্ছেন। পরে হারুনের নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে তার ছোটভাই পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি বলেন, ‘গত বছর ৫ বার চাল বিক্রি করা হয়েছে। ট্যাগ অফিসার ও মেম্বারের উপস্থিতিতে হারুন ভাই চাল বিক্রি করেছেন। গতবছর ৬ বার চাল বিক্রি করার কথা জানালে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে হারুন ভাই আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।’ ওসমান গনি কোন দেশে, কখন থেকে অবস্থান করছেন এসব জানাতে রাজী হননি তার ভাই পরিচয় দেয়া ব্যক্তি। এসব বিষয় বোয়ালখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার আছিয়া খাতুনকে অবগত করার পর তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ডিলার হিসেবে যিনি দায়িত্ব পেয়েছেন, তাকেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। অন্য কেউ করতে পারবেন না। বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখব।’
অন্যদিকে রাঙ্গুনিয়ার মরিয়মনগরের ৩১০ জন দরিদ্র মানুষের নাম তালিকায় আছে। তালিকায় মরিয়মনগর ইউনিয়নের মৌলভী পাড়া ৩ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মিলি আক্তার ও সাহানাজ আক্তার নামের দুইজনের বাবা/স্বামীর নাম আবদুল মান্নান লেখা আছে। এই দুই নারীর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একটি অভিন্ন নাম্বার দেয়া হয়েছে। নাম্বারটিতে যোগাযোগ করা হলে মো. রহমত নামের এক যুবক প্রথমে বলেন, ‘আমি তাদেরকে চিনি না। আমার নাম্বার কে দিয়েছে, জানি না। তবে আমার বন্ধু জাহেদ চালের ডিলার, চাল বিতরণের সময় তাকে সহযোগিতা করতে আমি কয়েকবার গিয়েছিলাম।’
ঘন্টাখানেক পর রহমত ফোন করে জানান, তিনি মিলি আক্তারের খোঁজ পেয়েছেন। ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২২ বার মিলি আক্তার চাল পেয়েছেন বলেও কার্ড দেখে জানান রহমত। তবে কয়েক ঘন্টা এলাকা ঘুরেও সাহানাজের হদিস বের করতে পারেননি তিনি। এরপর মরিয়মনগরের ডিলার জাহেদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘তালিকায় থাকা তথ্যের বিষয়ে মেম্বার জানবেন, তিনি কিছু জানেন না।’ সাহানাজের সন্ধান না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মরিয়মনগরের ৩ নং ওয়ার্ডের মেম্বার ওবায়দুল হক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি একটু চেষ্টা করে দেখি, পাই কিনা, সবার নাম তো মুখস্ত নেই।’
এদিকে হাটহাজারীর মির্জাপুর ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের ফরহাদাবাদ গ্রামের রমজান আলীর ছেলে মো. বাবুল ও নুরুল আকবরের নাম তালিকার ৬০ ও ৬১ নম্বরে রয়েছে। যদিও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি নীতিমালায় বলা হয়েছে, একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তিকে তালিকায় রাখা যাবে না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় ৬ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নাজিমুল হক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এই দুই ভাইকে আগের মেম্বার চালের কার্ড দিয়েছেন। তারা একটু স্বচ্ছল হওয়ায় বাদ দেয়ার জন্য আমি সুপারিশ করবো।’
অন্যদিকে চন্দনাইশের কাঞ্চনাবাদ ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের সুবিধাভোগী আবু তাহেরের (কার্ড নং ৩৭৩) মোবাইল নাম্বার হিসেবে ওই ওয়ার্ডের মেম্বার জাফর আলমের নাম্বার দেওয়া হয়েছে তালিকায়। এ বিষয়ে মেম্বার জাফর আলম বলেন, ‘চাল তো পায় তাহের, ‘সে যদি আমার নাম্বার দিয়ে রাখে, আমি কী করবো?’ তাহেরের বাড়ি থেকে নিজের বাড়ি বেশ দূরে বলে স্বীকার করেন মেম্বার জাফর।
কাঞ্চনাবাদ ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের জহর লাল দে ও তার স্ত্রী কার্ড দেখে একুশে পত্রিকাকে জানান, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ১৬ বার তিনি ১০ টাকা কেজি দরে চাল কিনতে পেরেছেন; তার মধ্যে ২০২০ সালে কিনতে পেরেছেন চারবার। যদিও নিয়ম অনুযায়ী এ সময়ে ২৪ বার ৩০ কেজি করে তার চাল পাওয়ার কথা। সে হিসেবে ২৪০ কেজি চাল থেকে জহর লাল বঞ্চিত হয়েছেন। এ বিষয়ে স্থানীয় ডিলার মফিজুল আলম বলেন, ‘গত বছর আমি ৬ বার চাল বিক্রি করেছি। জহর লালের স্ত্রী প্রত্যেকবার এসে নিয়ে গেছে। জহর লাল এক সময় আমার অধীনে চাকরি করতো। ২০১৬ সাল থেকে প্রত্যেকবার তারা চাল নিয়ে গেছে, কোনো গ্যাপ নেই। এরপরও তারা এ অভিযোগটি করলো, বিষয়টি আমাকে দেখতে হবে।’
এদিকে জহর লাল দে’র নাম্বারটি (০১৮৩***৬২৩০) একই তালিকায় মোহা. আলী, হোসনে আরা বেগম, নুরুল ইসলাম ও হাবিবুর রহমান নামের মোট চারজনের নাম্বার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এই চারজনকে চেনেন না বলে জানিয়েছেন জহর লাল।
এছাড়া কাঞ্চনাবাদ ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের সুবিধাভোগীর তালিকায় সাতজনের নামের পাশে ওই ওয়ার্ডের মেম্বার নুরুল হোসেন জাহাঙ্গীরের নাম্বারটি (০১৮১৫***৭৪৩) উল্লেখ করা হয়েছে। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মেম্বার নুরুল হোসেন জাহাঙ্গীর বলেন, ‘নাম্বার তো আমি দিইনি। এ বিষয়ে খোঁজ নেব।’
এসব বিষয়ে চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইমতিয়াজ হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কাঞ্চনাবাদ ইউনিয়নের ক্ষেত্রে যে অভিযোগগুলো আসছে, তা খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে বাঁশখালীর গন্ডামারা ইউনিয়নে খাদ্যবান্ধবের ১০ টাকা কেজির চাল নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি চাল না দিয়ে কার্ড ছিঁড়ে দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে বড়ঘোনা গ্রামের দায়িত্বপ্রাপ্ত নতুন ডিলার নাঈম উদ্দীন মাহফুজের বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে জানান, বাঁশখালীর প্রত্যন্ত এলাকা গন্ডামারার ৫০-৬০ জন হতদরিদ্র ব্যক্তি ২০২০ সালের জুন মাস থেকে ১০ টাকা দামের চাল পাচ্ছেন না। সুবিধাভোগীর তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ গেছে বলেও জানানো হয় ডিলারের পক্ষ থেকে। এতে করোনা মহামারীতে কর্মহীন হয়ে পড়া দরিদ্র মানুষগুলোর দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

গন্ডামারার ৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আনছার বলেন, ‘আগের ডিলার আক্তার হোসেনের বিরুদ্ধে এরকম অভিযোগ দেখিনি। বর্তমানে নতুন ডিলার মাহফুজের বিরুদ্ধে ৫০-৬০ জন তালিকাভুক্ত কার্ডধারীকে চাল না দেওয়ার অভিযোগ দেখছি। এমনকি কয়েকজনের কার্ডও ছিঁড়ে দিয়েছে সে।’
আগে ডিলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আক্তার হোসেন মিয়া বলেন, ‘আমি ২০১৬ সাল থেকে ডিলার হিসেবে ছিলাম। ২০২০ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাস পর্যন্ত নিয়মমতো সবাইকে চাল দিয়েছি। মে মাস থেকে নতুন ডিলার মাহফুজের দায়িত্ব। সে অনেককে চাল না দিয়ে অনিয়ম করছে। কার্ডও ছিঁড়ে দিয়েছে। বিষয়টি প্রশাসনের তদন্ত করা উচিত।’
অভিযোগ প্রসঙ্গে গন্ডামারার ডিলার নাঈম উদ্দিন মাহফুজ বলেন, ‘চাল বিতরণ আমার পেশা নয়। তবুও আমি যতটুকু সম্ভব সঠিকভাবে চাল বিতরণের চেষ্টা করেছি। ৫০-৬০ জনের মতো লোক চাল কেন পায়নি এটা আমি বলতে পারবো না। যেভাবে দেওয়ার আছে সেভাবে দিয়েছি।’ বাতিল হওয়া কার্ড নষ্ট করে দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
এ ব্যাপারে গন্ডামারা ইউপি চেয়ারম্যান লেয়াকত আলী বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে কোন কিছু জানি না। তবে আমি এই এলাকার জনপ্রতিনিধি। আমি বিরোধীদলের হওয়াতে সরকারি দল কিভাবে ১০ টাকা দামের সরকারি চাল দিচ্ছে আমি কিছুই জানি না। এগুলো তারা তারাই জানে।’
এ বিষয়ে বাঁশখালী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মং খাই বলেন, ‘২০১৬ থেকে ২০২০ এপ্রিল পর্যন্ত আক্তার হোসেন ডিলার হিসেবে ছিল। দীর্ঘদিনের ডিলার পরিবর্তন হতে পারে। কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে তিনি বাতিল হয়েছেন। নতুন ডিলার নাঈম উদ্দিন মাহফুজের বিরুদ্ধে অনিয়মের তেমন অভিযোগ পায়নি। তবে আগের ডিলারের সময়ের তালিকাভুক্ত প্রায় ৬৪ জন কার্ডধারীকে উপজেলা পরিষদ কমিটি কর্তৃক বাদ দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘যাদের বাদ দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে কেউ ধনী, কেউ প্রবাসী পরিবার, আবার কেউ মারাও গেছে। তাই তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে যে পরিমাণ বাদ দেওয়া হয়েছে সে পরিমাণ নতুন তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সামনে আরও তালিকাভুক্ত করা হবে। বাদ পড়াদের মধ্যে কেউ প্রকৃত হতদরিদ্র থাকলে তদন্তপূর্বক পুনরায় তালিকাভুক্ত করা হবে।’
অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছেন ডিলাররা, অভিযোগ ভোক্তাদের
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে যুক্ত ডিলারদের রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। বেশিরভাগ ডিলার আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের রাজনীতিতে যুক্ত বলেও আলোচনা আছে। ডিলারদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত টাকা নেয়ারও অভিযোগ আছে। বোয়ালখালীর পশ্চিম শাকপুরার সুবিধাভোগী জসিম উদ্দীন জানান, ‘৩০ কেজি চালের জন্য প্রতিবার তাকে ৩১০ টাকা দিতে হয়।’ পশ্চিম শাকপুরার বাসিন্দা আমিন শরীফের বৃদ্ধা স্ত্রী ছকিনা খাতুন ৩২০ টাকার বিনিময়ে ৩০ কেজি চাল পাচ্ছেন বলেও জানান তার মেয়ে সেলিনা। যদিও খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৩০ কেজি চালের জন্য ৩০০ টাকার বেশি নিতে পারবেন না ডিলার।
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিক্রিতে যুক্ত ডিলারদের লাভ কী, জানতে চাইলে আনোয়ারা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক তপন কুমার বড়ুয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ডিলাররা প্রতি কেজি চাল বাবদ সাড়ে ৮টাকা করে সরকারের কোষাগারে জমা দেয়। আর তারা ১০ টাকা কেজি দরে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করে। সে হিসেবে প্রতি কেজিতে তাদের দেড় টাকা লাভ থাকে। সেখান থেকে ডিলাররা পরিবহন ও শ্রমিক খরচও বহন করেন।’
তবে খাদ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একজন ভোক্তাকে ৩০ কেজি চালের একটি বস্তা দেয়া হয়। কিন্তু প্রায় সময় ওই বস্তায় পুরো ৩০ কেজি থাকে না। কোনো বস্তায় এক কেজি, কোনো বস্তায় দুই কেজি পর্যন্ত চাল থাকে না। গুদামে আনা-নেয়ার সময় এসব চাল শ্রমিকরা ফুটো করে নিয়ে ফেলে। অনেক সময় শ্রমিকরা এসব চাল প্রকাশ্যে নেয়, তাদের পারিশ্রমিক হিসেবে। আবার অসাধু ডিলাররাও কিছু নিয়ে ফেলে। তাই ভোক্তাদের উচিত, বস্তায় ৩০ কেজি আছে কিনা সবসময় যাচাই করে নেয়া।
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির উপকারভোগীদের তালিকা আছে, স্পষ্ট ঠিকানা নেই
চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির উপকারভোগীদের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেশিরভাগের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা নেই। উপকারভোগীদের গ্রামের নাম হিসেবে ইউনিয়নের নামই তুলে দেয়া হয়েছে। বোয়ালখালীর কধুরখীল ইউনিয়নে ১৯০ জন সুবিধাভোগী আছেন। কিন্তু তাদের কারও মোবাইল নাম্বার, পেশা ও গ্রাম তালিকায় উল্লেখ নেই। শুধু নাম ও বাবা/স্বামীর নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্র নাম্বার আছে। এটুকু তথ্য দিয়ে সুবিধাভোগীদের যাচাই করা কঠিন। কধুরখীল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শফিউল আজম শেফু একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সুবিধাভোগী কে কোন গ্রামের সব তথ্য ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের কাছে আছে। এসব তথ্য খাদ্য অধিদপ্তরে দেয়ার কথা।’
একই অবস্থা বোয়ালখালীর পশ্চিম গোমদন্ডী ইউনিয়নেও। এ ইউনিয়নে ১২৪ জন সুবিধাভোগী আছেন। কিন্তু তাদের পেশা কী, কে কোন গ্রামে আছেন সেটা তালিকায় উল্লেখ নেই। নেই মোবাইল নাম্বারও। সারোয়াতলীতেও একই অবস্থা। স্বাভাবিকভাবে এসব মানুষের পরিচয় যাচাই করাও কঠিন ব্যাপার।
তালিকায় স্পষ্ট ঠিকানা উল্লেখ না থাকা প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আবু নঈম মোহাম্মদ সফিউল আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা চাই প্রকৃত লোককে শনাক্ত করে দেওয়ার জন্য। এজন্য কত চেষ্টা যে করছি। কিন্তু চেয়ারম্যান সাহেবরা আমাদের প্রতিনিধিদের কথা শোনেনই না। হাতে-পায়ে, আরও কত জায়গায় ধরে তারপর তালিকাটা করা হয়েছে। সেই তালিকাটাও পরিপূর্ণ না। এই দুঃখের কথা বলে শেষ করা যাবে না।’
সুবিধাভোগীদের মোবাইল নাম্বার চেয়ারম্যান-মেম্বাররা দিতে চান না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চেয়ারম্যান-মেম্বাররা বলছেন, ১০ টাকা কেজি দরে চাল যারা নিচ্ছেন, তারা খুবই দরিদ্র, তাদের মোবাইল ফোন নেই। তখন বললাম, পরিবারের কারও বা পাশের বাড়ির কারও নাম্বার দিন, যাতে পাওয়া যায়। তাও সবার নাম্বার দেয়া হচ্ছে না। যাদের নাম্বার দেয়া হয়েছে, সেখানে আমরা নিজেরা যখন তদারক করতে যোগাযোগ করি, দেখি যে নাম্বারটি আরেকজনের, কেউ কেউ চেনে না। আমরা যখন যাচাই করতে পারছি না, তখন প্রশ্ন তুলছি। বলছি যে, আমি কীভাবে বুঝবো এই লোকটি ঠিকমতো পেয়েছে কিনা। নানান যন্ত্রণার মধ্যে আমরা আছি।’
চুরি করা সরকারি চাল যায় কোথায়
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মাধ্যমে গরিবদের হাতে চাল তুলে নিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায় সরকার। কিন্তু সেই চাল চুরি হয়ে বেসরকারি গুদাম বা খোলা বাজারে চলে যাচ্ছে। এতে দামের উপর তেমন প্রভাব পড়ে না। গত বছরের ১৩ মে মিরসরাইয়ের ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের ছোট কমলদহ এলাকায় অভিযান চালিয়ে সরকারি ৬০ বস্তা (১ হাজার ৫৮৩ কেজি) চালসহ নুরুজ্জামান ও আলাউদ্দিন নামে দুইজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। তখন র্যাব জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দুই ব্যক্তি চালগুলো সরকারি গুদামের বলে স্বীকার করেছেন। সরকারি গুদামের বস্তা বদলে খোলা বাজারে বিক্রি করা হতো এসব চাল। পরে সরকারি সিল মারা বস্তাগুলো পুড়িয়ে ফেলা হতো। এ ঘটনায় আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হয়েছে, মামলা বিচারাধীন বলে একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন মিরসরাই থানার ওসি মুজিবুর রহমান।
গত বছরের ১৭ এপ্রিল চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ধর্মপুর সরকার হাটে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চার বস্তা সরকারি চাল বিক্রির অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর মধ্যে ধর্মপুরের ডিলার সারোয়ার জামান বাবুল ও দুইজন বিক্রেতা ছিলেন। ফটিকছড়ির খাদ্য পরিদর্শক ওবায়দুর রহমান চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে জানান, ডিলার সারোয়ার জামান বাবুল জামিনে বেরিয়ে এসেছেন। তবে তার ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে গত বছরের ৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম নগরীর ডবলমুরিং থানাধীন ঈদগাঁ ঝর্নাপাড়া এলাকার ফারুক ট্রেডিং নামে এক আড়তদারের গুদাম থেকে ২১ বস্তা সরকারি চালসহ একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ডবলমুরিং থানার তৎকালীন পরিদর্শক তদন্ত জহির হোসেন তখন জানান, খাদ্য অধিদপ্তরের সিলযুক্ত বস্তা থেকে সাধারণ বস্তায় ঢোকানোর সময় হাতেনাতে ধরা হয়। প্রতিটি বস্তায় ৩০ কেজি করে চাল ছিল। ঘটনাস্থল থেকে আরাফাত মোস্তফা নামে ফারুক ট্রেডিংয়ের এক কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গত বছরের ২৮ জুলাই হাটহাজারীর দক্ষিণ পাহাড়তলী এলাকার ঠান্ডাছড়ি এলাকা থেকে ১৯৫ বস্তা সরকারি চালসহ ট্রাক জব্দ করে হাটহাজারী থানা পুলিশ। চট্টগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আবু নঈম মোহাম্মদ সফিউল আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ঠান্ডাছড়ি থেকে জব্দ করা চালগুলো একজন ডিলারের বলে পরে আমরা জানতে পারি। তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। জব্দ করা চালগুলো এখনো পড়ে আছে। চালগুলো ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে নিলামে তোলার প্রক্রিয়া চালাচ্ছি।’
অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না পদ্ধতিগত কারণেই
সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির খাদ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। কিন্তু এই কর্মসূচির পুরো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানটির হাতে নেই। চেয়ারম্যান-মেম্বারদের সমন্বয়ে গঠিত ইউনিয়ন খাদ্যবান্ধব কমিটির মাধ্যমে প্রথমে সুবিধাভোগীর তালিকা হয়, সেটি আবার অনুমোদন দেয় উপজেলা কমিটি। উপজেলা কমিটিতে সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও, সরকারি বিভিন্ন অফিসের প্রধানরাও থাকেন। যার কারণে জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তারা একে অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে নিজেদের ‘কর্তব্য’ শেষ করেন।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আবু নঈম মোহাম্মদ সফিউল আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, আমরা নিজেরা কাজ করতে পারি না। ইউনিয়ন কমিটি তালিকা করে দেয়, সেটা উপজেলা কমিটি অনুমোদন করে, সেটা ধরে আমরা কাজ করছি। ইউএনও সাহেব উপজেলা কমিটির প্রধান, তিনি তালিকা অনুমোদন করে দিচ্ছেন, অনিয়মের প্রশ্নগুলো আপনি সেখানে করতে পারেন।’
বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ পদ্ধতি চালু করলে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে মন্তব্য করে চট্টগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বলেন, ‘ইতিমধ্যে দুই-একটি জেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে এ পদ্ধতি চালু করেছে খাদ্য অধিদপ্তর। সফটওয়ারের মাধ্যমে সব নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে সেখানে। সুবিধাভোগী সবার মোবাইল নাম্বারও সেখানে থাকছে। বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ পদ্ধতি সব জায়গায় চালু করলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’
খাদ্য নিয়ন্ত্রক আবু নঈম মোহাম্মদ সফিউল আলম বলেন, ‘ইউনিয়ন পর্যায়ে দরিদ্র মানুষদের জন্য যদি একটি পরিপূর্ণ ডাটাবেইজ থাকতো, তাহলে খাদ্যবান্ধব, ভিজিডি, ভিজিএফ এর সুবিধাভোগী সব ভালোভাবে ঠিক করা যেত। সেটা ধরে আমরা কাজ করতে পারতাম। পদ্ধতিগত কারণে এখন একই ব্যক্তি খাদ্যবান্ধব ও ভিজিএফে থাকতে পারেন। সরকার ইউনিয়ন পর্যায়ে দরিদ্র মানুষদের ডাটাবেইজ করবে বলে শুনেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত অগ্রগতি নেই। সেজন্য এই বিভ্রান্তির মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে।’
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির তালিকায় ধনীদের নাম থাকার বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আবু নঈম মোহাম্মদ সফিউল আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এসব অনিয়ম দূর করতে যতটুকু পারি চেষ্টা করছি। এরপরও কিছু সমস্যা রয়ে গেছে, এসব নিয়ে কাজ করছি। এ ধরনের তথ্য যদি আমরা পাই, কঠোর ব্যবস্থা নেব।’
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সরকার নিম্নআয়ের লোকজনের জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চালু রেখেছে। এটি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একটি নিজস্ব কর্মসূচি। তবে অনিয়মের অভিযোগ পেলে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে দিয়ে তদন্তের মাধ্যমে আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’ এ প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে উঠে আসা অনিয়মের অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘হতদরিদ্র মানুষের জন্য ১০ টাকা কেজি ধরে চাল বিক্রির উদ্যোগ নেয় সরকার। এটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিলার নিয়োগ, জনপ্রতিনিধিদের স্বজনপ্রীতি ও সরকারি অফিসারদের দায়িত্বে গাফিলতির কারণে এই উদ্যোগের সুফল মানুষ তেমন পাচ্ছেন না। চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগগুলো গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।’
জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘শুধু চট্টগ্রামে নয়, সারাদেশে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগীদের তালিকা নিয়ে কিছু অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে। তাই প্রকৃত গরীব ও দুস্থদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে নতুন করে তালিকা পাঠাতে ডিসি ও খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের বলা হয়েছে। প্রয়োজনে নতুন করে ট্যাগ অফিসারকে দায়িত্ব দিয়ে হালনাগাদ করে নতুন তালিকা প্রণয়ন করার নির্দেশও দেয়া হয়েছে। এছাড়া দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ড ডিজিটালাইজড করার পরিকল্পনাও আমরা করছি।’