শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

চসিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করলেন কারা?

| প্রকাশিতঃ ৩১ জানুয়ারী ২০২১ | ১২:৩৯ অপরাহ্ন

একুশে প্রতিবেদক : আইন অনুযায়ী, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত ছিলেন বা আছেন এমন কেউ নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থায় যুক্ত থাকতে পারবেন না। এছাড়া সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দারা পর্যবেক্ষক হিসেবে যুক্ত হতে পারবেন না। কিন্তু সদ্য অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে অনেক ক্ষেত্রে এসব আইন মানা হয়নি।

নয়টি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘ইলেকশন মনিটরিং ফোরাম’ নামের একটি মোর্চা তৈরি করে চসিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছে। ইলেকশন মনিটরিং ফোরামের নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্বে আছেন মাওলানা মোহাম্মদ আবেদ আলী। তিনি আবার ‘সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন’ নামের একটি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থার মহাসচিব পদেও আছেন। তবে নামের আগে ‘সার্ক’ থাকলেও, ‘সার্ক’-এর সঙ্গে ‘সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের’ সম্পর্ক নেই।

ইলেকশন মনিটরিং ফোরামের অন্তর্ভুক্ত নয়টি সংস্থার পক্ষ থেকে ২৭৫ জন ব্যক্তি চসিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন বলে আবেদ আলী একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন; এর মধ্যে রয়েছে সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন, বিবি আছিয়া ফাউন্ডেশন, আসক ফাউন্ডেশন, তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থা, সমাজ উন্নয়ন প্রয়াস ও ডিপি ফাউন্ডেশন। বাকি তিনটি সংস্থার নাম আবেদ আলী জানাতে পারেননি।

চসিক নির্বাচন কেমন হয়েছে- জানতে চাইলে ইলেকশন মনিটরিং ফোরামের নির্বাহী পরিচালক মাওলানা মোহাম্মদ আবেদ আলী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়েছে।’ নির্বাচনে সহিংসতার চিত্র সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘৭৩৫টি কেন্দ্রে চার হাজারের বেশি বুথ, প্রায় ২০ লাখ ভোটার- এত বিশাল আয়োজনের মধ্যে কিছু বিশৃঙ্খলা স্বাভাবিক। তবে বিশৃঙ্খলা যেটা হয়েছে, সেটা স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের মাধ্যমে হয়েছে। আমরা সবমিলিয়ে বলতে পারি, এবারের চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়েছে, সুষ্ঠু হয়েছে।’

ইলেকশন মনিটরিং ফোরামের পক্ষ থেকে ২৭৫ জনের চসিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে কী পরিমাণ টাকা খরচ হয়েছে এবং এসবের অর্থায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে মাওলানা মোহাম্মদ আবেদ আলী বলেন, ‘নির্বাচন পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে আমরা কোনো টাকা-পয়সা খরচ করিনি। কাউকে টাকা দিইনি। আমাদের মানবাধিকার সংগঠনের যে কর্মীরা আছেন, তারা স্বেচ্ছায় পর্যবেক্ষণ করেছেন। যাতায়াত খরচও লাগেনি, আমরা নিজেদের গাড়ি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছি।’

এদিকে চসিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা নয়টি সংস্থার এই ২৭৫ জনের মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নানাভাবে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে। সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি সাইফুল হক চৌধুরী চসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর জন্য প্রচারণা চালিয়েছেন, সেসব ছবি বিভিন্ন সময়ে আবার ফেসবুকেও দিয়েছেন তিনি। এরপর ২৭ জানুয়ারি নির্বাচনের দিন ‘পর্যবেক্ষক কার্ড’ নিয়ে ভোট কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন সাইফুল। সেই পর্যবেক্ষক কার্ডের ছবিও ফেসবুকে প্রকাশ করা সাইফুল হক চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমটিতে নিজের পরিচয় দিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের ‘রাজনৈতিক কর্মী’।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নীতিমালার ৯.৩ ধারায় লেখা রয়েছে, ‘সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দা বা ভোটার নয় এমন লোককে পর্যবেক্ষক মোতায়েন করতে হবে।’ অথচ চসিক নির্বাচনে ‘পর্যবেক্ষণ কার্ড’ গলায় ঝুলিয়ে ‘দায়িত্ব পালন’ করেছেন আবদুল মতিন নামের নগরের পাটানটুলির একজন যুবলীগ নেতা; তিনি এর আগে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থীর পক্ষে ভোটের প্রচারণায় অংশ নিয়ে সেসব ছবি ফেসবুকে দিয়েছেন। আবার ভোটের দিন নগরের বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে ইলেকশন মনিটরিং ফোরামের নির্বাহী পরিচালক মাওলানা মোহাম্মদ আবেদ আলী পাশেও মতিনকে দেখা গেছে।

এদিকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নীতিমালার ৪.৩ ধারায় লেখা রয়েছে, ‘নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সহিত সরাসরি জড়িত ছিলেন বা আছেন কিংবা নিবন্ধন লাভের জন্য আবেদনকৃত সময়ের মধ্যে কোন নির্বাচনের প্রার্থী হইতে আগ্রহী এইরূপ কোন ব্যক্তি যদি পর্যবেক্ষণের জন্য আবেদনকারী কোন সংস্থার প্রধান নির্বাহী কিংবা পরিচালনা পর্ষদের বা ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য হইয়া থাকেন, তাহা হইলে উহা যে নামেই অভিহিত হউক না কেন উক্ত সংস্থাকে পর্যবেক্ষক সংস্থা হিসেবে নিবন্ধন করা হইবে না।’

অথচ সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টামন্ডলীর চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমিন, সাবেক মন্ত্রী নাজিম উদ্দিন আল আজাদ, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়ের সভাপতি মাহবুবুল আলম, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মো. সোলায়মান আলম শেঠ প্রমুখ।

এছাড়া সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় পরিচালক পদে আছেন চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা ড. মাসুম চৌধুরী। ফাউন্ডেশনের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি অহিদ সিরাজ স্বপন ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক মহিম মিজান চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রলীগের সহ সভাপতি ছিলেন। ফাউন্ডেশনের মহিলা ও শিশু বিষয়ক সম্পাদিকা পদে আছেন রোকেয়া বেগম; তিনি চট্টগ্রামের হাটহাজারীর ১০নং উত্তর মাদার্শা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের মহিলা সম্পাদিকা ছিলেন।

এদিকে চাঁদপুর জেলা মৎস্যজীবী লীগ সভাপতি রেদওয়ান খান বোরহান সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের ঢাকা কমিটির উপদেষ্টা হিসেবে আছেন। চসিক নির্বাচন উপলক্ষে ‘পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমে’ অংশ নিতে গত ২৩ জানুয়ারি রেদওয়ান খান বোরহান বিমানযোগে চট্টগ্রামে আসেন উল্লেখ করে ইলেকশন মনিটরিং ফোরামের নির্বাহী পরিচালক মাওলানা মোহাম্মদ আবেদ আলী তার ফেসবুক আইডিতে পোস্ট দিয়ে জানান।

সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা পরিষদে কে কে আছেন- জানতে চাইলে সংস্থাটির মহাসচিব মাওলানা মোহাম্মদ আবেদ আলী বলেন, ‘আমাদের ওয়েবসাইটে গেলে সব পেয়ে যাবেন।’ তবে গতকাল ৩০ জানুয়ারি সারাদিন বেশ কয়েকবার ‘সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন’-এর ওয়েবসাইটে (saarchumanrights.org) প্রবেশ করা যায়নি। বিষয়টি জানালে আবেদ আলী বলেন, ‘সাইটে হয়তো কাজ চলতেছে। অনেক সময় আপলোড দেয় তো, ওই সময় একটু সমস্যা হয়।’

সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের যুক্ত থাকা প্রসঙ্গে আবেদ আলী বলেন, ‘আমাদের উপদেষ্টা কমিটিতে রাজনৈতিক ব্যক্তি আছেন, কিন্তু কার্যনির্বাহী কমিটিতে রাজনৈতিক ব্যক্তি নেই।’

উপদেষ্টারা ফাউন্ডেশনের কাজে অর্থায়ন করেন কিনা প্রশ্নে তিনি সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেন, ‘আমাদের কর্মীদের অর্থ দিয়ে সংগঠন চলে। ভোট পর্যবেক্ষণ বিষয়ে জানতে চাইলে এই সমস্ত বিষয় আসবে কেন? আমাদের সংগঠনের আরও যারা কর্মী আছেন, তারা নিজেদের অর্থ দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করেন। আমাদের সংগঠন থেকে কর্মীরা কোন টাকা পায় না।’

নির্বাচন পর্যবেক্ষণের কাজে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের যুক্ত করার অভিযোগ প্রসঙ্গে আবেদ আলী বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করেছি পর্যবেক্ষক হিসেবে আমাদের কর্মীদেরকে দেয়ার জন্য। এখানে কেউ কেউ যদি কোন দলকে সমর্থন করে সেটা তো আমরা জানি না, তবে এতটুকু নিশ্চিত করতে পারি, সরাসরি কোন পদধারী ব্যক্তি আমার জানা মতে ছিল না।’

মৎস্যজীবী লীগের নেতা রেদওয়ান খান বোরহানের চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন পর্যবেক্ষণের কাজে নগরে আগমন প্রসঙ্গে আবেদ আলী বলেন, ‘তিনি চট্টগ্রামে এসেছেন নাগরিক সভায় অংশগ্রহণ করতে। নাগরিক সভায় যে কেউ অংশগ্রহণ করতে পারেন। তিনি তো নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেননি। তিনি ঢাকা কমিটিতে আছেন। আর কমিটিতে থাকলেই যে বায়াস্ট হবেন তা তো না। তিনি তো পর্যবেক্ষণ থেকে দূরে ছিলেন।’

এদিকে এবার চসিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা আইন সহায়তা কেন্দ্র (আসক) ফাউন্ডেশন। এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লাখ লাখ টাকা আর্থিক লেনদেন করে বাংলাদেশ তথা সারা বিশ্বে বিপুল অর্থের বিনিময়ে সংস্থার পরিচয়পত্র বিক্রি করার অভিযোগ উঠে। ২০১৮ সালের ১৯ আগস্ট উজ্জ্বল হোসেন মুরাদ নামে এক ব্যক্তি নির্বাচন কমিশনে এসব অভিযোগ করেছিলেন। তবে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মো. সামসুল হক এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি কোনো প্রকার দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নয়।

এদিকে গত ২৩ জানুয়ারি চসিক নির্বাচন উপলক্ষে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে ‘মুক্ত আলোচনা সভার’ আয়োজন করে ইলেকশন মনিটরিং ফোরাম। সেখানে আলোচক হিসেবে চট্টগ্রাম মহানগর আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী ফখরুদ্দীন চৌধুরী উপস্থিত থাকবেন বলে ব্যানার ছাপিয়ে জানান দেয় আয়োজকরা। ব্যানারে এডভোকেট ফখরুদ্দীন চৌধুরীকে ইলেকশন মনিটরিং ফোরামের পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়, তবে সেদিন তিনি সভায় উপস্থিত ছিলেন না। এসব বিষয়ে জানতে ফখরুদ্দীন চৌধুরীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করে সাড়া পাওয়া যায়নি।

সুশাসনের জন্যে নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘ইলেকশন মনিটরিং ফোরাম’ এবং ‘সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন’ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই, চিনি না। নিজেদের পক্ষে বলার জন্য ক্ষমতাসীনরা এসব সংগঠনকে পৃষ্টপোষকতা দেয় হয়তো। নির্বাচনের দিন কার্ড নিয়ে তারা ভোট কেন্দ্রে ঢুকে, এরপর নানা তামাশা করে।’

নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা হিসেবে নিবন্ধন দেয়া হয় নির্বাচন কমিশন থেকে। রাজনীতিবিদদের চেয়ারম্যান ও উপদেষ্টা রেখে কী করে নিবন্ধন পেলো সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন? এছাড়া রাজনীতিতে যুক্তরা কিভাবে ভোট পর্যবেক্ষণ করলেন?

এসব প্রশ্নের উত্তরে চসিক নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সাধারণত নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হলে তাদের তথ্যগুলো যাচাই করার জন্য আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নিই। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা, সেটা যাচাই করে দেখতে বলি আমরা। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন সংস্থার ক্লিয়ারেন্স পেলে তবেই পর্যবেক্ষক কার্ড ইস্যু করা হয়। চসিক নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে।’