শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

পুরোনো গানে নতুন প্রজন্ম, উৎকণ্ঠার বদলে সুরের সাগরে ভাসছে নগরবাসী

| প্রকাশিতঃ ৬ মার্চ ২০২১ | ২:২৩ পূর্বাহ্ন

 

আবছার রাফি : একসময়ের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার জামালখান মোড়কে আলোকিত করে সেখানে নগরবাসীকে সুরের সাগরে ভাসাচ্ছে নান্দনিক-ব্যতিক্রম আয়োজন ‘পুরোনো সুরে-নতুন প্রজন্ম’ শীর্ষক স্ট্রিট কালচারাল অনুষ্ঠান।

২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে নগরীর জামালখান চত্বরে পুরোনো দিনের গান নিয়ে আসর বসিয়েছিলেন স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন। করোনা ও সিটি নির্বাচনের কারণে কিছুদিন বন্ধ রাখার পর গেল সপ্তাহে নবনির্বাচিত সিটি মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী ফের উদ্বোধন করেন আলোচিত স্ট্রিট কালচারাল প্রোগ্রাম।

ছুটির দিনে নগর ঘুরে বেড়ানো মানুষকে বাড়তি বিনোদন দিতে সুমনের এই আয়োজন চলবে প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত। যেখানে ‘৯০ দশকের পুরোনো দিনের গানগুলো পরিবেশন করছেন স্থানীয় উদীয়মান শিল্পীরা। প্রতি আয়োজনে ভালোবাসার দুই মানুষকে অতিথি করা হয়।

শুক্রবারের (৫ মার্চ) অনুষ্ঠানে আলোচ্য ‘দুই ভালোবাসার মানুষ’ পর্বে অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতালের উদ্যোক্তা, একুশে পত্রিকা সম্পাদক আজাদ তালুকদার ও সাবেক চসিক কাউন্সিলর, ফিল্ড হাসপাতালের উদ্যোক্তা নারীনেত্রী অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু।

অনুষ্ঠানে আজাদ তালুকদার বলেন, ‘১৯৯০ সালে এই শহরে আমার পদার্পণ। ৩১টা বছর কাটিয়ে দিয়েছি এখানে। চকবাজারের কাছাকাছি ছিল আমার বাসা। চকবাজার থেকে মাত্র ৮ আনা, এক টাকা খরচ করে জামালখান মোড়ে আসতাম। সন্ধ্যার পর জামালখান দিয়ে চলাচলে আমরা উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় থাকতাম। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ভরা একটা জায়গা। কবে না জানি আমার পকেটটা ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে, আমার হাতঘড়িটা খুলে দিতে হচ্ছে কিংবা আমার বোনের স্বর্ণের চেইনটা এক পলকে কখন টান দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ছিনতাইকারী দল- এমন একটা শঙ্কায় থাকতাম আমরা। এরকম একটা দৃশ্য-পরিস্থিতির সঙ্গে কমবেশি আমরা অনেকেই পরিচিত। সেরকম একটা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার জায়গাকে আলোকিত করেছেন কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন। সুরের সাগরে ভাসিয়ে দিচ্ছেন জনপদের মানুষগুলোকে।

সদিচ্ছা, অধ্যবসায় ও সুন্দর মন থাকলে আকাশও জয় করা যায় উল্লেখ করে একুশে পত্রিকা সম্পাদক বলেন, ‘কাউন্সিলর হিসেবে শৈবাল দাশ সুমনের কিন্তু দায়িত্ব এলাকার মানুষকে সনদ দেওয়া, যতটুকু পারা যায়, তাদেরকে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতায় রাখা, এলাকার কেউ মারা গেলে হাজির হওয়া, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ছাড়া একজন কাউন্সিলরের খুব বেশি কাজ আছে বলে আমি মনে করি না।

শৈবাল দাশ সুমন সেই গতানুগতিক কাজের ধারা ভেঙে দেখিয়ে দিয়েছেন সদিচ্ছা, সুন্দরমন, একাগ্রতা ও অন্তরে মানুষের প্রতি প্রেম এবং ভালোবাসা থাকলে আকাশকেও জয় করা যায়। আমি মনে করি, শৈবাল দাশ সুমন যে যাত্রা শুরু করেছেন সেটা আকাশ জয়ের যাত্রা। এই চাটগাঁ শহরে অনেক কমিশনার এসেছেন, অনেক কমিশনার গেছেন; কিন্তু খুব বেশি মনে রাখার মতো কমিশনার আমরা পাইনি। যদিও রেহানা বেগম রানু- আমরা একসাথে আছি, থাকি। আমার মনে হয় যে, এটা না বলাটা বরং অত্যুক্তি হবে; তিনি তিনবার কমিশনার ছিলেন। কর্মে-চিন্তায় তিনি মানুষকে জাগিয়েছেন, জাগরণ তৈরি করেছেন। তিনি যদি নাও থাকেন কিন্তু এই নগরে রানু নামে একজন কমিশনার ছিলেন, আমি বোধ করি মানুষ এটা বলবে, মনে রাখবে।

আজ বলতে চাই, ‘আলোচিত কমিশনার রেহানা বেগম রানুকেও ছাপিয়ে এই চাটগাঁ শহরে একজন কমিশনার আছেন, তিনি হচ্ছেন শৈবাল দাশ সুমন। একদিন তিনিও থাকবেন না। তখন জীবিত কাউন্সিলর সুমনের চেয়ে মৃত কাউন্সিলর সুমন অনেক বেশি শক্তিশালী হবেন। অনেক বেশি ঠাঁই করে নেবেন জামালখান শুধু নয়, এই নগরের মানুষের অন্তরে। আমি মনে করি সেই পথে শৈবাল দাশ সুমন হাঁটছেন।’ – বলেন আজাদ তালুকদার।

আজাদ তালুকদার বলেন, ‘পেশাগত কারণে আমি পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি, সেখানে দেখেছি স্ট্রিট সিঙ্গাররা গান করে, রাস্তায় রাস্তায় কালচারাল প্রোগ্রাম হয়, কিন্তু বাংলাদেশে এই কনসেপ্টটা প্রথম। সেদিন আমাদের সাথে চট্টল মেয়র রেজাউল করিমের সাথে কথা হচ্ছিল। তিনি এখানে অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করে অন্য একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছেন, সেখানে আমরা দুজনও ছিলাম। মেয়রকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কোন প্রোগ্রাম থেকে এসেছেন? তিনি আমাদের বললেন, শৈবাল দাশ সুমনের একটা প্রোগ্রামে গিয়েছিলাম, চমৎকার প্রোগ্রাম। জামালখান মোড়ে সুরের মূর্ছনায় লোকজন ভাসছেন।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও নারীনেত্রী অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু বলেন, ‘আমি মুগ্ধ, অভিভূত এই আয়োজনে। আমিও তিনবারের কমিশনার ছিলাম চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের- ২০০০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত। এরকম একটা চমৎকার আয়োজন কিন্তু আমি করতে পারিনি। এটাকে হেলদি ওয়ার্ড বলা হয়, সেই হেলদি ওয়ার্ড থেকে উনি মননে-মেধায় একটা চমৎকার পরিকল্পনা করেছেন; কীভাবে মানসিক স্বাস্থ্য এবং শারীরিক স্বাস্থ্য ভালো রাখা যায়। এটি মানসিক স্বাস্থ্যেরও একটি অংশ বলে আমি মনে করি। মানুষ যদি মানসিকভাবে ভালো না থাকে তাহলে কোনো কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে না। এ যেন সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা। আমি একটি কথা প্রায়ই বলি, সুরে থাকলে অসুরে পায় না। সুরের পথে হাঁটার যে যাত্রা তিনি করেছেন, সুরের সাগরে আপনাদের সাঁতার দেওয়ার, আপনাদের মনকে সাঁতরানোর যে ব্যবস্থা তিনি করেছেন- এজন্য আমি অন্তরের অন্তস্তল থেকে শ্রদ্ধা জানাই, ভালোবাসা জানাই। কারণ, অনেক জনপ্রতিনিধি আছেন তারা অর্থের বিত্তে বিত্তবান, চিন্তার বিত্তে বিত্তবান নয়। আর এখানেই শৈবাল দাশ সুমন ব্যতিক্রম।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে এটিই বিরল আয়োজন উল্লেখ করে রেহানা বেগম রানু বলেন, আমি মনে করি এই এলাকার জনসাধারণ খুবই ভাগ্যবান। এখানে নান্দনিকতার ছোঁয়া আছে, সৃষ্টিশীলতা আছে। এই জামালখানের পরতে পরতে যতটুকু চোখ যায় দৃষ্টিকে স্বস্তি দেওয়া, মনকে স্বস্তি দেওয়া যায়। আমরা ক্রমশ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছি, পুরোনো দিন আমাদের টানে না। আমরা কেবলই ভুলতে বসেছি ভালোবাসা, ভুলতে বসেছি আমাদের চমৎকার সম্পর্কগুলোকে। আমরা শুধু নিচের দিকে তাকাই, যন্ত্রের দিকে তাকাই- রক্তের দিকে তাকাই না, আত্মার দিকে তাকাই না। আত্মার সাথে আত্মার যে সম্পর্ক সেটাকে আজ আমরা ভুলে যেতে বসেছি। আমরা কেবল যন্ত্রের দিকে নিমগ্ন হয়ে থাকি, আকাশের দিকে তাকাই না, সুরকে ভালোবাসি না, চাঁদের জোছনাকে ভালোবাসি না। এটুকু ভালোবাসানোর যে চেষ্টা করে যাচ্ছেন শৈবাল দাশ সুমন- আমি মনে করি তিনি শুধু ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য নন; মানুষের মনে ঠাঁই করে নেওয়ার যোগ্য হয়েছেন, নিজেকে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করছেন তিনি।

ব্যতিক্রমী এই অনুষ্ঠানের আয়োজক নবনির্বাচিত চসিক কাউন্সিল শৈবাল দাশ সুমন বলেন, বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা পুরোনো দিনের গানের সাথে খুব বেশি পরিচিত নয়। অনেকেই জানে না যে, আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যে পুরোনো গানের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার রয়েছে। পুরোনো দিনের গান যেমন-তপন চৌধুরী, কুমার বিশ্বজিৎ, সুবীর নন্দীর মতো মহৎ শিল্পীদের পুরোনো গানগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। সে কারণে স্থানীয় শিল্পীদের দিয়ে এ পরিবেশনার আয়োজন করেছি। শিল্পীরা এই গানগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে আবার সৃষ্টি করছে।

‘পুরোনো সুরে-নতুন প্রজন্ম’ অনুষ্ঠান সব শ্রেণীপেশার মানুষের জন্য উন্মুক্ত জানিয়ে তিনি বলেন, আসন্ন রমজান মাস ছাড়া বাকি সময়ে এ অনুষ্ঠান নিয়মিতভাবে চলবে।

শুক্রবারের অনুষ্ঠানে দেশাত্মবোধক ও আধুনিক গান পরিবেশন করেন চট্টগ্রামের চার উদীয়মান শিল্পী- শাওন, নীপা চৌধুরী, পাপড়ী ভট্টাচার্য, খোকন মালাকার।