
মোহাম্মদ রফিক : চট্টগ্রাম নগরের একটি ডিপোতে ১০টি মার্সিডিজ বেঞ্জ বাস রাখা হয়েছিল খোলা আকাশের নিচে। ওই ডিপোর পাশ দিয়ে মানুষের চলাচলের রাস্তা নেই। সিগারেট ফুঁকে ছুড়ে মারারও সুযোগ নেই। ডিপোর তিন দিকে আছে সীমানা দেয়াল। সামনে আছে গ্যারেজ৷ নেই কোন বিদ্যুৎ। নেই ওয়েল্ডিংয়ের কাজ। তবুও আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল বাসগুলো।
গতকাল বৃহস্পতিবার (১১ মার্চ) দুপুর ১ টার ৩৫ মিনিটের দিকে নগরের কর্নেলহাট পদ্ম পুকুর এলাকায় বাগদাদ গ্রুপের ডিপোতে এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ২টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে বিকাল ৩টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনে ৯টি বাস পুড়ে পুরোপুরি ছাই হয়ে গেছে। একটি আংশিক পুড়েছে। একটি অক্ষত আছে। গাড়িগুলোর মধ্যে কিছু সচল ছিল। আর কিছু ছিল অচল। গাড়িগুলোর দাম আনুমানিক ১৫ থেকে ১৬ কোটি টাকা হতে পারে।
জানা গেছে, গাড়িগুলোর মালিক বাগদাদ গ্রুপ। যে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আছে ৩০০ কোটি টাকা ঋণখেলাপির অভিযোগ। পাওনা আদায়ে বিভিন্ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আদালতে দায়ের করেছে একাধিক মামলা। ঋণখেলাপি বাগদাদ গ্রুপের কর্ণধার হলেন তিনজন। তারা হলেন ফেরদৌস খান আলমগীর, তানভীর খান আলমগীর ও আজাদ খান আলমগীর। তানভীর খান আলমগীর সপরিবারে কানাডা রয়েছেন। বাকি দুই ভাইয়ের হদিস নেই।
অভিযোগ উঠেছে, খেলাপিঋণ থেকে বাঁচতে এবং বীমার টাকা পেতে বাসে আগুন দিয়েছে বাগদাদ গ্রুপের লোকজনই। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং আশপাশের বাসিন্দারা বলছেন, ডিপোর বাসগুলোয় দিনের বেলা আগুন লাগার কোন কারণ নেই। ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের মতে, আগুন লাগার ঘটনাটি নাশকতা নয়। এটি ‘সাবোটাজ’ নাকি দুর্ঘটনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিসের উপ সহকারী পরিচালক নিউটন দাশ বলেছেন, ‘১০ বাস পুড়ে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি এখনো নির্ণয় করা হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হবে।’ ঘটনার দিন বাগদাদ এক্সপ্রেসের কর্মকর্তা সোহেল ইকবাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘১১টি গাড়ির মধ্যে সাতটি চালু ছিল। কী কারণে আগুন লেগেছে, তা বুঝতে পারছি না। এত অল্প সময়ে কীভাবে বাসগুলো পুড়ল, তাও বুঝতে পারছি না।’
এদিকে আজ শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় চার হাজার বর্গফুট আয়তনের ওই ডিপোটিতে গাদাগাদি করে রাখা ৯টি বাস (মার্সিডিজ বেঞ্জ) পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ডিপোর পশ্চিম পাশে অন্যান্য বাস থেকে কিছুটা দূরত্বে থাকা একটি বাস আংশিক পুড়েছে; স্বাভাবিক দুর্ঘটনা হলে এই বাসে আগুন লাগার কথা নয়।

ডিপোটির উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম- তিন পাশে আছে সীমানা দেয়াল। উত্তরে সীমানা দেয়াল ঘেঁষে দুটি তিনতলা, একটি চারতলা এবং একটি পাঁচতলা আবাসিক ভবন আছে। ডিপোটিতে ঢোকার মুখেই ডান পাশে আছে ‘এস এ ইকুপমেন্ট সার্ভিস’ নামে একটি গ্যারেজ। সেটিতে এস্কেভেটর মেরামত করা হয়। এ গ্যারেজের সামনে আছে আরেকটি গ্যারেজ। এটির নাম ‘মালেক শাহ এন্টারপ্রাইজ’। ডিপোর সামনে দক্ষিণ পাশে আছে এস্কেভেটর মেরামতের দুটি গ্যারেজ। এরমধ্যে একটির নাম ‘এপোলো করপোরেশন’। অন্যটির সাইনবোর্ড নেই।
দেখা গেছে, ডিপোর ভেতরে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া ৮টি বাস রাখা আছে গাদাগাদি করে। পশ্চিম পাশের উত্তর কোণায় কিছুটা দূরত্বে রাখা আছে একটি বাস। ডিপোর ভেতরে দক্ষিণ পাশে ৫-৬ ফুট দূরত্বে রাখা হয়েছে বড় একটি স্কাবেটর। ডিপোটিতে ঢোকার মুখে ডান পাশে আছে ‘এস এ ইকুপমেন্ট সার্ভিস” এর টিনশেড ঘর। বাম পাশে মেরামতের জন্য রয়েছে ছোট ও মাঝারি আকারের চারটি এস্কেভেটর। আগুনে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বড় স্কাবেটরটি। এটির মালিক মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, ‘আগুনে আমার এস্কেভেটরের কেবিন, ক্যাবল পুড়ে গেছে। তবে বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি।’
এ আলমগীর ছিলেন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টা হবে। দুপুরের খাবারের সময় হওয়ায় গ্যারেজের সবাই চলে গেছেন ভাত খেতে। আমি গ্যারেজের অদূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এসময় কেউ একজন আগুন আগুন বলে শোর চিৎকার দেন। আগুনটা লেগেছে উত্তর পাশে রাখা একটি বাস থেকে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য বাসে। খবর দিলে আধাঘণ্টা পরে দুপুর দুইটার দিকে ঘটনাস্থলে আসে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি। প্রায় এক ঘণ্টায় দমকলকর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। ততক্ষণে ৯টি বাস পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।’
আজ শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে পুড়ে যাওয়া বাসগুলো দেখতে ঘটনাস্থলে যান অনেকেই। তাদের একজন মোহাম্মদ হারুন। পেশায় তিনি ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলরত একটি চেয়ার কোচের মালিক। পোড়া বাসগুলো দেখতে এক বন্ধুও তার সঙ্গে এসেছেন। প্রশ্ন করার আগেই হারুন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বাসগুলো রাখা হয়েছে খোলা আকাশের নিচে। ডিপোর পাশ দিয়ে সাধারণ মানুষের চলাচলের রাস্তা নেই। সিগারেট ফুঁকে বাসের দিকে ছুড়ে মারার সুযোগ নেই। তিন দিকে আছে সীমানা দেয়াল। সামনে আছে গ্যারেজ৷ ডিপোটিতে নেই কোন বিদ্যুতের ব্যবস্থা। ওয়েল্ডিংয়ের কাজও নেই। শুনেছি, ব্যাংকে বাগদাদ গ্রুপের অনেক দেনা। এটা নাশকতা নয়, দুর্ঘটনাও নয়। ব্যাংক ও বীমার টাকা মেরে দিতে নিজেরাই কোটি কোটি টাকা দামের বাসগুলোতে আগুন লাগিয়েছে।’

ঘটনাস্থলে দেখা মিলল ডিপোর দারোয়ান আরফ আলীকে। তার বাড়ি পটিয়ায়। বাগদাদ গ্রুপের অধীনে চাকরি করেন তিনি। পোড়া বাসগুলো পাহারা দিতে ঘটনার পর গতকাল বৃহস্পতিবার রাত থেকে ডিপোর দারোয়ান হিসাবে তাকে রাখা হয়েছে। বাসগুলো দেখার জন্য আগে কেউ ছিল না।
দারোয়ান আরফ আলী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘৪-৫ বছর আগে ১৫টি পুরনো মার্সিডিজ বেঞ্জ বাস এস আলম গ্রুপ থেকে কিনেছিল বাগদাদ গ্রুপ৷ সেসময় আমি মালিক পক্ষকে বাসগুলো কিনতে নিষেধ করেছিলাম। ১৫টির মধ্যে ১১টি এই ডিপোয় (পদ্ম পুকুর এলাকা) আছে ১১টি। বাসগুলো চলত ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার রুটে। কিছু বাস সচল ছিল। আর কিছু ছিল অচল। আগুন লাগার তো কোন কারণ দেখছি না।’
ঘটনাস্থলে দেখা গেছে, গাদাগাদি করে রাখা ৮টি বাস থেকে অন্তত ১০ ফুট দূরত্বে (পূর্ব পাশে) আছে একটি বাস। এটিও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তবে এ বাসে আগুন লাগা ‘রহস্যজনক’ বলে মনে করছেন কেউ কেউ। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এস্কেভেটর অপারেটর মো. রুবেল বলেন, ‘গাদাগাদি করে রাখা বাসে আগুন লেগেছে মানলাম। কিন্তু নিরাপদ দূরত্বে রাখা বাসটিতে কেন আগুন লাগল?’ ঘটনার আরেক প্রত্যক্ষদর্শী মো. ইকবালের ধারণা, কেউ ইচ্ছে করে বাসগুলোয় আগুন দিয়েছে।
জানা গেছে, ২০১৩ সালের দিকে ১৫টি মার্সিডিজ (এসি) বাস নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম- কক্সবাজার রুটে চলাচল শুরু করে বাগদাদ এক্সপ্রেস। কিন্তু চার-পাঁচ বছরেই থেমে যায় বাগদাদ গ্রুপের পরিবহন সেবা। অভিযোগ আছে, পরিবহন ব্যবসার নামে বাগদাদ গ্রুপ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এখন ঋণখেলাপি। বাগদাদ গ্রুপের কাছে যেসব ব্যংকের পাওনা আছে সেগুলো হল— ইসলামী ব্যাংকের ৫০ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ৪৬ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৩১ কোটি, ব্যাংক এশিয়ার ১২ কোটি, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের ১১ কোটি টাকা। এসব তথ্য বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে।
জানা গেছে, বাগদাদ গ্রুপের কর্ণধার চট্টগ্রামের রাউজানের ফেরদৌস খান আলমগীর। তার বাবা আইয়ুব খান ছিলেন সারের ডিলার। চট্টগ্রামের মাঝির ঘাটে সারের ব্যবসা থেকে একপর্যায়ে ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায় আসেন আলমগীর ও তার সহোদর। পরে মৎস্য আহরণ, আবাসন, পরিবহনসহ আরো কয়েকটি ব্যবসায়ের জন্য মেসার্স আলমগীর ব্রাদার্স, বাগদাদ ট্রেডিং, ফেরদৌস এন্টারপ্রাইজ, বাগদাদ এক্সিম করপোরেশন, বাগদাদ পরিবহন, বাগদাদ প্রপার্টিজ নামে প্রতিষ্ঠান খোলেন তারা। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণসুবিধা নিয়ে প্রথমে ভালো লেনদেন করলেও পরবতীতে ঋণ পরিশোধে গড়িমসি শুরু করে বাগদাদ গ্রুপ।
ব্যাংক এশিয়ার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হেড অব ব্রাঞ্চ (শেখ মুজিব রোড) আলী তারেক পারভেজ বলেন, ‘২০০৩ সালের দিকে ব্যাংক এশিয়া শেখ মুজিব রোড শাখা থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন বাগদাদ গ্রুপের কর্ণধার ফেরদৌস খান আলমগীর। তখন সরকারি আদেশে সার আমদানি করত মেসার্স আলমগীর ব্রাদার্স। সার আমদানির নামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণসুবিধা নিলেও ফেরদৌস খান আলমগীর ওই টাকা বিনিয়োগ করতেন অন্যান্য খাতে। কিন্তু সেসব ব্যবসায় লোকসান হলে ঋণ পরিশোধে গড়িমসি শুরু করেন আলমগীর। এ অবস্থায় বাগদাদ গ্রুপের কাছে ব্যাংক এশিয়ার পাওনা সাড়ে ১১ কোটি টাকা আদায় খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। ২০১০ সালে বাগদাদ গ্রুপের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। কিন্তু ঋণের টাকা আজও উদ্ধার হয়নি।’
জানা গেছে, বর্তমানে বাগদাদ ট্রেডিংয়ের কাছে রূপালী ব্যাংকের মোট পাওনা ৪৫ কোটি ৬৮ লাখ ৭৪ হাজার ৮৫ টাকা। মামলার আট বছর পার হলেও ঋণের টাকা ফেরত না পাওয়ায় ২০১০ সালে বাগদাদ গ্রুপের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে রূপালী ব্যাংক, আগ্রাবাদ শাখা। ওই মামলায় তিন সহোদর ফেরদৌস খান আলমগীর, তানভীর খান আলমগীর ও আজাদ খান আলমগীরকে বিবাদী করা হয়। মামলার আট বছর পার হলেও ঋণের টাকা আজও পায়নি রুপালী ব্যাংক।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী জিয়া হাবিব আহসান বলেন, ‘পরিবহন ব্যবসার জন্য ঋণ নিয়েছে বাগদাদ পরিবহন। ঋণের টাকায় সড়কে গাড়ির ব্যবসা করেছে ঠিকই, কিন্তু ব্যাংকের পাওনা শোধ করেনি। দীর্ঘ পাঁচ বছরেও ব্যাংকঋণ শোধ না করায় সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে ব্যাংক। বর্তমানে মামলাটি চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন।’
এদিকে খেলাপি ঋণের ৯ মামলায় গত বছরের আগস্ট মাসে কানাডা থেকে দেশে ফিরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার হন বাগদাদ গ্রুপের চেয়ারম্যান ফেরদৌস খান আলমগীরের স্ত্রী মেহেরুন নেছা (৫০)। ঢাকার ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে নগরের খুলশী থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছিল।
মেহেরুন নেছা নগরের ফিরিঙ্গিবাজারের নবী দোভাষের মেয়ে। মেহেরুনের চাচা জহিরুল আলম দোভাষ মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান। নগরের খুলশীর জাকির হোসের সড়কের পূর্ব নাসিরাবাদ এলাকার তানভীর হাউজে মেহেরুন নেছাদের বাড়ি।