শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

করোনা-লকডাউনের মাঝেই সিটি মেয়রের প্রমোদভ্রমণ!

| প্রকাশিতঃ ৯ এপ্রিল ২০২১ | ১:৪৬ অপরাহ্ন

মোহাম্মদ রফিক : করোনা ভাইরাস সংক্রমণরোধে বান্দরবান জেলার পর্যটন স্পটগুলো দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল গত ৩১ মার্চ। কিন্তু বান্দরবান জেলা প্রশাসনের এ নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বৃহস্পতিবার (৮ মার্চ) সেখানকার ‘ভেনাস রিসোটে’ প্রমোদ ভ্রমণে গেলেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি পরিস্থিতির মধ্যে নগর পিতার এমন ‘প্রমোদভ্রমণ’ নিয়ে সচেতন মহলে প্রশ্ন ওঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। অনেকের প্রশ্ন-সারাদেশের ভ্রমণ-পিপাসুদের জন্য বান্দরবান জেলা প্রশাসনের এক নিয়ম সিটি মেয়রের জন্য কি তাহলে আরেক নিয়ম?

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বান্দরবান জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরিজি শুক্রবার সকালে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘করোনা সংক্রমণরোধে আমরা পর্যটন স্পটগুলো বন্ধ রেখেছি। চট্টগ্রাম সিটি মেয়র একজন সম্মানিত মানুষ। উনি ভেনাস রিসোটে গেলেন তখন আমাদের লোকজন তার জন্য গেট খুলে দিয়েছে। তার সঙ্গে যারা এসেছেন তারা সবাই করোনা টেস্ট করেই এসেছেন। এছাড়া আমরা অন্য কোনও পর্যটককে সেখানে ঢুকতে দিইনি।’

জানা গেছে, বান্দরবান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্লা শৈ হ্লা’র আমন্ত্রণে নীলাচল এলাকার ভেনাস রিসোটে মধ্যাহ্নভোজেও অংশ নেন সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। সেই ভুড়িভোজের ছবি নিজের ফেসবুক পেইজে আপলোড করেন সিটি মেয়র রেজাউল। তবে শুক্রবার সকালে তার ফেসবুকে ঢুকে দেখা গেল, বান্দরবান পর্যটনকেন্দ্র ‘ভেনাস রিসোটে’ তোলা সেসব ছবি তিনি ডিলিট করে দিয়েছেন।

মেয়রের বিশাল সফরসঙ্গীর উল্লেখযোগ্য ছিলেন প্যানেল মেয়র মো. গিয়াসউদ্দিন, সাবেক প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর নিছার উদ্দিন আহমদ মঞ্জু, কোতোয়ালী থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাসান মনসুর ও সাবেক যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ মাসুম চৌধুরী।

হাসান মনসুর বৃহস্পতিবার তার ফেসবৃক টাইমলাইনে সিটি মেয়রের সাথে তোলা কিছু ছবি শেয়ারও করেছেন। এসব দেখে অনেকেই তাদের শুভকামনা জানিয়ে কমেন্ট করলেও শামসুদ্দিন খালেদ নামে একজন লিখেছেন ‘মনে হয় লকডাউন নাই।’

মোহাম্মদ মাসুম চৌধুরীর ‘মেঘ ও মেয়রের সাথে বান্দরবান নীলাচলে’ শীর্ষক ক্যাপশনে আপলোড দেওয়া ছবি দুটিকে সস্তা প্রশংসায় ভাসতে দেখা গেলেও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ সম্পাদক হাবিবুর রহমান তারেক সেখানে মন্তব্য করেন- ‘রাতদিন পরিশ্রম করলাম আমরা আর আপনারা মনের সুখে বান্দরবান ঘুরেন। আহারে সুখ-সুখরে।’

এদিকে বাংলাদেশ কারাতে ফেডারেশনের উদ্যোগে আয়োজিত বান্দরবানের ওই রিসোটে বঙ্গবন্ধু কারাতে প্রতিযোগিতার সমাপনী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়ে সিটি মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি সেখানে কোনও প্রমোদ-ভ্রমণে যাইনি। ওই প্রোগ্রাম ১৫ দিন আগেই নির্ধারিত ছিল। সেখানে বান্দরবানের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।’

‘করোনার ভয়াবহ উর্ধ্বগতিতে দেশে লকডাউন চলছে। রাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানও বাতিল করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে এই অনুষ্ঠানটিও কি বাতিল করা যেত না?’- এমন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি মেয়র।

জানা গেছে, গত ৩১ মার্চ জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসক ইয়াসমিন পারভীন তিবরিজির সভাপতিত্বে ‘করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয়’ শীর্ষক সভায় পযটন স্পটগুলো দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ওই সময় জেলা প্রশাসক ইয়াসমিন পারভীন তিবরিজি বলেন, ‘করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করায় সংক্রমণ রোধে গত ১ এপ্রিল থেকে আগামী দুই সপ্তাহের জন্য বান্দরবান জেলার সবগুলো পর্যটন স্পট বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আবাসিক হোটেলগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দুই সপ্তাহের পর পরবর্তী নির্দেশনা দেওয়া হবে।’

কিন্তু সেই নিয়ম জেলা প্রশাসক নিজেই ভাঙলেন। ‘সম্মানিত ব্যক্তি’ দোহাই দিয়ে মেয়র ও তার সফরসঙ্গীদের নিজেই স্বাগত জানালেন জেলা প্রশাসক ইয়াসমিন পারভীন তিবরিজি। এমন অভিমত দিয়ে সচেতন মহলের প্রশ্ন- ‘সম্মানিত’ মানুষ হলেই কি তার জন্য নিয়ম-কানুন আলাদা? ‘সম্মানিত’দের কি করোনা ধরে না, কিংবা তারা করোনা ছড়ায় না?