শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

পুলিশের বন্দর জোনের চমক দেওয়া, সাধারণের চমকে যাওয়ার গল্প

| প্রকাশিতঃ ২৪ এপ্রিল ২০২১ | ২:০১ অপরাহ্ন

একুশে প্রতিবেদক : ১৪ এপ্রিল থেকে লকডাউন চলছে। সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত লকডাউন থাকবে। কিন্তু খেটে খাওয়া মানুষেরা কীভাবে জীবনযাপন করছেন? কীভাবে কাটছে তাদের দিনগুলো? সামনের দিনগুলোই বা কাটবে কেমন? দিনকাল যেভাবেই কাটুক না কেন, সবার আগে তাদের প্রয়োজন একমুঠো খাবার। সেই খাবার বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে পুলিশ।

চলমান করোনা ভাইরাস মোকাবিলার অংশ হিসেবে মুটে-মজুর ও দরিদ্র-অসহায় মানুষের পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) বন্দর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার এস এম মেহেদী হাসান। এজন্য বন্দর জোনের পুলিশের সদস্যরা নিজেদের বেতনের টাকা দিচ্ছেন। এছাড়া বিত্তবান, ব্যবসায়ীরাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তা দিয়ে খাদ্যসামগ্রী কিনে প্রায় ১২ হাজার পরিবারের মাঝে খাবার পৌঁছে দিচ্ছে পুলিশ।

নিত্যপণ্য প্যাকেটে ভরার বিশাল এ কর্মযজ্ঞ চলছে বন্দর রিপাবলিক ক্লাবে। তাতে অংশ নিচ্ছেন বন্দর জোনের অধীন বন্দর, ইপিজেড, পতেঙ্গা ও কর্ণফুলী থানার পুলিশ সদস্যরা। তাদের কেউ ট্রাক থেকে চালের বস্তা নামাচ্ছেন। আবার কেউ চাল, ডালসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী প্যাকেটে ভরছেন। এ কর্মযজ্ঞে আছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। প্যাকেট করা শেষে খাদ্যসামগ্রী নিয়ে লকডাউনে অসহায় মানুষের বাড়িতে বাড়িতে যাচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা।

সিএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (বন্দর) অলক বিশ্বাস জানান, প্রতিটি পরিবারের কাছে পৌঁছানো সিএমপির লোগোযুক্ত প্যাকেটে থাকছে চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আলু, লবণ, সয়াবিন তেল, ছোলা এবং সাবান। প্রতিটি প্যাকেটে যে পরিমাণ সামগ্রী দেওয়া হচ্ছে তাতে চারজনের একটি পরিবার অন্তত ১৫ থেকে ২০ দিন চলতে পারবে বলে এ পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

এদিকে দুস্থদের সহায়তা করার জন্য কমিউনিটি পুলিশিং ও বিট পুলিশিং ধারণা বা কার্যক্রমকে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রত্যেকটি বিটে একজন করে অফিসার আছেন। কমিউনিটি পুলিশিং করার জন্য বিভিন্ন এলাকায় আগে থেকে কমিটি গঠন করা হয়েছে। দরিদ্রদের তালিকা করার ক্ষেত্রে এসব কমিটির সহযোগিতা নিচ্ছে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট বিট অফিসার তালিকা যাছাই-বাছাই করে দেখেন।

আবার সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তালিকা তৈরির কাজ তদারকি করেন। ওই তালিকা অনুযায়ী প্রতি রাতে একেকটি থানার আওতায় অন্তত দেড়’শ পরিবারে পৌঁছানো হচ্ছে মানবিক সহায়তা। প্রতিদিন মধ্যরাতে সংশ্লিষ্ট থানার ওসির তত্ত্বাবধানে শুরু হয় মানুষের ঘরে ঘরে সহায়তা পৌঁছানোর কার্যক্রম। রাতের এ কার্যক্রম অংশ নেন ঊর্ধ্বতনরাও।

আগ্রাবাদ গোসাইলডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা আবদুর রহিম মোবাইল সার্ভিসিংয়ের কাজ করে সংসার চালান। চলমান লকডাউনে তার দোকান-কাজ সবই বন্ধ। মা-সহ ৭ সদস্যের পরিবার নিয়ে পড়েছিলেন বেকায়দায়। সঙ্কোচের কারণে বলতেও পারছিলেন কাউকে। সেই রহিমের ঘরেই গেল তিনদিন আগে বিশাল এক খাবারের পুটলা, যে পুটলা নিয়ে হাজির হয়েছেন পুলিশের দুই সদস্য। দরজা খুলেই রীতিমতো ভড়কে গিয়েছিলেন রহিম- হঠাৎ পুলিশ কেন? পেটের জ্বালার মাঝে এ আবার কোন জ্বালা? লকডাউন সঙ্কটে কোন বিপদেই না পড়লেন আবার- মুহূর্তেই রহিমের শঙ্কার ঘোর কেটে যায় পুলিশের মানবিক উচ্চারণ আর মানবিক প্যাকেটে- ‘হ্যাঁ, প্যাকেটটি আপনার জন্য, করোনা-সঙ্কটে আমরাই আছি আপনার পাশে।’

যে পুলিশকে নিয়ে এত ভয়, আতঙ্ক ছড়ানো গল্প- সেই পুলিশই মানবিক হাতছানি নিয়ে সঙ্কটে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে কল্পনারও অতীত ছিলো আবদুর রহিমের। একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, পুলিশের কাছে যে মানবতা দেখেছি তা আমার কল্পনাকে হার মানিয়েছে। নানা কারণে যে পুলিশ আমাদের কাছে আতঙ্ক ছিলো সেই পুলিশই এখন আমাদের নির্ভরতা, বন্ধু ও বিশ্বস্ততার প্রতীক হয়ে ওঠছেন।-যোগ করেন আবদুর রহিম।

এ প্রসঙ্গে সিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (বন্দর) এস এম মেহেদী হাসান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘লকডাউন ও করোনা পরিস্থিতির কারণে নি¤œ আয়ের মানুষেরা তো বটেই এমনকি মধ্যবিত্ত মানুষেরাও বিপদে পড়েছেন। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকের নিত্য প্রয়োজনীয় খাবার কেনার টাকাও নেই। এ অবস্থায় আমরা কর্মহীন, অসহায়দের খাবার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। গোপনে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘গত ১৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এ মানবিক সহায়তার প্রথম ধাপে আমরা ৬ হাজার পরিবারকে ১০০ মেট্রিকটন খাদ্য সহায়তা দিয়েছি। এর মধ্যে ৬০ টন চাল, ৬ টন করে ডাল ও পেঁয়াজ এবং ১২ মেট্রিক টন আলু ছিল। ২২ এপ্রিল থেকে দ্বিতীয় ধাপে আরও ৬ হাজার পরিবারকে আমরা ১০০ মেট্রিকটন খাদ্য সহায়তা দিচ্ছি। এক্ষেত্রে সাহায্যগ্রহীতার গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সাহায্যগ্রহীতার ছবি যাতে কেউ না তোলে।’

এ উদ্যোগ অপরাধ কমতেও সাহায্য করবে জানিয়ে এস এম মেহেদী হাসান বলেন, ‘মানুষের ঘরে খাবার না থাকলে মানুষের মধ্যে অপরাধের চিন্তা কাজ করতে পারে, এলাকায় চুরি, ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধও বাড়তে পারে। তাই এ ধরনের উদ্যোগের ফলে অপরাধ কমবে। ভালো মানুষরা পুলিশকে ভয় করবে না। মানুষ নিজ থেকে পুলিশকে বিশ্বাস করবে, বন্ধু ভাববে।’

এ খাদ্যসহায়তার খরচের জোগানের বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তা এস এম মেহেদী হাসান বলেন, ‘খাদ্যসামগ্রী কেনার জন্য বন্দর জোনে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের কাছ থেকে অনুদান নিয়ে আমরা একটি তহবিল গঠন করেছি। এর বাইরে কিছু সহৃদয়বান ব্যক্তি আমাদের কাজে সহযোগিতা করছেন। তারা এমনিতেই ব্যক্তিগত তহবিল থেকে অসহায়দের খাদ্য সহায়তা দিয়ে আসছেন। এক্ষেত্রে দেখা যায়, কেউ কেউ দিনের মধ্যে একাধিকবার সহায়তা পেয়ে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ একেবারেই পাচ্ছেন না। এমন অবস্থায় এসব বিত্তবান ব্যক্তিরা পুলিশের মাধ্যমে সহায়তা বিতরণ করছেন। এক্ষেত্রে সাহায্যদাতাদের কাছ থেকে নগদ টাকা নেওয়া হয় না। আমরা খাদ্যপণ্য কিনে তাদের কাছে বিলটি পাঠিয়ে দিচ্ছি।’

সিএমপির বন্দর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার এস এম মেহেদী হাসান গত বছর করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর সময় দক্ষিণ জোনে কর্মরত ছিলেন। সে সময় দক্ষিণ বিভাগের চার থানার অধীনে ২৫ হাজার পরিবারের প্রায় এক লাখ মানুষকে মানবিক সহায়তা দিয়েছিলেন তিনি।