
একুশে প্রতিবেদন : পুলিশ বা আইন প্রয়োগকারী কোনও সংস্থা নয়, চলমান লকডাউন বাস্তাবায়নে কক্সবাজারে মুভমেন্ট পাস চেক করতে দেখা গেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের। মুভমেন্ট পাস দেখাতে না পারলে আটকে দেওয়া হচ্ছে গাড়ি। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের স্টাইলে লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেও দেখা গেছে সংশ্লিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কক্সবাজার শহরের প্রবেশপথ লিং রোড, উপজেলা বাজার, কলাতলীর ডনফিন মোড়সহ পৌরসভার সড়ক ও উপসড়কের মোড়ে মোড়ে সবধরনের গাড়ি থামিয়ে ‘মুভমেন্ট পাস’ চেক করছে স্বেচ্ছাসেবক হয়ে কক্সবাজার পৌর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এসময় মাস্ক ব্যবহারের পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান করতেও দেখা যায় তাদের।
ইতিমধ্যে পৌর আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ‘মুভমেন্ট পাস’ যাচাই ও জিজ্ঞাসাবাদের কয়েকটা ভিডিও সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়- কার, নোহা, বাইক ও টমটমসহ প্রত্যেক যানবাহন থামিয়ে পুলিশি স্টাইলে ‘মুভমেন্ট পাস’ আছে কিনা যাচাই করছেন তারা।
একটি ভিডিও’র কমেন্ট সেকশনে জসিম উদ্দীন নামের একজন লিখেছেন, ‘এইসব স্বেচ্ছাসেবকদের দ্বারা সাধারণ মানুষ নাজেহাল হচ্ছে। আমাদের দেশে এতো প্রশাসনের লোক থাকা সত্ত্বেও আদৌ কথিত স্বেচ্ছাসেবীদের প্রয়োজন আছে কি?’
আইনজীবী আব্দুল হামিদ লিখেছেন, এসব স্বেচ্ছাসেবকদেরকে মুভমেন্ট পাস চেক করার ক্ষমতা কে দিয়েছে? এই কথিত লকডাউনের কারণে যারা অনাহারে আছেন তাদেরকে খাবার দেন। গাড়ি চেক করতেছে, না চেকের নামে ধান্দায় ব্যস্ত?
আইনজীবী মীর মোশারফ হোসেন টিপু লিখেছেন, তারা কেন এগুলো করবে। কক্সবাজার কি বাংলাদেশের বাইরের আইন দিয়ে পরিচালিত হয়। গাড়ি চেক করার ক্ষমতা কেউ তাদের দেওয়ার অধিকারও রাখে না।
মো. ইউনুচ নামের এক দুবাই প্রবাসী বলেন, মুভমেন্ট পাসের অজুহাতে প্রথমে কক্সবাজার শহরের প্রবেশপথ লিংকরোড পরবর্তী কলাতলীর মোড়, সর্বশেষ কক্সবাজার শহরের বাহারছড়া মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে আমাকে বহনকারী একটা সিএনজি আটকে দেয় স্বেচ্ছাসেবক টিমের সদস্যরা।
এসময় আমি পাসপোর্ট দেখিয়ে বিদেশ ফিরতে দুইদিন বাকি, বিমানের টিকেট জটিলতার পড়ার বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করে আকুতি জানালেও গাড়ি আটকে রাখা হয়। পরে আমার এক পরিচিত সাংবাদিক এসে গাড়িসহ আমাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়।
ইউনুচ বলেন, রিক্সায় করে বাজারের ব্যাগ হাতে নেওয়া মানুষগুলোর কাছেও স্বেচ্ছাসেবকরা মুভমেন্ট পাস আছে কিনা চানতে চাচ্ছেন। বিষয়টি হাস্যকর ও লজ্জার। ইউনুচের প্রশ্ন পুলিশ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা থাকতে কেন সাধারণ জনগণকে আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবক টিমের হয়রানী?
জানতে চাইলে স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্বে থাকা কক্সবাজার পৌর আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মী জানান, করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে লকডাউন কার্যকর করতে মুভমেন্ট পাস ছাড়া যেন কোনও গাড়ি চলাচল করতে না পারে সে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তাদের। তবে অ্যাম্বুলেন্স, ওষুধ সরবরাহকারী গাড়ি, রোগী বহানকারী গাড়ি ও জরুরি সেবায় নিয়োজিত গাড়িগুলোর ‘মুভমেন্ট পাস’ লাগবে না। প্রশাসন ও কক্সবাজার পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ নজিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক উজ্জ্বল কর এসব নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানান তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে সরবরাহ করা পরিচয়পত্র গলায় ঝুলিয়ে ১৮০ স্বেচ্ছাসেবক লকডাউন কার্যকরে কাজ করছেন। তাদের বেশিরভাগই কক্সাবাজার পৌর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। কক্সাবাজার পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ নজিবুল ইসলাম তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
‘মুভমেন্ট পাস’ চেক করার বিষয়টা অবগত করে চানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, মুভমেন্ট পাস চেক করা ও কাউকে জিঙ্গাসাবাদ করা কোনো দলের নেতাকর্মী বা স্বেচ্ছাসেবকদের কাজ নয়।
তিনি বলেন, স্বেচ্ছাসেবকদের কাজ হলো, সাধারণ মানুষকে মাস্ক পড়তে বলা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে অনুরোধ করা ও সচেতনতা সৃষ্টি করা ইত্যাদি। ‘মুভমেন্ট পাস’ চেক কারার বিষয়টা খোঁজ নিয়ে দেখা হবে বলে জানান ডিসি মো. মামুনুর রশীদ।
জানতে চাইলে কক্সবাজার পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ নজিবুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন সবাই মিলে আমাদের একটা মিটিং হয়েছে। যেহেতু ওনাদের লোক কম তাই লকডাউন বাস্তবায়ন করার জন্য আমাদের স্বেচ্ছাসেবকদের একটা তালিকা করে তাদের সহায়ক হিসেবে আমাদেরকে মুভমেন্ট পাস, বাজার ব্যবস্থপনা, মার্কেট ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বেচ্ছাসেবায় কাজ করতে বলা হয়েছে।’
পুলিশের ‘মুভমেন্ট পাস’ চেক করার অধিকার আপনাদের আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অধিকার যদি না থাকে তাহলে আমরা কাজটা করছি কার জন্য? আর আমরা তো সরকারি কর্মচারিও না, আমরা লকডাউন বাস্তবায়ন করছি মহামারি কমানোর জন্য।
কথোপকথনের এক পর্যায়ে জনসাধারণকে হয়রানির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিবেদকের সাথে অশোভন আচরণ করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন নজিবুল ইসলাম।