শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

‘ড্যান্ডি’তে আসক্ত পথশিশুরা, কিশোর অপরাধের নতুন মাত্রা!

| প্রকাশিতঃ ২৩ মে ২০২১ | ৬:০৪ অপরাহ্ন


আবছার রাফি : পরনে অপরিচ্ছন্ন পোশাক, ধূলাবালিতে ঘর্মাক্ত দেহ। কুড়িয়ে পাওয়া প্লাস্টিক, লোহা কিংবা পুরনো জিনিসের বস্তা ঘাড়ে নিয়ে নগরের অলি-গলিতে হরহামেশা উসখুস-বিতিকিচ্ছিরি দৃশ্যসমেত দেখা মিলে পথশিশুদের। শিক্ষাসহ নানাক্ষেত্রে সুবিধাবঞ্চিত এসব পথশিশুরা দিনকেদিন জড়িয়ে পড়েছে ‘ড্যান্ডি’ নামক নতুন নেশায়। নেশায় আকন্ঠ বুঁদ হওয়া সেই পথশিশুদের দিয়ে নানা ধরণের অপরাধ করিয়ে সুবিধা নিচ্ছে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র।

গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় নগরীর মুরাদপুরস্থ ফুটওভার ব্রীজের সিঁড়িতে বসে এক পথশিশু সেবন করছিল ড্যান্ডি। আলো-আঁধারিতে ছল ছল করছে শিশুটির চোখ। কিছুটা কৌতূহলোদ্দীপক হয়ে কাছে যেতে না যেতেই সটকে পড়তে চায় শিশুটি। কিছু করা হবে না – এমন অভয় দিলে কথা বলতে রাজি হয় শিশুটি। জানায় তার নাম রাকিব। বয়স ১২ বছর হবে।

রাকিব বলে, ‘খেতে ভালো লাগে, তবে টাকার অভাবে নিয়মিত খেতে পারি না। ভাঙারি বিক্রি করে যা পাই তা দিয়ে একবেলা ভাত আর একবেলা এটা খাই। প্রথম প্রথম খেতাম না, বন্ধু আরিফের সহায়তায় মাসখানেক আগে মূচির (জুতো মেরামতকারী) দোকান থেকে গাম কিনি, ময়লার ভাঁগাড় থেকে ফ্রিতে পলিথিন নিয়ে নেশা করা শুরু করেছি। এখন ড্যান্ডি না খেয়ে থাকতে পারি না।’

এক সময়ের খুচরা গাঁজা বিক্রেতা রাকিব আরও জানায়, বছর তিনেক আগে মারা যায় তার মা। বাবা রিকশা চালায়। তিনিও মাদকাসক্ত বিধায় রিকশার গ্যারেজে পড়ে থাকেন। রাকিবের খোঁজ নেয়ার সময় মেলে না মাদকাসক্ত বাবার। অগত্যা ক্ষুধার জ্বালায় রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে রাকিব। এক সময় তার এক পথশিশু বন্ধুর প্রস্তাবে গাঁজা বহন করে টাকা ইনকাম করতো রাকিব। একদিন খদ্দের গাঁজা নিয়ে টাকার বদলে বেধড়ক পেটায় রাকিবকে। সে কথা বিশ্বাস না করে উল্টো আবারও মারধর করে মূল গাঁজা বিক্রেতাকে। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ব্যাথায় কাতর হয়ে দিন কেটেছে তার।’

কেন ‘ড্যান্ডি’ সেবন করছে পথশিশুরা?

পেটের ক্ষুধা নিবারণে কখনো ভাঙারি কখনো ফুল-সংবাদপত্র বিক্রি করতে দেখা যায় তাদের। বিক্রি করে যে ক’টা টাকা পায় তাতে ঠিকমতো জুটে না দু’বেলা-দু’মুঠো ভাত। ফলে ক্ষুধার কষ্ট মেটাতে বিকল্প পথে হাঁটা শুরু করেছে এসব পথশিশুরা। পলিথিনে গাম ঢুকিয়ে ঘ্রাণ নিলে ক্ষুধা দূর হয়ে যায়, যা তাদের ভাষায় ‘ড্যান্ডি’ নামেই পরিচিত।

অন্যদিকে সহজলভ্য ‘ড্যান্ডি’ নামক এই নেশা জাতীয় দ্রব্যটি রাবার, চামড়াজাত দ্রব্য বা জুতা ও ফার্নিচার তৈরিতে ব্যবহৃত এক ধরনের আঠা ড্যানড্রাইট অ্যাডহেসিভ বা ড্যান্ড্রাইট (গাম)। নগরের বিভিন্ন হার্ডওয়্যারের দোকানে সলিউশন নামে এসব আঠা জাতীয় দ্রব্য ৮০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি করা হয়। পথ শিশুরা মূলত মুচি এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অল্প পরিমাণে এ গাম কিনে নিয়ে নেশা করে থাকে।

ড্যান্ডি সেবনের পরিণতি কী?

এ নেশাদ্রব্য গ্রহণ করে মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ায় তাদের দিয়ে নানা ধরণের অপরাধ করিয়ে নিচ্ছে অপরাধী চক্র। এছাড়া নেশার টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে শিশুরা চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে বিভিন্ন তথ্য-উপাথ্য গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্যমতে, পথশিশুদের ৮৫ শতাংশই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মাদকে আসক্ত। যেখানে ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সী পথশিশুরা মাদক সেবন করে। সাধারণত তাদের নেশাদ্রব্যের ভেতর রয়েছে গাঁজা, ড্যান্ডি, পলিথিনের মধ্যে গামবেল্ডিং দিয়ে ও পেট্রল শুঁকে নেশা করা।

নিরাময় বা পুনর্বাসন: কী বলছেন চিকিৎসকরা?

জানতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মো. ফোরকান উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ড্যান্ডি’ গ্রহণের কারণে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুরা। ড্যানড্রাইট আঠা সেবনের কারণে শ্বাসকষ্ট, লিভার, কিডনির রোগসহ শিশুরা মানসিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শরীরের কোষ নষ্ট হওয়ার কারণে মস্তিষ্কের কাজে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়।

তিনি বলেন, নেশাগ্রস্ত পথশিশুদের একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রথমে তাদের জন্য পথেই শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, সেখান থেকে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। এখানে আনার পর তাদের পরিবারের খোঁজ করতে হবে। খোঁজ না পেলে আশ্রয় কেন্দ্রে রেখে তাদেরকে নেশগ্রস্ত জীবন থেকে স্বাভাবিক জীবনে নিয়ে আসতে হবে।

কীভাবে ‘ড্যান্ডি’ আসক্ত পথশিশুদের সঠিক পথে ফেরানো যায়?

পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই সমস্যা রাতারাতি বন্ধ হবে না। এর জন্য সমন্বিত উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. ওবায়দুল করিম দুলালের কাছে। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পথশিশুরা শিক্ষা পাচ্ছে না, খাবার পাচ্ছে না। যার খাবারের নিশ্চয়তা নাই, শিক্ষার নিশ্চয়তা নাই, অর্থ উপার্জন করার কোনো মাধ্যম নাই, তখন সামাজিক ব্যবস্থা তাকে ছিনতাইয়ে নামতে বাধ্য করছে। এখন আপনি যদি ওই শিশুকে স্কুলে পাঠাতে পারেন, চাকরি দিতে পারেন, খাবারের নিশ্চয়তা দিতে পারেন; তাহলে ওই শিশুদের এ ধরণের অপরাধে সম্পৃক্ত হওয়ার কথা না।’

ড. ওবায়দুল করিম দুলাল বলেন, এছাড়া কোনো শিশুর মা-বাবা যদি ঝগড়াঝাঁটি করে। ভাই-বোনদের মাঝে সংহতি নেই, ডিগনিটি নেই; তারা মারামারি করে। এ ধরণের ভ্যালুলেস একটা সমাজে যদি একটা শিশু জন্ম নেয় সে সাইকোলজিক্যালি ডিপ্রেশনে ভোগে। তখন সে অপরাধের দিকে ধাবিত হয়। সে মনে করে ওখানে তার শান্তি আছে।

‘এ অবস্থায় ওই শিশুদের যদি শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করা যায়, প্রাত্যহিক জীবনে যদি তাকে আনন্দের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে তারা অপরাধে জড়িত হবে না। তখন তাদের ভেতর মোটিভেশন তৈরি করতে হবে, তুমি বড় হলে ডাক্তার হতে পারবা, ইঞ্জিনিয়ার হতে পারবা। এ কাজগুলো যদি যথাযথভাবে করা না যায় তাহলে মানসিকভাবে তার উন্নতি হবে না।’

‘শিশুশ্রমকে নিষিদ্ধ করতে হবে। আইএলও শিশুশ্রমকে নিষিদ্ধ করতে আন্দোলন করছে, প্রচার করছে। শিশুশ্রমকে নিষিদ্ধ করার পর ওই পরিবারের ভরণপোষণের যে বিষয় তা দেখতে হবে। ইন্টিগ্রিটেড ওয়েতে অ্যাপ্রোচ করতে হবে। আরও দেখতে হবে, এই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে আরও দশটা সমস্যা তৈরি হচ্ছে কি না।’ বলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. ওবায়দুল করিম দুলাল।