
চট্টগ্রাম : সাংবাদিক গোলাম সারওয়ারকে যারা অপহরণ করেছে তার অত্যন্ত প্রভাবশালী। তারা অপহরণ করলে জীবিত রাখে না। সেই দিক দিয়ে গোলাম সারওয়ারকে ভাগ্যবান উল্লেখ করে অপহরণকারীদের মামলা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) দাখিলের মাধ্যমে।
’মামলাটিতে তথ্যগত ‘ভুল’ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কোতোয়ালী থানার উপ পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) ধর্মেন্দু দাশ। তিনি লিখেন, প্রতিবেদনে তিনি লিখন, ‘তদন্ত সমাপ্ত হয়েছে৷ সকল প্রাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণে মামলাটি তথ্যগত ভুল মর্মে প্রতীয়মান হওয়ায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।
গত ৯ মে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা কোতোয়ালী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ধর্মেন্দু দাশ৷ এর আগে গত ৫ মে বিষয়টি লিখিতভাবে মামলার বাদি গোলাম সারোয়ারকে তিনি অবহিত করেন।
তবে বিষয়টি মানতে নারাজ অপহরণের শিকার সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার। তার অভিযোগ, আসামি চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে তদন্ত কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ আলামত সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজসহ অপহরণকারীদের সম্পর্কে সব ধরনের তথ্য দিলেও তদন্তকারী কর্মকর্তা রহস্যজনক কারণে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে সারওয়ার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ঘটনা তদন্তের এক পর্যায়ে এসআই ধর্মেন্দু দাশ আমাকে বলেন- একটি ব্যাংকের পরিচালকের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তারা খুব প্রভাবশালী। তারা কাউকে অপহরণ করলে জীবিত ফেরত আসার কথা না। এক্ষেত্রে আপনি (সারওয়ার) ভাগ্যবান।’
এ ব্যাপার জানতে চাইলে এসআই ধর্মেন্দু দাশ একুশে পত্রিকার কাছে বিষয়টি স্বীকার করলেও পরক্ষণে কথা ঘুরিয়ে ফেলেন। তিনি বলেন, ‘এটি আমার ব্যক্তিগত মতামত ছিল। প্রভাবশালীদের অপরাধের উদাহরণ দিতে গিয়েই আমি সাংবাদিক সারওয়ারকে এমনটা বলেছিলাম।’ তার মতে, ‘মামলাটিতে তথ্যগত ভুল ছিল। তদন্তে যা পেয়েছি, তাই চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দিয়েছি।’
এর আগে গত বছরের ২৮ অক্টোবর রাতে চট্টগ্রাম শহর থেকে গ্রামের বাড়ি চন্দনাইশ যাওয়ার সময় নগরের কাজির দেউড়ি এলাকা থেকে দুর্বৃত্তরা তাকে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালায়।
এ ব্যাপারে কোতোয়ালী থানায় দায়ের হয় অপহরণ মামলা। সারওয়ারকে জীবিত উদ্ধার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে আন্দোলনে নামে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন। একপর্যায়ে সাংবাদিক সমাজ চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনারের অফিস ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে। অপহরণের সপ্তাহ খানেক পর রাত পৌনে ৮টার দিকে সীতাকুণ্ডের কুমিরা বাজারের খালের পাশে আহত অবস্থায় পাওয়া যায় সারওয়ারকে। তাকে উদ্ধারের পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
মামলা দায়েরের পর গত ১০ নভেম্বর মো. শাহীন ও মো. ইব্রাহীম নামে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর তারা জামিন লাভ করেন। জামিন হওয়ার পর গত ২২ ডিসেম্বর ওই দুজনকে ৫ দিনের রিমান্ডে নিতে তদন্তকারী কর্মকর্তা ধর্মেন্দু দাশ আবেদন করেন।
গোলাম সারওয়ার বলেন, ‘অপহরণের পর ওরা আমাকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে দফায় দফায় পিটিয়েছে। আমার অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কয়েকটি নিউজ করেছিলাম। এরপর আমার মোবাইলে কয়েকবার অজ্ঞাত ব্যক্তির ফোন এসেছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘নিউজগান গরি ভালা ন গরো’। এসব ফোনকল চেক করা যেতে পারে।’
‘অপহরণের পর ওরা এটাও বলেছিল, ‘আর নিউজ করবি কি না বল?’ ওদের বারবার বলেছি, নিউজ করব না, প্লিজ আমাকে ছেড়ে দেন। তারপরও পিটিয়েছে। চোখে হাত দিতে দেয়নি। ওরা বলাবলি করছিল, ‘এটাকে স্যাম্পল হিসেবে নিয়েছি। মেরে ফেলার দরকার নাই। সাইজ করো।’ বলেন সারওয়ার।
সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার বলেন, ‘অপহরণ করে নির্মম নির্যাতনের পর আমার বিরুদ্ধে দেয়া হয়েছে দুটি মানহানি মামলা৷ অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিচার পাওয়া তো দুরের কথা, নিজেই হয়ে গেলাম মামলার আসামি। আমি এবং আমার স্ত্রী, সন্তান খুবই মানবেতর জীবনযাপন করছি। অপরাধ না করে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমি বাঁচতে চাই। সুন্দর একটি জীবন চাই।’