শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

মির্জাখিল দরবারের গেট : বিচারের বাণী কাঁদছে সরবে প্রকাশ্যে

| প্রকাশিতঃ ৩০ মে ২০২১ | ১:৩৬ অপরাহ্ন

একুশে প্রতিবেদক : ‘এ কথা ভাবতে অবাক লাগে যে, মির্জাখিল দরবার শরীফ কর্তৃপক্ষ সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত রাস্তায় গেট নির্মাণ করে ০.২১ একর খাস রাস্তা দখল করার অভিপ্রায়ে ৭-৮ বছর যাবত দেশের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত লড়াই করেছেন এবং সর্বত্র পরাজয় বরণ করেও পেশী শক্তি ও মাজার দরবার শরীফের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন হতে পারে এ ধুয়া তুলে ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যাখ্যা দিয়ে এখনো গেটটি টিকিয়ে রেখেছেন। অথচ গেট মাত্র ৬-৭ বছরের পুরাতন, এটা অপসারণ করা হলে তাতে দরবার শরীফ বা মুরিদানদের কোনও অসুবিধা হবে না, বরং দরবার শরীফের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। সরকারি খাস জমি বা রাস্তার উপরে যদি পাকা গেট নির্মাণ করে তাতে পবিত্র কালেমা তৈয়ব লিখে তা দখল করা যায় এবং সরকার যদি তাতে সায় দেয় তবে ভবিষ্যতের জন্য এটা একটা খারাপ নজির থাকবে। কাজেই এ ধরনের কার্যকলাপ প্রশ্রয় দেয়া সঠিক পদক্ষেপ নয়।’

১৯৯৮ সালে একটি তদন্ত প্রতিবেদনে উপরোক্ত কথাগুলো লিখেছিলেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) শরীফ তৈয়বুর রহমান। সাতকানিয়ার মির্জাখিল গ্রামে একটি সরকারি সড়ক দখল করে মির্জাখিল দরবার শরীফের পক্ষ থেকে গেট নির্মাণের ঘটনা তদন্ত করেছিলেন তিনি। তদন্ত শেষে ১৯৯৮ সালের ২৯ অক্টোবর জমা দেওয়া প্রতিবেদনে শরীফ তৈয়বুর রহমান আরও লিখেছিলেন, গেটটি উচ্ছেদের জন্য এর আগে আরও আটটি তদন্ত প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছিল।

শরীফ তৈয়বুর রহমানের দেওয়া উক্ত তদন্ত প্রতিবেদনের পর ২২ বছর ৭ মাস ১ দিন পার হয়েছে। কিন্তু এখনো গেটটি একই অবস্থায় আছে। এর আগে ১৯৯১ সালের ১৫ নভেম্বর সড়ক দখল করে ওই গেটটি নির্মাণ করা হয়। গেটটি লোহার গ্রিল দিয়ে বন্ধ করে দেওয়ায় কোনো যানবাহন ওই সড়ক দিয়ে প্রবেশ করতে পারছে না। অবৈধ গেটটি অপসারণের জন্য বিভিন্ন সময় আদালতের রায় এসেছে। এমনকি এ নিয়ে রাষ্ট্রপতির আদেশও এসেছেও। এরপরও গেটটি উচ্ছেদ করা যায়নি। আরও অপর প্রান্তে পিলার ফেলে রাস্তা ছোট করে ফেলা হয়েছে।

সর্বশেষ ২০১০ সালের ২ আগস্ট এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন অধ্যাপক ডা. এ এফ এম আমিনুল ইসলাম। গত সাড়ে ১০ বছরেও উক্ত রিট নিষ্পত্তি হয়নি। এ সময়ে রিট আবেদনটি শুনানির জন্য বিভিন্ন বেঞ্চে তারিখ পড়েছে ২৬২ বার। সর্বশেষ গত ৬ জানুয়ারি রিট আবেদনটি বিচারপতি নায়মা হায়দার ও বিচারপতি রাজিক-আল-জলিলের বেঞ্চ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। আবেদনটি এখন অন্য বেঞ্চে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক ডা. এ এফ এম আমিনুল ইসলাম।

এদিকে এই রিট আবেদনটি যে শেষ পর্যন্ত নিষ্পত্তি হবে তা এক অনিশ্চিত বিষয়। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ৯০ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘প্রশ্ন’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’। বেঁচে থাকলে হয়তো এখন তাঁকে লিখতে হতো, ‘বিচারের বাণী সরবে প্রকাশ্যে কাঁদে’।

এদিকে অবৈধভাবে স্থাপন করা গেটটি অপসারণের জন্য প্রথমবারের মতো ১৯৯১ সালে স্থানীয় জনসাধারণের পক্ষে জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করেন অধ্যাপক ডা. এ এফ এম আমিনুল ইসলাম। এ প্রেক্ষিতে গেটটি উচ্ছেদের জন্য ১৯৯২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এম আলী আহমেদ মির্জাখিল দরবার শরীফের গদিনশীল পীর মো. আরেফুল হাইকে নোটিশ দেন।

এতে উল্লেখ করা হয়, ‘স্থানীয় রাজস্ব কর্মকর্তার প্রতিবেদন হতে দেখা যায় যে, সাতকানিয়া উপজেলাধীন সোনাকানিয়া মৌজার সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত আর.এস ২২৭৩ দাগে জনসাধারণের চলাচলের রাস্তার উপর মির্জাখিল দরবার শরীফ কর্তৃক অবৈধভাবে পাকা গেট নির্মাণ করে জনসাধারণের চলাচলের উপর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। এমতাবস্থায় অত্র নোটিশ প্রাপ্তির ৭ দিনের মধ্যে দরবার শরীফ কর্তৃক অবৈধভাবে নির্মিত গেট বা প্রতিবন্ধকতা খুলে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা গেল। অন্যথায় বিধান অনুযায়ী অবৈধভাবে নির্মিত গেট অপসারণ বা উচ্ছেদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

উক্ত উচ্ছেদ আদেশ চ্যালেঞ্জ করে মির্জাখিল দরবার শরীফ কর্তৃপক্ষের পক্ষে আরিফুল হাই সাতকানিয়া সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মামলা করেন। মামলাটি ১৯৯৩ সালের ৩০ জানুয়ারি খারিজ হয়। দরবারের পক্ষে রিভিশন করা হলে সেটিও একই বছরের ৯ সেপ্টেম্বর খারিজ হয়। এরপর উচ্চ আদালতে আপিল করেন আরিফুল হাই। আপিল আবেদনটি ১৯৯৪ সালের ২০ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতিসহ পাঁচজন বিচারপতি আবেদনটি নাকচ করে দেন।

এর আগে ১৯৯৩ সালের ২৩ নভেম্বর মির্জাখিল গেট পরির্দশন করে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক বরাবর একটি প্রতিবেদন দিয়েছিলেন চট্টগ্রামের আরডিসি আবুল মনসুর মো. ফয়েজ উল্লাহ।

এতে তিনি লিখেছেন, “গত ১০-১১-৯৩ তারিখ সকাল ১১টায় সাতকানিয়া ভূমি অফিসে কর্মরত কানুনগো ও সার্ভেয়ারসহ বিষয়ে বর্ণিত রাস্তা পরিদর্শন করি। উক্ত রাস্তা উত্তর দক্ষিণে প্রায় ৭০০ ফুট লম্বা, পূর্বে কৃষি জমি, পশ্চিমে মির্জাখিল নামক দরবার শরীফ ও বাড়ি। জনসাধারণের চলাচলের গ্রাম্য রাস্তা হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। দক্ষিণ দিক থেকে প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত রাস্তায় ইট বিছানো আছে। বাকি অংশ কাঁচা। আর.এস ম্যাপ অনুসারে হয় যথাক্রমে ২১, ১৮, ১৫, ১০, ১০, পক্ষান্তরে বিএস ম্যাপ অনুসারে হয় যথাক্রমে ২১, ১৫, ১২, ১৯, ১৮ ফুট (ম্যাপ সংযুক্ত)। কিন্তু সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা যায়, রাস্তার প্রস্থ দক্ষিণ দিক হতে যথাক্রমে ১৩, ৮, ৯, ৬, ১৩, ১১, ১১ ফুট। দক্ষিণ দিক থেকে রাস্তার প্রবেশমুখে একটি পাকা গেট নির্মাণ করা হয়েছে। যাতে ২ থেকে ৩ ফুট জায়গা খোলা রেখে অবশিষ্ট জায়গা লোহার কপাট লাগানো আছে।

জনসাধারণের সাথে আলোচনায় জানা যায়, মির্জাখিল দরবার শরীফ কর্তৃপক্ষ উক্ত গেট নির্মাণ করেছে। এছাড়া দক্ষিণ দিক থেকে রাস্তার পশ্চিম পাশের ধান/শস্য ক্ষেতের আইল হতে প্রায় ২ থেকে ৩ ফুট পূর্বদিকে অর্থ্যাৎ ভিতরের দিকে সমান্তরাল কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে রাস্তার প্রস্থ অনেক কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া পুকুরের পার ভেঙে বা কেটেও রাস্তার প্রস্থ কমানো হয়েছে। রাস্তার মধ্যবর্তী স্থানে দেখা যায়, পুরাতন ইট বিছিয়ে রেখে রাস্তার প্রস্থ ৪ থেকে ৫ ফুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে। আলোচনাকালে জানা যায়, দরবার শরীফ উক্ত রাস্তা নিয়ন্ত্রণ করে এবং তারাই রাস্তার পাশে কাঁটাতারের বেড়া, ইট, লাকড়ি ইত্যাদি রেখেছে ও গেট নির্মাণ করেছে। ফলে স্বাভাবিক কারণে উক্ত রাস্তা সরকারি হলেও কোন যানবাহন চলাচল করতে পারে না।”

প্রতিবেদনে আরডিসি সুপারিশ করে লিখেছেন, ‘সরকারি রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা দেওয়ায় বা রাস্তার প্রস্থ কমানোর কোনও এখতিয়ার কারো নেই। এমতাবস্থায় বিবিধ মামলা রুজু করত: জনসাধারণের ব্যবহার্যে রাস্তা বিএস. রেকর্ড অনুসারে উদ্ধার করার আদেশ দেওয়া যায়।’

অন্যদিকে ১৯৯৩ সালে আরিফুল হাই তার ছোট ভাই হেলালুল হাইকে বাদী করে নিজে এক নম্বর বিবাদী সেজে পুনরায় সাতকানিয়া সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে একই বিষয়ে আরেকটি মামলা করেন। উক্ত মামলাটি ১৯৯৩ সালের ২৯ নভেম্বর খারিজ হয়। এরপর জজ আদালতে আপিল হলে সেটি ১৯৯৪ সালের ১৯ জুন খারিজ হয়। এরপর উচ্চ আদালতে সিভিল রিভিশন দায়ের হলে সেটি ১৯৯৭ সালের ২০ জানুয়ারি ডিসচার্জ হয়।

অপরদিকে গেটটি রক্ষার জন্য ১৯৯২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ৪৪২ নং স্মারক চ্যালেঞ্জ করে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আদালতে আরিফুল হাইয়ের পক্ষের জনৈক জে.বি.এম.মঈনুদ্দীনকে বাদী করে মিছ আপিল ১৯/৯৩ দায়ের করলে ১৯৯৪ সালের ১৪ মে তা খারিজ হয়। ভূমি আপিল বোর্ডে রিভিশন করলে সেটিও ২০০২ সালের ২০ অক্টোবর খারিজ হয়। পরবর্তীতে আরিফুল হাই বাদী হয়ে একই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে বিভাগীয় কমিশনার চট্টগ্রামের আদালতে মিছ মামলা দায়ের করলে সেটি ২০০২ সালের ১৯ নভেম্বর খারিজ হয়। এরপর আরিফুল হাই ভূমি আপিলের আদেশ ও অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারের আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন (৭২১৬/২০০২) করেন। তখন গেটটি সরকারি খাস জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে জানিয়ে রুল ডিসচার্জ করেন বিচারপতিগণ। এ বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করলে সেটিও ডিসমিস হয়।

২০০২ সালের ৩ এপ্রিল চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) গেটটি অপসারণের ব্যবস্থা নিতে মির্জাখিল দরবার শরীফের গদিনশীল পীর মো. আরেফুল হাইকে নোটিশ দেন। এতে উল্লেখ করা হয়, ‘আপনি নিম্ন তফসিল বর্ণিত সর্বসাধারণের ব্যবহার্য সরকারি রাস্তার উপর অবৈধভাবে গেট নির্মাণ করে জনসাধারণের চলাচলে বাধার সৃষ্টি করছেন। এমতাবস্থায় অত্র নোটিশ প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে উক্ত গেইট অপসারণ করার জন্য আপনাকে বলা হল। অন্যথায় এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ এই নোটিশটি পাওয়ার পরও গেটটি সরানো হয়নি। এরপর ২০০৪ সালের ২২ জুলাই চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আহমেদ মোর্শেদ গেটটি অপসারণের জন্য সিনিয়র কমিশনার ও ম্যাজিস্ট্রেট মো. শহীদুল আলমকে নির্দেশ দেন।

আদেশে উল্লেখ করা হয়, ‘উচ্ছেদ মামলা ১৩/০৩ এর পরিপ্রেক্ষিতে সাতকানিয়ার সোনাকানিয়া মৌজাস্থ ২২৭৩ বিএস ১ নম্বর খতিয়ানভুক্ত বিএস ৩৪৯৯ দাগের ২১ একর সর্বসাধারণের ব্যবহার্য রাস্তা শ্রেণীর জমির উপর মির্জাখিল দরবার শরীফের দেড় ফুট ডায়ামিটারের দুটি পিলার দ্বারা একটি গেট অপসারণের নির্মিত দখল উচ্ছেদ করে খালি জায়গাটি সাতকানিয়ার সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) বুঝিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হলো।’

এর আগে প্রফেসর ডা. এ এফ এম আমিনুল ইসলাম ১৯৯৭ সালের ১ অক্টোবর গেটটি সরাতে বিভাগীয় কমিশনার বরাবর আবেদন করেন। তখন বিষয়টি তদন্তের জন্য অতিরিক্ত কমিশনার (রাজস্ব) শরীফ তৈয়বুর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনিও গেটটি অপসারণ করতে সুপারিশ করেন এবং আগের ৮টি তদন্ত প্রতিবেদন উচ্ছেদের পক্ষে হয়েছিল বলেও জানান।

এভাবে মির্জাখিল দরবার শরীফ কর্তৃপক্ষ বার বার আইনি ব্যবস্থায় হেরে যাওয়ার পর ১৯৯২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি, একই বছরের ৩ মার্চ, ২০০১ সালের ২৫ জুলাই, ২০০২ সালের ৪ এপ্রিল, ২০০৪ সালের ২২ জুলাই ও সর্বশেষ ২০০৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি উচ্ছেদ আদেশ জারি করেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)। তবে সর্বশেষ আদেশের বিরুদ্ধে ২০০৬ সালে দরবার শরীফ কর্তৃপক্ষ আপিল করলে রহস্যজনকভাবে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার গোলাম কুদ্দুস স্থিত অবস্থা রাখতে আদেশ দেন। গেটটি বিরোধীয় আর.এস ২২৭৩ দাগে নয় বলে রিপোর্ট করিয়ে উচ্ছেদ কাজ বন্ধ রাখতে সক্ষম হয় দরবার কর্তৃপক্ষ।

এসব কারণে ২০১০ সালে সমস্ত নথিপত্র সংযুক্ত করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন প্রফেসর ডা. এ এফ এম আমিনুল ইসলাম। এরপর বিবাদীর উপর নোটিশ জারি হয়ে ২০১৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আবেদনটি শুনানির জন্য বিচারপতি এম. মোয়াজ্জেম হোসেন ও বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের আদালতে যায়। এরপর একই বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি মামলাটি ‘নন অ্যাপিয়ার্স আউট অব লিস্ট’ হয়। ২০১৫ সালের ২০ এপ্রিল চতুর্থ শুনানির দিন মামলাটি বিচারপতি মো. রেজাউল হাসান ও ফরিদ আহমেদের বেঞ্চে যায়। উক্ত বেঞ্চে ছয়টি শুনানির দিন ধার্য্য থাকলে কোনও সিদ্ধান্ত আসেনি। এরপর মামলাটি শুনানির জন্য ২০১৫ সালের ৮ নভেম্বর বিচারপতি জোবাইর রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি মাহমুদুল হকের বেঞ্চে যায়; সেদিন মামলাটি ‘আউট অফ লিস্ট’ হয়। মামলাটি ১১ তম শুনানির দিন ২০১৬ সালের ২০ নভেম্বর বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশিদ আলম সরকারের বেঞ্চে যায়; ওই বেঞ্চে শুনানির জন্য ১০টি দিন ধার্য্য হলেও কোনও সিদ্ধান্ত আসেনি।

এরপর ২০১৭ সালের ২ মার্চ বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দপ্তগীর হোসেন ও বিচারপতি মো. আতাউর রহমান খানের বেঞ্চে যায় মামলাটি। এরপর থেকে ওই বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য ২০১৮ সালের ৩১ মে পর্যন্ত ১৫০টি তারিখ পড়ে। এই দীর্ঘ সময়েও মামলায় কোনও ফলাফল আসেনি। এরপর ২০১৮ সালের ২৪ জুন বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দপ্তগীর হোসেন ও বিচারপতি ইকবাল কবিরের বেঞ্চে যায় মামলাটি; ওই বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য ২০১৮ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত ৩৪টি তারিখ পড়ে, কিন্তু আদেশ আসেনি।

২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর বিচারপতি জুবাইর রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি শশাংক শেখর সরকারের বেঞ্চে যায় মামলাটি। সেখানে ১৫টি তারিখ পড়ে, কিন্তু কোনও আদেশ হয়নি। এরপর ২০১৯ সালের ৩ নভেম্বর বিচারপতি জুবাইর রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের বেঞ্চে যায় মামলাটি। সেখানে ২০২০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১টি তারিখ পড়লেও কোনও আদেশ আসেনি। এরপর ১০ ফেব্রুয়ারি মামলাটি জুবাইর রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য যায়। সেখানে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ বার শুনানির জন্য দিন নির্ধারিত হয়। এরপর ২০২১ সালের ৪ জানুয়ারি মামলাটি বিচারপতি নায়মা হায়দার ও বিচারপতি রাজিক-আল-জলিলের বেঞ্চে যায়। ৫ জানুয়ারি সেখানে শুনানির দিন থাকলেও কোনও আদেশ আসেনি।

এরপর ৬ জানুয়ারি মামলাটি উক্ত বেঞ্চ থেকে প্রত্যাহার করে নেন আবেদনকারী প্রফেসর ডা. এ এফ এম আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় আমার রিট আবেদনের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে অংশ নিয়েছিলেন নায়মা হায়দার। তিনি এখন বিচারপতি হয়েছেন। আমার রিট আবেদনটি ওনার আদালতে বিচারাধীন ছিল। এ প্রেক্ষিতে ওনার কোর্ট থেকে রিটটি প্রত্যাহার করে আরেকটি কের্টে নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মির্জাখীল দরবার শরীফের বর্তমান সাজ্জাদানশীন হজরত শাহ জাহাঙ্গীর তাজুল আরেফীনের গ্রামীণ নাম্বারটিতে যোগাযোগ করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। এদিকে মির্জাখীল দরবার শরীফের পক্ষে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন মির্জাখীল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক বজলুল করিম চৌধুরী। তিনি একুশে পত্রিকা জানান, দরবার শরীফের পীর মাওলানা মো. আরেফুল হাই বর্তমানে অসুস্থ। তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অবস্থায় নেই।

সরকারি রাস্তা দখল করে মির্জাখিল দরবার শরীফের গেট নির্মাণের অভিযোগের বিষয়ে বজলুল করিম চৌধুরী বলেন, ‘ডলু ব্রীজ থেকে দরবার শরীফ পর্যন্ত সড়কটি দরবারের অনুসারীরাই একদিনে নির্মাণ করেছেন। দরবার কর্তৃপক্ষের কী দরকার পড়েছে সরকারি রাস্তা দখল করার। দরবারের জায়গায় গেটটি তৈরি করা হয়েছে।’ বজলুল করিম চৌধুরী এ কথা বললেও অতীতে বেশ কিছু তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি রাস্তা দখল করেই মির্জাখিল দরবার শরীফ কর্তৃপক্ষ গেটটি নির্মাণ করেছে।

গেটটি সরাতে আইনি লড়াই চালাতে গিয়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত প্রায় ৯০ বছর বয়সী প্রফেসর ডা. এ এফ এম আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘মির্জাখিল দরবার শরীফের সম্মানের প্রতি আমিও শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু জনসাধারণের চলাচলের একটি সড়ক দখল করে গেট নির্মাণ করে বসেছে দরবার কর্তৃপক্ষ। যার কারণে সড়কটি দিয়ে যানবাহন চলাচল ও স্থানীয় লোকজনের চলাফেরা প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করে স্থানীয়দের বিকল্প সড়ক ব্যবহার করতে হচ্ছে। মানুষকে এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে আমি আইনি লড়াই চালিয়ে আসছিলাম। বেঁচে থাকতে ন্যায়বিচার দেখে যেতে পারবো কি না জানি না।’