শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

চেয়ারম্যানকে ১০ লাখ টাকার অভিনন্দন সিডিএ’র!

| প্রকাশিতঃ ২৪ জুন ২০২১ | ৪:১৪ অপরাহ্ন


একুশে প্রতিবেদক : গত ৯ জুন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ‘জাতীয় শুদ্ধাচার পুরস্কারে’ ভূষিত হন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হয় সিডিএ চেয়ারম্যানের হাতে।

সংস্থা প্রধানের এমন সম্মাননা প্রাপ্তিতে ভালোলাগা কাজ করবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানে- তা-ই স্বাভাবিক। কিন্তু ক্রমান্বয়ে সেই ভালোলাগা, উচ্ছ্বাসে যুক্ত হয়েছে কদর্য অর্থমূল্য, লাখ লাখ টাকার চটকদার বিজ্ঞাপন। সিডিএ চেয়ারম্যানের জন্য কেনা হচ্ছে অভিনন্দন। সিডিএ চেয়ারম্যানকে অভিনন্দন জানিয়ে গেল সপ্তাহে প্রায় প্রতিদিনই পত্রিকায় দেওয়া হয়েছে  রংবেরংয়ের বড় বড় বিজ্ঞাপন। আর এসব বিজ্ঞাপন দিয়েছে খোদ সিডিএ। ব্যক্তিকে শুভেচ্ছা জানিয়ে পত্রিকার পাতা জুড়ে এসব বিজ্ঞানের জন্য সিডিএর কোষাগার থেকে খরচ হয়েছে লাখ লাখ টাকা। বলাবাহুল্য, খোদ সিডিএ চেয়ারম্যানই দিয়েছেন এসব বিজ্ঞাপনের অনুমোদন।

এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে খোদ সিডিএ অভ্যন্তরে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিডিএ-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আর্থিক টানাপোড়েন দেখিয়ে বিগত সময়ে নগরের বেশকিছু প্রকল্পের দায়িত্বভার অন্য সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের কাছে তুলে দিয়েছিল সিডিএ। এমনও হয়েছে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে না পারায় সিডিএ’র প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন ছিল মাসের পর মাস। হঠাৎ সেই সেবা সংস্থার ব্যক্তিস্বার্থে বা ব্যক্তির প্রচারে লাখ লাখ টাকা খরচ করে এমন বিজ্ঞাপন-বিলাসিতা কেন?

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ‘জাতীয় শুদ্ধাচার পুরষ্কার’ পাওয়ায় চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষকে শুভেচ্ছা-অভিনন্দন জানিয়ে গত ১৭ ও ২০ জুন চট্টগ্রামের ৪টি দৈনিকে অর্ধপৃষ্ঠা জুড়ে এবং ২১ ও ২২ জুন দুটি জাতীয় দৈনিকে এক তৃতীয়াংশ জায়গা জুড়ে বিজ্ঞাপন দেয় সিডিএ। বোর্ড সদস্য ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানিয়ে এসব বিজ্ঞাপন দেওয়ার কথা বলা হলেও মূলত বিজ্ঞাপনের টাকা পরিশোধ করেছে সিডিএ। এর জন্য সংস্থাটির প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

এর আগে গত ১২ মে সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষের পক্ষ দেশবাসীকে ঈদ-উল-ফিতরের শুভেচ্ছা জানিয়ে চট্টগ্রামের চারটি স্থানীয় দৈনিকে প্রায় ৮ লাখ টাকার বিজ্ঞাপন দেয় সিডিএ। শুভেচ্ছা-অভিনন্দন কিনতে লাখ লাখ লাখ টাকা খরচ করা এই সিডিএ-ই এমএ মান্নান ফ্লাইওভার, আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার, কদমতলী ও দেওয়ানহাট ফ্লাইওভারের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং বিদ্যুৎ বিল দিতে পারছে না জানিয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের শরণাপন্ন হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের ১ ডিসেম্বর ফ্লাইওভারগুলো চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে সিডিএ।

এর আগে সিডিএ’র কাছে প্রায় ২ লাখ টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের পর্যটকদের হাঁটাচলার স্থানের সকল সড়কবাতির বিদ্যুৎ-সংযোগ বন্ধ করে দেয় চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের পতেঙ্গা জোন। ২০১৯ সালের আগস্ট নভেম্বর পর্যন্ত একটি বাতিও জ্বলেনি সমুদ্র সৈকতে। এনিয়ে পর্যটকদের কম ভোগান্তি পোহাতে হয়নি। ৩ মাস অন্ধকারাচ্ছন্ন সৈকত এলাকায় বেড়ে গিয়েছিল ছিনতাই, চুরি, মাদকসেবন। যেকারণে সূর্যাস্তের পরপরই নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রায় পর্যটকই সৈকত এলাকায় থাকতো না। স্থানীয় থানা পুলিশকেও হিমশিম খেতে হয়েছিল পরিস্থিতি সামাল দিতে।

শুধু তাই নয়, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিপুল অর্থব্যয়ে গড়ে তোলা সৈকত প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বাজেট না থাকায় সৈকত পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বেসরকারি অপারেটর কোম্পানির হাতে ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। বিষয়টি বোর্ড সভায় তোলার পর নগর পরিকল্পনাবিদ ও সিডিএর বোর্ড সদস্য স্থপতি আশিক ইমরানকে আহ্বায়ক এবং সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার কাজী হাসান বিন শামসকে সদস্য সচিব করে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। গঠিত কমিটি থেকে ইতোমধ্যে পতেঙ্গা সৈকতে অপারেটর নিয়োগের বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে একটি রিপোর্টও দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ইতিবাচক সাড়া পেলে অপারেটর নিয়োগের জন্য টেন্ডার আহ্বান করবে সিডিএ। সিডিএ’র এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সৈকতে প্রবেশের ক্ষেত্রে ট্যুরিস্টদের কাছে টিকেট বিক্রি করবে বেসরকারি অপারেটর কোম্পানি। যদিও অপারেটরের আয়ের একটি অংশ পাবে সিডিএ।

এদিকে, সিডিএ চেয়ারম্যানের পুরষ্কার প্রাপ্তিতে সরকার ও জনগণের লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিজ্ঞাপন দেওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না সুশীল সমাজ৷ তাদের মতে, এমন কাজের মাধ্যমে সরকারি টাকার অপব্যয় করা হয়েছে যা দুর্নীতির সামিল। এর দায় সিডিএ চেয়ারম্যানের উপরও বর্তায়। প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে বিজ্ঞাপন হতে পারে কিন্তু প্রতিষ্ঠান বা সরকারের অর্থে ব্যক্তির প্রচার অপরাধ বলে মনে করছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সুশাষণের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, অর্থ সংকুলান করতে না পারায় যেখানে অনেকে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সিডিএ এসবের দায়িত্বভার অন্য সংস্থার উপর ন্যস্ত করেছে, সেখানে লাখ লাখ টাকা খরচ করে এসব বিজ্ঞাপন দেওয়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। কেউ লাভবান হওয়ার জন্য কাজটি করেছে নাকি চেয়ারম্যানকে তৈলমর্দন করার জন্য বিজ্ঞাপনগুলো দেওয়া হয়েছে সেটাও দেখা দরকার।

তিনি বলেন, দুর্নীতি শুধু টাকা চুরির মাধ্যমে হয় না। ক্ষমতার অপব্যবহার দুর্নীতির অন্যতম প্রধান কারণ। যারা এই বিজ্ঞাপনগুলো দিলেন, কিসের ভিত্তিতে দিলেন? সরকারি টাকায় ব্যক্তিগত শুভেচ্ছা বিজ্ঞাপন দেওয়ার অধিকার তাদের দিয়েছে কে? যদি সিডিএ চেয়ারম্যান এসব বিজ্ঞাপন দেওয়ার অনুমোদন দিয়ে থাকেন তাহলে উনি অবশ্যই দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। তার অগোচরে কাজটা হলে যারা এসব করেছেন তাদেরকে চেয়ারম্যানের ধরা দরকার।

সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস একুশে পত্রিকাকে বলেন, আসলে বিজ্ঞাপন বরাদ্দের বিষয়টা সিডিএ সচিব দেখেন। এব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। বিজ্ঞাপনগুলো যখন পত্রিকায় দেওয়া হয়েছে তখন আমি ঢাকায় ছিলাম। সেসময় শুনেছি ২টি জাতীয় পত্রিকা এবং চট্টগ্রামের ৪ টি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। পরে অনলাইনে বিজ্ঞাপনগুলো দেখেছি।

এক প্রশ্নের জবাবে তনি বলেন, সিডিএ থেকে যে কোনো বিজ্ঞাপন দিতে গেলে চেয়ারম্যানের অনুমোদন লাগে। এখন কেন বিজ্ঞাপনগুলো দেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে চেয়ারম্যান মহোদয় ভালো বলতে পারবেন। আপনি আমাদের চেয়ারম্যানের সাথে কথা বললে ভালো হয়- যোগ করেন এই কর্মকর্তা।

প্রধান প্রকৌশলীর দেওয়া তথ্যানুযায়ী সরকারি টাকায় বিজ্ঞাপনগুলো দেওয়ার কাজ করেছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সচিব মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা। এবিষয়ে জানতে সিডিএ সচিবের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি মুখ খলতে রাজি হননি। একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, আপনার কথা বলার দরকার হলে সিডিএ চেয়ারম্যানের সাথে বলুন, আমি এখানকার মুখপাত্র নই। আর এবিষয়ে কোনো মিডিয়ার সাথে আমি কথা বলবো না- বলে ফোন কেটে দেন এ কর্মকর্তা।

এরপর চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষকে বেশ কয়েকবার ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি। প্রতিবারই রিং হয়, কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি।