শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

মিথ্যা তথ্যে অস্ত্রের লাইসেন্স, তদন্তে এনবিআর

| প্রকাশিতঃ ২৯ জুন ২০২১ | ১১:০৬ অপরাহ্ন


মোহাম্মদ রফিক : চট্টগ্রামে আয়কর প্রদান বিষয়ক মিথ্যা তথ্য দিয়ে বেশ কয়েকজন ব্যক্তি অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে; এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তৎপরতা শুরু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

ইতিমধ্যে চাহিদার প্রেক্ষিতে অস্ত্রের লাইসেন্স নেয়া ব্যক্তিদের তালিকা চট্টগ্রামের চারজন কর কমিশনারের দপ্তরে পাঠিয়েছে জেলা প্রশাসনের আগ্নেয়াস্ত্র শাখা। এর মধ্যে কর অঞ্চল-৩ এ পাঠানো ৫৫ জনের একটি তালিকা এসেছে একুশে পত্রিকার হাতে এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, অস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার জন্য কিছু মানদণ্ড রয়েছে। এসব পূরণ হলেই একজন নাগরিক অস্ত্রের লাইসেন্স পেতে আবেদন করতে পারেন। এর মধ্যে অন্যতম শর্ত- আবেদনকারীকে বছরে ন্যূনতম দুই লাখ টাকা আয়কর প্রদান করতে হবে।

কিন্তু তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বছরে দেড় লাখ টাকা আয়কর দেননি এমন ব্যক্তিও অস্ত্রের লাইসেন্স পেয়েছেন। আবার অন্যদিকে বছরে শত কোটি টাকা আয় করেন এমন শিল্পপতিও তথ্য গোপন করে একাধিক আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নিয়েছেন। তথ্য গোপন রেখে লাইসেন্স পাওয়া ব্যক্তির তালিকায় শিল্পপতির পাশাপাশি আছেন জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও চিকিৎসক। এছাড়া মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার অভিযোগ থাকা ব্যক্তিও আছেন আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সধারীর তালিকায়।

জেলা প্রশাসনের আগ্নেয়াস্ত্র শাখা থেকে এ সংক্রান্ত একটি তালিকা কর কমিশনারের দপ্তরে পাঠানো হলেও বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মমিনুর রহমান। আজ বুধবার এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নেব।’

জানা গেছে, চট্টগ্রাম কর অঞ্চল-৩ এর আওতায় থাকা ৫৫ জন ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পেয়েছেন। ২০১৩-২০১৪ থেকে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে লাইসেন্সগুলো ইস্যু করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের আগ্নেয়াস্ত্র শাখা। এরমধ্যে ৪০ জনকে শর্টগান, ১০ জনকে পিস্তল, দুইজনকে এনপিবি পিস্তল, একজনকে ২২ বোরের রাইফেল, একজন রিভলভার এবং আরেকজনকে দেওয়া হয়েছে একটি একনলা বন্দুকের লাইসেন্স।

জানা গেছে, ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে একটি শর্টগানের লাইসেন্স পেয়েছেন মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। পাঁচলাইশ থানাধীন নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির এ বাসিন্দা একজন শিল্পপতি৷ তিনি ওই অর্থবছরে বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৬৭ কোটি ৬৮ লাখ ১৪ হাজার ৬৯২ টাকা। তার প্রদত্ত করের পরিমাণ ৩৫ লাখ ৮৩ হাজার ৪৩৯ টাকা। তবে এর আগে ২০১৪ সালে একটি পিস্তলের লাইসেন্স পেয়েছেন তিনি।

২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে একটি শর্টগানের লাইসেন্স পেয়েছেন কবির স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেডের কর্ণধার মোহাম্মদ শাহজাহানের ছেলে শাহরিয়ার জাহান। তিনি বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ২৯ লাখ ৫ হাজার টাকা। একই অর্থবছরে তার প্রদত্ত করের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার। বাস্তবে তার বাৎসরিক আয় কয়েক কোটি টাকা বলে ধারণা করছেন কর কর্মকর্তারা।

এদিকে ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে শর্টগানের লাইসেন্স পেয়েছেন অনুপ বিশ্বাস। ফিরিঙ্গবাজার এলাকার শচিন্দ্র লাল বিশ্বাসের ছেলে অনুপ তার বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ১০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। একই অর্থবছরে তার প্রদত্ত করের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। অনুপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আছে মাদক ব্যবসা পরিচালনার একাধিক অভিযোগ। সম্প্রতি নগরে মাদকদ্রব্যসহ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার কিছু আসামির জবানবন্দিতে উঠে আসে অনুপ বিশ্বাসের নাম।

অন্যদিকে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে শর্টগানের লাইসেন্স পেয়েছেন শিল্প গ্রুপ কেডিএস’র মালিক খলিলুর রহমানের ছেলে সেলিম রহমান। তিনি বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৪৩ লাখ ৫২ হাজার ৫৬৯ টাকা। প্রদত্ত করের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৫৩ হাজার ১২৮ টাকা। এর আগে ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে একটি পিস্তলের লাইসেন্স পেয়েছেন সেলিম রহমান। একই অর্থবছরে আয়ের কোন হিসাব পাওয়া না গেলেও তার প্রদত্ত করের পরিমাণ ৫৯ লাখ ৩৮ হাজার ৭৬২ টাকা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর অঞ্চল-৩ চট্টগ্রামের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘কেডিএস গ্রুপের মালিকের ছেলে সেলিম বছরে ৪৩ লাখ টাকা আয় করেন- এ কথা পাগলেও বিশ্বাস করবে না। বছরে শত কোটি টাকা আয় করলেও অনেক শিল্পপতি আয়কর দেন না সঠিকভাবে।’

এদিকে ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে রিভলভারের লাইসেন্স পেয়েছেন হাটহাজারী উপজেলা ফতেয়াবাদ এলাকার বাসিন্দা সিআইপি মোহাম্মদ সেলিম। ওই এলাকার মৃত আব্দুস সবুরের ছেলে সেলিম তার বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৫২ লাখ ৮২ হাজার টাকা ৩১৭ টাকা। একই অর্থবছরে তার প্রদত্ত করের পরিমাণ ছিল ১৪ লাখ ৫৩ হাজার ১২৫ টাকা। এর আগে ২০১৪ সালে একটি শর্টগানের লাইসেন্সও পান তিনি।

জানা গেছে, সিআইপি সেলিম গত ১৮-২০ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে সবজিসহ নানা পণ্য রপ্তানি করে আসছেন। এছাড়া দেশ-বিদেশে তার আছে নানা ব্যবসা। হাটহাজারীর চৌধুরীহাটে আরাফাত টাওয়ার, বিপনী বিতান কাম আবাসিক ভবনসহ অন্তত ২০০ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি আছে সেলিমের। দুটি ভবন ও মার্কেট থেকে ভাড়া বাবদ প্রতিমাসে আয় করেন অন্তত ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা। অভিযোগ আছে, বছরে কোটি কোটি টাকা আয় করলেও আয়কর প্রদানের সময় তিনিও তথ্য গোপন করেছেন।

এদিকে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে শর্টগানের লাইসেন্স পেয়েছেন সাবেক সিটি মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর জামাতা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সেলিম আকতার চৌধুরী। তিনি ওই অর্থবছরে আয় দেখিয়েছেন ১৩ লাখ ৯৩ হাজার ৯০৯ টাকা। একই বছর তিনি কর দিয়েছেন ১ লাখ ৪২ হাজার ১৬ টাকা। বাস্তবে এই চিকিৎসকের বার্ষিক আয়ও কোটি টাকার উপরে বলে অভিযোগ আছে।

২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে একটি শর্টগানের লাইসেন্স পেয়েছেন চট্টগ্রাম নগরের খাজা রোডের হাবিলদার বাড়ির মৃত আব্দুল আহমদের ছেলে মোহাম্মদ সাহাবউদ্দিন। তিনি ওই বছর আয় দেখিয়েছেন ৯ কোটি ৬৯ লাখ ১৫ হাজার ৮৭২ টাকা। একই অর্থবছরে তার প্রদত্ত করের পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৪৬ লাখ ৮১ হাজার ৬৫ টাকা।

২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে একটি পিস্তলের লাইসেন্স পেয়েছেন পাঁচলাইশ থানাধীন ১১৭, চৌধুরী ভিলার মৃত এস এম হোসেন চৌধুরীর ছেলে আমজাদ হোসেন চৌধুরী। তিনি বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৩ কোটি ৭৪ লাখ ৭৯ হাজার ১২০ টাকা। একই সময়ে তার প্রদত্ত করের পরিমাণ ছিল ৩৭ লাখ ৪৭ হাজার ৯১২ টাকা।

২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে একটি শর্টগানের লাইসেন্স পেয়েছেন চট্টগ্রাম নগরের ওআর নিজাম রোডের ১০২ নং বাড়ির বাসিন্দা মৃত হাজি মমতাজ উদ্দিন মিয়াজির ছেলে এম এ বাসার। তিনি ওই অর্থবছরে আয় দেখিয়েছেন ১ কোটি ৩৮ লাখ ৪১০ টাকা। একই অর্থবছরে তিনি কর দিয়েছেন ৪১ লাখ ৪২ হাজার ৭৫ টাকা।

২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে একটি শর্টগানের লাইসেন্স পেয়েছেন হাটহাজারী উপজেলা বাথুয়া এলাকার আব্দুল আলীমের ছেলে মোহাম্মদ ইকবাল মিয়া। তার বার্ষিক আয়ের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ১৩ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। তার প্রদত্ত করের পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ১ হাজার ৮৪৫ টাকা।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, অস্ত্রের লাইসেন্স সংক্রান্ত নিয়মগুলো কয়েকটি আইনের আওতায় পরিচালিত হয়। এর মধ্যে মূলত ১৮৭৮ সালের আর্মস অ্যাক্ট এবং ১৯২৪ সালের আর্মস রুলস আইনের আওতায় যে কোন সামরিক বা বেসামরিক নাগরিককে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেয়া হয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার জন্য কিছু মানদণ্ড রয়েছে, সেগুলো পূরণ হলেই একজন নাগরিক আবেদন করতে পারবেন। আবেদনকারীকে অবশ্যই আয়কর দাতা হতে হবে, বছরে ন্যূনতম দুই লক্ষ টাকা আয়কর প্রদান করতে হবে। তবে অনেকের ক্ষেত্রে এ নিয়ম মানা হচ্ছে না।

কর অঞ্চল-৩ চট্টগ্রামের কমিশনার সৈয়দ আবু দাউদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স হোল্ডারদের তালিকা চেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। আয়কর তথ্য যাচাইয়ের জন্য ওই তালিকা চাওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন থেকে পাঠানো তালিকা আমাদের হাতে এসেছে৷ অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’