শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

টিসিবির পণ্য বিক্রিতে অনিয়ম, লাইনে দাঁড়িয়েও খালিহাতে ফেরা

| প্রকাশিতঃ ১২ জুলাই ২০২১ | ৮:৩৯ অপরাহ্ন


জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত : টিসিবির পরিবেশক দেশ স্টোরের মালিক মীর মুজিবুর হোসেন। গতকাল রোববার টিসিবির পণ্য নিয়ে নগরের এক্সেস রোডের বড়পোল মোড়ে যখন তার ট্রাক পৌঁছায়, তখন বেলা সাড়ে ১২টা। ট্রাক যাওয়া মাত্রই পণ্য কিনতে ট্রাকের পেছনে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েন ক্রেতারা।

পণ্য কেনার জন্য মানুষের দীর্ঘ সারি থাকলেও বিকেল সাড়ে ৩টায় ট্রাকে থাকা বিক্রয়কর্মীরা বলেন, পণ্য শেষ। আজ আর কিছু বিক্রি করা হবে না। এ সময় ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করেও নিত্যপণ্য না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায় লাইনে দাঁড়ানো ক্রেতাদের।

গার্মেন্টস কর্মী রোমানা রশিদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘দুপুর দেড়টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি তেল আর ডাল কিনবো বলে। ২ ঘন্টা অপেক্ষা করার পর শুনছি তাদের পণ্য নাকি শেষ। কিন্তু আমরা তো দেখছি এখনও কয়েক কার্টন তেল আর ১ বস্তা ডাল আছে। টাকা দিয়েই তো কিনতে এসেছি। তাহলে তারা কেন এমনটা করছে? পণ্য যদি না দেবে তাহলে এতক্ষণ অপেক্ষায় রাখল কেন?’

কিছুক্ষণ পরই টিসিবির ট্রাকটি দেখা যায় হালিশহর ওয়াপদা মোড়ে। এসময় দুজন যুবক (টিসিবির পণ্যের বিক্রয়কর্মীরা) ট্রাকের সামনে টাঙানো টিসিবির ব্যানার খুলে ড্রাইভারের হাতে দেন। এরপর ট্রাকের পেছনে উঠে দুই ব্যক্তি একটি বস্তা থেকে প্যাকেট করা চিনি ও ডাল বের করে একটি খালি কার্টনে ঢুকান। পরক্ষণেই অন্য একটি তেলের কার্টন থেকে ২ লিটারের তেলের বোতল একটি বস্তায় ঢুকাতে থাকেন। মধ্যপথে বিরতিতে এ কাজ শেষে চলে যায় ট্রাকটি। অথচ কিছুক্ষণ আগেই প্রায় অর্ধশত মানুষকে পণ্য না থাকার দোহাই দিয়ে বিক্রি কার্যক্রম বন্ধ করেছিল বিক্রয়কর্মীরা।

গত ৫ জুলাই থেকে চট্টগ্রামের ২২টি পয়েন্টে শুরু হওয়া টিসিবি’র ‘ট্রাক সেলের’ একটি পয়েন্টের ঘটনা এটি। করোনা পরিস্থিতিতে সরকার ঘোষিত লকডাউন ও ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কম দামে পণ্য সরবরাহ করতে চালু হওয়া টিসিবি’র ‘ট্রাক সেল’ কার্যক্রম নিয়ে ইতোমধ্যে উঠেছে এমন আরো বেশ কিছু অভিযোগ। প্রশ্ন উঠেছে টিসিবি’র পণ্য বিক্রির স্বচ্ছতা ও মনিটরিং নিয়েও।

অভিযোগ আছে, ডিলারের আওতায় এসব পণ্য বিক্রির কার্যক্রমের কোনো তদারকি করছে না টিসিবি। টিসিবি’র মনিটরিং টিম, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকারের নিয়মিত অভিযানের মাধ্যমে এই কার্যক্রম তদারকির কথা থাকলেও তা করা হচ্ছে না। যার সুযোগ নিয়ে টিসিবি’র পণ্য বিক্রিতে অনিয়ম ও কালোবাজারি করছেন ডিলার ও সেলাররা।

সর্বশেষ গত ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া টিসিবির পণ্য বিক্রি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় গত ১৯ জুন। এরপর ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে গত ৫ জুলাই ‘ট্রাক সেলের’ মাধ্যমে পুনরায় নিত্যপণ্য বিক্রির কার্যক্রম শুরু করে টিসিবি। অভিযোগ আছে, দু’দফায় টিসিবির এই পণ্য বিক্রি কার্যক্রম চলাকালীন সময়ে তদারকি বা মনিটরিংয়ে একটি অভিযানও পরিচালনা করেননি সংশ্লিষ্টরা।

ভোক্তারা অভিযোগ করেছেন, টিসিবি’র পণ্য বিক্রির পরিমাণ নিয়েও। তারা বলছেন, পণ্য থাকা সত্ত্বেও অজানা কারণে বিক্রির দায়িত্বে থাকা লোকেরা পণ্য দিতে চাচ্ছেন না। যে পরিমাণ পণ্য একজন ভোক্তার পাওয়ার কথা তার অর্ধেক পণ্য নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। পছন্দের প্রয়োজনীয় পণ্য নিতেও বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন তারা। বিক্রয়কর্মীদের মৌখিক ঘোষণা অনুযায়ী নির্দিষ্ট পণ্য নিতে আসা ক্রেতাদেরও বাধ্য হয়ে প্যাকেজ আকারে পণ্য কিনতে হচ্ছে।

গতকাল রোববার নগরের জামালখান মোড়ে টিসিবি’র পণ্যবাহী ট্রাক থেকে ৪ কেজি চিনি ও ৫ লিটার ভোজ্যতেল কিনতে লাইনে দাঁড়ান মাঈনুল রহমান। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর তার পালা আসলে পণ্য বিক্রির দায়িত্বে থাকা লোকেরা তাকে বলেন, তিনি সর্বোচ্চ ২ কেজি চিনি ও ২ লিটার তেল নিতে পারবেন। নিয়ম অনুযায়ী আরো বেশি পাওয়ার কথা জানালেই তাকে বলা হয়, ‘নিলে নেন, না নিলে রাস্তা মাপেন।’ তাই বাধ্য হয়েই তাকে সেই পরিমাণ পণ্য নিয়েই বাসায় ফিরতে হয়।

একুশে পত্রিকাকে মাঈনুল রহমান বলেন, ‘গত ৪ জুলাই টিসিবি’র একটি বিজ্ঞপ্তিতে আমি দেখেছি, একজন ক্রেতা দৈনিক ৫৫ টাকা দরে ২-৪ কেজি চিনি ও ২ কেজি ডাল এবং লিটার প্রতি ১০০ টাকা দরে ২-৫ লিটার ভোজ্যতেল কিনতে পারবেন। বেশ কিছু সংবাদপত্রেও বলা হয়েছিল এই কথা, কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো। এটা তো অন্যায়! এই অসংগতির বিষয়ে অভিযোগ করার জন্যও কাউকে পেলাম না। কোনো তদারকি নেই। যার যা মন চাচ্ছে সে তাই করছে।’

এদিকে নগরের বেশিরভাগ পয়েন্টে নিত্যপণ্য কিনতে আসা প্রায় ক্রেতারাদের সাথে কথা বলে একই অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সোমবার সকাল ১১টা থেকে নগরের ওয়াসা ফুটওভার ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় টিসিবির পণ্য বিক্রির কথা থাকলেও সেসময় ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের দেখা মিলেনি। যদিও স্বম্পমূল্যে পণ্য কিনতে অপেক্ষারত ছিলেন শখানেক মানুষ। বেলা ১টায় ট্রাক আসার আগ পর্যন্ত প্রায় দেড় শতাধিক মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ট্রাক আসার পর বিক্রির দায়িত্বে থাকা লোকদের কাছে দেরির কারণ জানতে চাইলে তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

এসময় সালেহা খাতুন নামে এক মহিলা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা যে ২ ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছি তাদের এই বিষয়ে কোনো মাথা ব্যাথা নেই। কিছু টাকা বাঁচাতে আমরা এত কষ্ট সহ্য করছি। কর্তৃপক্ষকে তারা বলে যে তারা ঠিকমতো পণ্য বিক্রি করছে। কিন্তু আসলে তো তা হচ্ছে না, এসব দেখার কেউ নেই। এ ধরণের কাজের তদারকি থাকা উচিত। জবাবদিহিতা নেই বলে এমন অনিয়ম হচ্ছে ‘

একইভাবে টিসিবির পণ্য বিক্রির শুরুর দিন থেকে বেশকিছু পয়েন্টে ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের অপেক্ষায় অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেছে ক্রেতাদের। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত পণ্য বিক্রির কার্যক্রম চলার কথা থাকলেও প্রায়শই ট্রাকগুলো এসেছে নির্ধারিত সময়ের ২-৩ ঘন্টা পর। কোথাও আবার বিক্রি কার্যক্রমের শেষ সময় বিকেল ৫টার দেড়-দুই ঘন্টা আগেই চলে যেতে দেখা গেছে ট্রাকগুলোকে।

এ প্রসঙ্গে ভোক্তা অধিকার চট্টগ্রাম জেলা কার্যাল‌য়ের সহকারী প‌রিচালক মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ডিলাররা যে পরিমাণ পণ্য টিসিবি থেকে তুলছে সে পরিমাণে বিক্রি করছে কি না, টিসিবি’র সেলে কোনো কারচুপি হচ্ছে কি না, পণ্য থাকা অবস্থায় পণ্য নেই বলে ক্রেতাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে কি না, কোন প্যাকেজে পণ্য কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে কি না তা আমরা তদারকি করি। পাশাপাশি টিসিবির ট্রাকগুলো আমরা মনিটরিং করে থাকি। প্রতিনিয়ত আমাদের অভিযান চলছে।’

নির্ধারিত পয়েন্টে সময়মত টিসিবির ট্রাক যাচ্ছে কি না এ বিষয়ে মনিটরিং হচ্ছে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা টিসিবির সাথে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছে, উপজেলা-মহানগর মিলে প্রায় ৩০টি ট্রাক প্রতিদিন টিসিবির পণ্য নিতে আসে। পণ্য পরিমাপ করে সব ট্রাকে লোড করে দেওয়া একটি সময় সাপেক্ষ বিষয়। এছাড়া টিসিবি তাদের জনবলের সংকটের কথাও আমাদের জানিয়েছে। কিছু ভাসমান শ্রমিক ছিল যাদেরকে কোভিড পরিস্থিতির কারণে টিসিবি পাচ্ছে না। আমরা তাদের যথাসম্ভব দ্রুত এসব কাজ করার নির্দেশ দিয়েছি।’

এদিকে নির্দিষ্ট পয়েন্টে পণ্য পৌঁছাতে দেরি হওয়ার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন টিসিবির চট্টগ্রাম আঞ্চলিক প্রধান জামাল উদ্দিন। যানজটের কারণে পণ্যবাহী ট্রাকে নির্দিষ্ট পয়েন্টে পৌঁছাতে দেরি হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সিমেন্ট ক্রসিং ও আগ্রাবাদ এলাকায় ফ্লাইওভারের কাজের কারণে দীর্ঘ যানজটে আমাদের ট্রাকগুলো আটকে থাকে। এমনও হয়েছে দুই ঘন্টা যানজটে পড়ে থাকার কারণে ট্রাকগুলোর নির্দিষ্ট পয়েন্টে পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। সেলিং পয়েন্টে পৌঁছানোর পর এবং পণ্য বিক্রি শেষে তারা আমাদের এ বিষয়ে আপডেট জানায়।’

এক প্রশ্নের জবাবে জামাল উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা সকলেই যাতে টিসিবির পণ্য পায় তাই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য আমরা দিতে বলেছি। কেউ বেশি পেল আবার কেউ একদমই পেল না এমনটা হোক তা আমরা চাই না। এমনও হতে পারে এখন সীমিত পরিমাণে পণ্য দিলেও ঈদের আগে আমরা সর্বোচ্চ পরিমাণ পণ্য জনগণকে দিবো। সমগ্র কার্যক্রমকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালনা করতেই আমরা এই পদক্ষেপ নিয়েছি।’

অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, করোনার কারণে হয়তো ট্রাক সেলের তদারকির জন্য সব জায়গায় মনিটরিং করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ আমরা পাইনি। আর এসব কার্যক্রম মনিটরিং করার জন্য ভোক্তা অধিকার, জেলা প্রশাসন, সিএমপিসহ ৬টি আলাদা টিম আছে।’

এসময় ‘দেশ স্টোর’ এর ট্রাকের অনিয়মের বিষয়টি নজরে আনলে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন টিসিবির চট্টগ্রাম আঞ্চলিক প্রধান।

এর কিছুক্ষণ পরেই ‘দেশ স্টোর’ প্রতিষ্ঠানের ডিলার মীর মুজিবুর হোসেন এ প্রতিবেদককে ফোন করে বলেন, ‘সাধারণত পণ্য বিক্রি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের গাড়ি নির্ধারিত পয়েন্ট থেকে আসে না। আর পণ্য বিক্রি শেষে অনেক সময় আমরা কার্টন ও মালামাল গোছাই। সেটাই হয়তো আপনারা দেখেছেন। হয়তো মাঝে মধ্যে নিজেদের ব্যবহারের জন্য সামান্য পণ্য তারা রাখে যেহেতু তারাও খেটে-খাওয়া মানুষ। তবে অভিযোগ আসার মত কোনো কার্যক্রম আমার প্রতিষ্ঠানে হয় না। এটা আমি আপনাদের নিশ্চিত করতে পারি।’