শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

স্ত্রীর মৃত্যুতে স্বামীকে ‘হেনস্তা’, কবর খুঁড়তেও এগিয়ে এলো না গ্রামবাসী!

| প্রকাশিতঃ ১ অগাস্ট ২০২১ | ৭:০৩ পূর্বাহ্ন


আবছার রাফি : ‘করোনায় মারা গিয়েছেন সেলিনা আকতার, তাই তাঁর কবর খুঁড়তে গেলেও করোনা হতে পারে’- এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে গ্রামজুড়ে; সে আশঙ্কা থেকে কবর খুঁড়তেও এগিয়ে এলো না গ্রামের লোকজন। অবশেষে ধানের চারা রোপনের মৌসুমকে কেন্দ্র করে নোয়াখালীর হাতিয়া থেকে গ্রামের বাজারে আসা চারজন দিনমজুরকে জনপ্রতি ৮’শ টাকা দিয়ে কবর খুঁড়ে কবরস্থ করা হয় মৃত সেলিনা আকতারকে।

সম্প্রতি এমন লোমহর্ষক-নিন্দনীয় ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের চৌধুরী বাড়িতে। এখানেই শেষ নয়, স্ত্রী সেলিনা আকতারের মৃত্যুর পর এক অদ্ভুদ-বিভীষিকাময় মানসিক নিপীড়নের মুখোমুখি হতে হয়েছে স্বামী আব্দুল মোতালেব চৌধুরীকে।

স্ত্রীর মৃত্যুর ৯ দিন পার হয়ে গেলেও করোনার ধুয়া তুলে স্বামী আব্দুল মোতালেবের উপর এখনো কমেনি সেই ‘সামাজিক-মানসিক নিপীড়ন’। একদিকে প্রিয়তমা স্ত্রী হারানোর শোক, অন্যদিকে কিছু পাষণ্ড মানুষের বর্বর আচরণ; ঘটনার যুগপৎ আকস্মিকতায় শারীরিক-মানসিকভাবে বিধ্বস্ত এক অকল্পনীয়-মুমূর্ষ সময় পার করছেন আব্দুল মোতালেব চৌধুরী। যা তিনি দুঃখ-ক্ষোভের সাথে তুলে ধরেছেন একুশে পত্রিকার কাছে।

সেদিন শনিবার (২৪ জুলাই) প্রতিদিনকার মতো রাত তিনটায় একসাথে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করেন আব্দুল মোতালেব চৌধুরী (৬৫) ও তার স্ত্রী সেলিনা আকতার (৫৮)। নগরীর হালিশহরস্থ বসুন্ধরা আবাসিকের একটি পাঁচতলা ভবনের নিচতলায় ভাড়ায় থাকেন তাঁরা। নামাজ শেষে তাসবীহ-তাহলীল জপে স্ত্রীর গায়ে ফুঁক দেন স্বামী আব্দুল মোতালেব চৌধুরী। এমতাবস্থায় স্বামী দেখতে পান, হঠাৎ স্ত্রীর নাক-মুখ বেয়ে দেদারছে ঝরছে ঘাম আর ঘাম। এমন ঘর্মাক্ত অবস্থা দেখতে না দেখতেই স্ত্রী ঢলে পড়েন স্বামীর কোলে। স্বামীর কোলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন স্ত্রী সেলিনা আকতার। বাসায় তাঁরা স্বামী-স্ত্রী দুজন ছাড়া আর কেউ থাকতেন না। ফলে স্ত্রীকে হারিয়ে একা আব্দুল মোতালেব কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন।

ডাক্তারের কাছে স্ত্রীকে নিয়ে যাবেন নাকি ডাক্তারকে ডেকে বাসায় আনবেন, নাকি অন্য কাউকে ডাকবেন; কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না আব্দুল মোতালেব। প্রিয়জন হারানোর শোকে বিহ্বল হয়ে পড়া আব্দুল মোতালেব কেবল চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন। কিন্তু ভবনের নিচতলা থেকে উপরতলার ভাড়াটিয়া, এমনকি জমিদারও এক পলক দেখতে এলেন না তাদের। আবাসিকের পাশে থাকা মাদরাসা থেকেও কেউ ছুটে এলো না। করোনায় মৃত্যু হয়েছে ভেবে কেউ আসছেন না। পরে জমিদার এলেও ততক্ষণে সকাল হয়ে যায়। ভোররাত ৪ টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত দেখা মেলে না কারো। পরে মৃতের ছেলে ও আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে বিষয়টি জানাজানি হলে তারা আল-মানাহিল ফাউন্ডেশনকে খবর দেয় মৃতদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যেতে।

এরই মধ্যে গ্রাম থেকে খবর আসে, গ্রামে মৃতদেহকে কেউ গোসল করাতে রাজি হচ্ছে না। শহর থেকে যেন একেবারে গোসল করিয়ে মৃতদেহ নেওয়া হয়। অবশেষে মৃত সেলিনা আকতারের বড়ো ছেলে মাকে গোসল করাতে মহিলা খুঁজতে নেমে পড়েন। যেহেতু ওই ভবনের কেউ-ই রাজি হচ্ছে না গোসল করাতে। শেষমেশ শহরের অলঙ্কার মোড় এলাকার কোনো এক কলোনি থেকে ভাড়া করে নিয়ে আসা হয় মহিলা। তারাই গোসল করান মৃতদেহের।

সময় সকাল ৯.৩০ মিনিট। আল-মানাহিল ফাউন্ডেশনের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স মৃতদেহ নিয়ে ছুটে চলছে মৃতের গ্রামের বাড়ি ফটিকছড়ি উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের মুন্দর বাড়িতে। ইতোমধ্যে গ্রামের বাড়ি থেকে আবারও খবর আসে- মৃতদেহ কোনোমতেই গ্রামে ঢুকাতে দেওয়া হবে না। যে গ্রামের আলো-বাতাসে হেসেখেলে বড়ো হওয়া, যে প্রতিবেশিদের সাথে হৃদ্যতাপূর্ণ দহরম-মহরম সম্পর্ক; সেই গ্রামের বাড়িতে স্ত্রীর মৃতদেহ ঢুকতে না দেওয়ার হুমকি গুণাক্ষরেও যেন বিশ্বাস করতে চান না আব্দুল মোতালেব চৌধুরী ও তার বড় ছেলে কামরুল ইসলাম চৌধুরী। কিন্তু লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স গ্রামের সন্মুখভাগে যেতে না যেতেই ভেঙে যায় গ্রামবাসীকে নিয়ে আব্দুল মোতালেব চৌধুরীর সেই আস্থা-বিশ্বাস।

সত্যিসত্যিই বাঁধ সাধে গ্রামের মানুষজন, ভেসে উঠে চিরচেনা মানুষজনের মুখের অন্তরালে থাকা মুখোশ। বাড়ির সামনের রাস্তায় বাঁশের ঘেরা দিয়ে রেখেছেন তারা, যাতে মৃতদেহ নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে না পারে। অবশেষে নিজ বাড়িতেই ঢুকাতে পারলেন না স্ত্রী সেলিনা আকতারের মরদেহ। গ্রামবাসীর বাধার মুখে উপায় না দেখে বাড়ির পাশে থাকা হাসান আলী দরগা চৌধুরী জামে মসজিদের মাঠে নিয়ে যাওয়া হয় লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স। মৃতের স্বজনরা গ্রামবাসীকে ‘করোনা নয়, স্ট্রোক করে মারা গেছে সেলিনা আকতার’- এ কথা বলে অনেকভাবে বুঝানোর চেষ্টা করেন কিন্তু কিছুতেই যেন মায়া হয়নি গ্রামের কারোরই। গ্রামের মানুষজনের সাথে এ বিষয়ে বাকবিতণ্ডা-বিভৎস পরিস্থিতিতে বৃষ্টিও যেন নাছোড়বান্দা। ঝুম ঝুম বৃষ্টি: উপর্যুপরি বৃষ্টির পানি থেকে মৃতদেহকে নিরাপদে রাখতে খাটিয়া করে মসজিদের বারান্দায় কিছুক্ষণের জন্য রাখতে চায় মৃতের স্বজনরা- তাতেও বেঁকে বসেন মসজিদ সংশ্লিষ্টরা। বলেন, করোনায় মারা যাওয়া মানুষের মৃতদেহ মসজিদে ঢুকাতে দেওয়া হবে না। শেষমেষ মৃতদেহ মসজিদের বারান্দায়ও রাখা গেল না। বৃষ্টির মাঝেই প্লাস্টিক টাঙিয়ে খাটিয়াসহ মরদেহ রাখা হয় মসজিদের মাঠে।

অবশেষে শুরু হলো জানাজার নামাজ। কিন্তু গ্রামবাসী কানাঘুষা করতে থাকেন এই বলে যে, মৃত সেলিনা আকতারের স্বামী আব্দুল মোতালেব চৌধুরী জানাজার নামাজ পড়তে পারবেন না; কারণ তারও করোনাভাইরাস হয়েছে। তিনি নামাজ পড়তে এলে করোনা সবার মাঝে ছড়িয়ে যাবে। এটা নিয়েও মৃতের স্বজনদের সাথে গ্রামবাসীর বাকবিতণ্ডা লেগে যায়। মোতালেব চৌধুরীকে নামাজ না পড়ে ঘরে থাকতে বলা হয়। ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করা হয়।

‘শারীরিকভাবে সুস্থ থেকেও মৃত স্ত্রীর জানাজা স্বামী পড়তে পারবেন না, এর চেয়ে দুঃখের বিষয় আর কী হতে পারে’- এমন আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠে মোতালেবের বাড়ি। অবশেষে গ্রামের অনেকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মৃতের ছোট ছেলে বাবাকে নিয়ে যায় মায়ের জানাজায়; তাও জানাজার নামাজের একেবারে শেষের দিকে। এরপর নামাজ শেষে খাটিয়া করে মরদেহ কবরস্থানে নিয়ে যেতেও গ্রামবাসীর কেউ এগিয়ে আসেননি। পরে আব্দুল মোতালেব চৌধুরীর বড় ছেলের খাতিরে আসা দরবারি পীরভাইরা খাটিয়া করে মৃতদেহ কবরস্থানে নিয়ে যায়। তারাই দাফনের কাজটি শেষ করেন।

আব্দুল মোতালেব চৌধুরীর বড় ছেলে কামরুল ইসলাম চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মায়ের জানাজা শেষে বাবা যে ঘরে ঢুকেছেন চারদিন পর্যন্ত সে ঘর থেকে তিনি বের হতে পারেননি। রাগে-ক্ষোভে বাবা আত্মহত্যা করারও চেষ্টা করেছেন। কখনো নিজের পেটে নিজেই ছুরি ঢুকিয়ে আত্মহত্যা করতে চান। আমি গ্রামবাসীকে বলেছি, আমার বাবার করোনা হয়নি। যদি করোনা হয়েছে এমন প্রমাণ কেউ দিতে পারে তাহলে ঘর-বাড়ি বিক্রি করে জমিজমা যা আছে সব মসজিদের নামে দিয়ে আমরা চিরতরে গ্রাম ছেড়ে চলে যাব।’

‘চারদিন পর বাবা ঘর থেকে বের হলেও মানুষজনের সন্দেহজনক দৃষ্টিভঙ্গি বাাবকে একেবারে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে দিচ্ছে। রাস্তাঘাটে মানুষজন কাছে আসতে চাচ্ছে না। দেখলে দূর থেকে সটকে পড়ে। বাবা মুমূর্ষ সময় পার করছেন, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। করোনার গুজব ছড়িয়ে আমার মৃত মাকে নিয়েও অনেকে গালাগালি করেছে। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে অনেক রাগতস্বরে যা ইচ্ছা তাই-ই বলেছে, যা একেবারে মেনে নিতে পারছি না।’

‘মায়ের মৃত্যুতে শহর থেকে আসা আমার ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের পর্যন্ত অন্য ছেলে-মেয়েদের সাথে মিশতে দিচ্ছে না তারা। বলাবলি করছে, তাদের সংস্পর্শে এলে যে কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবে। আমার ছোট মাসুম বাচ্চারাও তাদের আক্রোশ থেকে রেহায় পাচ্ছে না। মানুষ এমন নির্দয়-নিষ্ঠুর হতে পারে, তা জীবনে আর কখনো দেখিনি।’ বলেন কামরুল ইসলাম চৌধুরী।

মৃত সেলিনা আকতারের স্বামী আব্দুল মোতলেব চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার স্ত্রীর ডায়াবেটিস ছিল। কিন্তু তার করোনা ছিল না। অনেকটা সুস্থ মানুষ। স্ট্রোক করে মারা গেলেও এ কথা কাউকে বিশ্বাস করাতে পারিনি। আমার কিছু নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশি মিলে করোনা হয়েছে এমন গুজব ছড়িয়েছে। যারা এক সময় আমাদের সহযোগিতা নিয়ে বড় হয়েছে। আমাদের বাসায় খেয়েছে-পরেছে এমন মানুষের এই আচরণ আমি মরে গেলেও ভুলতে পারবো না। আমি কী এমন অপরাধ করেছি যেটার জন্য আজ আমাকে এতো বড়ো শাস্তি পেতে হলো, আমি বুঝতেছি না। এখনো তারা আমার উপর নানাভাবে মানসিক নির্যাতন করছে। এর চেয়ে মরে গেলেও অনেক সুখ-শান্তিতে থাকতাম।’