মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২

সমস্যা সমাধানের সঠিক আইনি পথ দেখাচ্ছে ‘আইন ও অধিকার’

একুশের চোখে বিটিভি চট্টগ্রাম
| প্রকাশিতঃ ২০ নভেম্বর ২০২১ | ১০:৩৭ পূর্বাহ্ন


মোহাম্মদ রফিক : একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহজ সরল অন্তপ্রাণ শিক্ষক শাহনাজ আকতার। স্বামী থাকেন প্রবাসে। সকাল-বিকাল স্কুলের বাচ্চাদেরকে সময় দেওয়ার পর নিজের দুই বাচ্চা, বৃদ্ধ শাশুড়ি নিয়েই তার জগৎসংসার। এককথায় নির্বিবাদি, ঝামেলাযুক্ত জীবন।

একদিন উটকো, অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঝামেলা এসে হাজির তাদের মেদহীন, শান্তিপ্রিয় সংসারে। চাচাতো দেবররা জোরপূর্বক পাকাঘর নির্মাণ শুরু করে তাদের সীমানা ছাড়িয়ে শাহনাজের শ্বশুরবাড়ির অন্তত একশতক ভিটে দখল করে। এলাকার মেম্বার-চেয়ারম্যানের কানে দিয়েও কিছু হচ্ছিল না। প্রবাসে থাকা স্বামীও পারছিলেন না কিছু করতে।

এক সন্ধ্যায় টিভির চ্যানেল পাল্টাতে গিয়ে চোখ আটকে যায় বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের ‘আইন ও অধিকার’ অনুষ্ঠানে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সেই পর্বেই আলোচনা হচ্ছিল অনধিকার প্রবেশের মাধ্যমে জোরজবরদস্তি করে কেউ যদি অন্যের সীমানায় বা অংশে বাড়ি নির্মাণের চেষ্টা করে থাকে তবে তা আইনগতভাবে ঠেকাবেন কী করে! সেই অনুষ্ঠানের আলোচনা শুনে পরদিনই পরিচিত এক আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করেন ভুক্তভোগী শাহনাজ। অনুরোধ জানান ১৪৫ ধারায় আইনগত প্রতিকার নিয়ে দিতে। ওই আইনজীবীই দুদিনের মাথায় চট্টগ্রামের এডিএম আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন। সেদিনই শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে এসি-ল্যান্ডের তদন্ত প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখতে হাটহাজারী থানার ওসিকে নির্দেশ দেন আদালত।

এ প্রসঙ্গে স্কুলশিক্ষক শাহনাজ আকতার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে কাজটি বন্ধ করে দেয় এবং এসি-ল্যান্ডের তদন্ত প্রতিবেদনেও আমার শ্বশুরবাড়ির ভিটার অংশে জোরপূর্বক বাড়ি নির্মাণের বিষয়টি উঠে আসে। ফলে আমরা জায়গাটি রক্ষা করতে সক্ষম হই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যখন দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম তখনই বিটিভি, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের ‘আইন ও অধিকার’ অনুষ্ঠানটি আমাদের চোখ খুলে দেয়। আমরা টেলিভিশন কর্তৃপক্ষের কাছে কৃতজ্ঞ।’

রুনা আক্তারের দাদার সব জমি তার তিন ছেলের নামে। জমিগুলোর মিউটেশন করানো হয়নি। দাদার মৃত্যুর পর রুনার এক চাচা জমির দলিল আটকে ফেলেন। রুনার বাবার কোনো ছেলেসন্তান না থাকার কারণে তিনি জমি বুঝে পাচ্ছেন না। এখন রুনার বাবা যদি তার ভাগের কোনো অংশ বিক্রি করতে চান তাহলে কী করতে হবে? আর তাদের বোনদের নামে লিখে দিতে চাইলেই–বা কী করতে হবে?- এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছিল রুনার মনে। একপর্যায়ে বিটিভি চট্টগ্রামে কেন্দ্রের ‘আইন ও অধিকার’ অনুষ্ঠান দেখে সেই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যান রুনা। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, কারও দাদা যদি তার বাবা ও চাচাদের মধ্যে বণ্টন করে দিয়ে যান তার জমি, সে ক্ষেত্রে নামজারি বা মিউটেশন করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। ছেলেসন্তান থাকা না–থাকার সঙ্গে জমি বুঝে পাওয়া বা না পাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।

বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রে আবৃত্তিশিল্পী অ্যাডভোকেট মিলি চৌধুরীর সঞ্চালনায় ‘আইন ও অধিকার’ অনুষ্ঠানটি এভাবেই সমস্যা সমাধানের সঠিক আইনি পথ দেখাচ্ছে, সাধারণ মানুষের দৃষ্টি খুলে দিচ্ছে, সাধারণ্যে বাতলে দিচ্ছে পথ।

জানা গেছে, ‘আইন ও অধিকার’ অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠিত আইনজীবীদের পাশাপাশি তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল আইনজীবীরাও অংশ নেন। এছাড়া সাংবাদিক, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও শিক্ষাবিদরাও অংশ নিয়ে উন্মুক্ত আইনি আলোচনা করেন। তারা মানুষকে আইন সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি তাদের মনের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নের উত্তর দেন। ভুলধারণা নিরসনের চেষ্টা করেন সহজ এবং সাবলীল ভাষায়। কঠিন বিষয়গুলো প্রাণবন্ত করে তুলবার চেষ্টা থাকে গুরুত্বপূর্ণ, কল্যাণমূলক এ আয়োজনে। পাশাপাশি থাকে সুপারিশও।

বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রে ১৪ বছর ধরে প্রচারিত ‘আইন ও অধিকার’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানটি সম্পর্কে চট্টগ্রামের শীর্ষ আইনজীবীরা বলছেন, নিজের আইনগত অধিকার সম্পর্কে না জানলে যে কেউ কোনো বিষয়ে ভুল পরামর্শ দিয়ে আপনাকে ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে। রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের কী কী সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্য, সে ব্যাপারে যদি সম্যক ধারণা না থাকে তাহলে তিনি ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। বিটিভি, চট্টগ্রাম কেন্দ্রে প্রচারিত ‘আইন ও অধিকার’ তেমনই এক অনুষ্ঠান, যা বিচারপ্রার্থী নাগরিকের আইনি অধিকার সুরক্ষার বিষয়টি সহজবোধ্য করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ‘আইন ও অধিকার’ অনুষ্ঠানে প্রচলিত আইন ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ের নতুন আইনগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আলোচনায় অংশ নেন চট্টগ্রামের সিনিয়র আইনজীবীরা। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকও এই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। বর্তমান সরকারের আমলে হওয়া আইন সম্পর্কে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবী না হয়েও আইনের ভালো দিকগুলো তারা তুলে ধরেন। আবার আওয়ামী ঘরানার আইনজীবী হয়েও নতুন আইনের ত্রুটিগুলো তারা তুলে ধরছেন।

বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের উদার মানসিকতার ফলে এ অনুষ্ঠান সমৃদ্ধ এবং গ্রহণযোগ্য হচ্ছে বলে মনে করেন এডভোকেট মিলি চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আইন ও অধিকার অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষদের আইনি পরামর্শ প্রদান করা। সেই লক্ষ্যে ২০০৭ সালে আমার গ্রন্থনা, পরিকল্পনা ও উপস্থাপনায় এই অনুষ্ঠান শুরু হয়।’

‘আইন ও অধিকার’ অনুষ্ঠান সম্পর্কে দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর এডভোকেট রানাদাশ গুপ্ত বলেন, ‘আমি আইন ও অধিকার অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকবার অংশগ্রহণ করেছি। দুর্ভাগ্য যে, অনুষ্ঠানগুলো যখন প্রচারিত হয় তা আমাকে জানানো হয় না। যাই হোক জনসচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে বিশেষ করে মানুষের অধিকারটা কী? এ অধিকারের স্বপক্ষে আইনে কী আছে? আমাদের সংবিধান কী বলে? এরমধ্যে বৈপরিত্য কিছু আছে কিনা? এসব বিষয় যদি মানুষ জানতে পারে তাহলে মানুষ নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারে। আর অধিকার সচেতন হলে গণতান্ত্রিক চেতনা, আইনের শাসন এবং তার মূল্যবোধ সম্পর্কে মানুষ যদি অবহিত হয় তাহলে অসচেতনভাবে আমরা যে কাজগুলো শিক্ষিত কি অশিক্ষিত সেখানে একটা চেক এন্ড ব্যালেন্স হতে পারে। এবং এটা করার জন্য আইন ও অধিকার এর মতো আলোচনাগুলো সহায়ক বলে আমি মনে করি।’

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল বলেন, ‘আমি মাঝে মধ্যে ‘আইন ও অধিকার’ অনুষ্ঠানটি দেখি। সেখানে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা হয়ে থাকে। অনুষ্ঠানে অনেক স্বনামধন্য আইনজীবী অংশ নেন। আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা অবশ্যই জরুরি। আইন সম্পর্কে না জানলে মানুষের অধিকার লঙ্ঘিত হয়। এক্ষেত্রে আইন ও অধিকার অনুষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট মুজিবুল হক বলেন, ‘আইন ও অধিকার অনুষ্ঠানটি অবশ্যই ভালো। আমি কয়েকবার ওই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি। এমন অনেক অনুষ্ঠান আছে যেগুলো জনকল্যাণের জন্য প্রণীত হয়েছে, কিন্তু মানুষ তা জানে না। এ কারণে জনগণ সে আইনের সুবিধা নিতে পারে না। সেক্ষেত্রে এসব বিষয় যদি আলোচনা হয় সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে। পরবর্তীতে তারা এই সুযোগগুলো গ্রহণ করতে পারে। আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষ যদি না জানে তাহলে সুবিধাটা নেবে কীভাবে?’

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট রতন রায় বলেন, ‘আসলে ওই অনুষ্ঠানে দেওয়ানি বিষয়টি অনেক বছর ধরে আমি দেখছি। আমার অনুষ্ঠানটা ভালো লাগে। কারণ আমরা আইনের বিষয়গুলো এমনভাবে উপস্থাপন করতে চাই যে সাধারণ মানুষ যাতে আইন সম্পর্কে সচেতন হয়। ধরুন বায়নানামা। বায়নানামা কী? এটা সাধারণ মানুষের ধারণা থাকা উচিত। আইন এমন বিষয় সেটা শুধু আইনজীবীরা জানবেন এমন নয়। আইন সম্পর্কে মানুষ সচেতন থাকলে অধিকারবঞ্চিত হওয়ার সুযোগ কম থাকে। বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে প্রচারিত আইন ও অধিকার অনুষ্ঠানটি আমার ভালো লাগে।’

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট বদরুল আনোয়ার বলেন, ‘ওই অনুষ্ঠানে আমিও অংশগ্রহণ করেছি। এডভোকেট মিলি চৌধুরীর সঞ্চালনা ভালো। আইন বিষয়ে অনুষ্ঠান হওয়া উচিত। সাধারণ মানুষকে নতুন নতুন আইন সম্পর্কে সচেতন করার জন্য আইন ও অধিকার অনুষ্ঠান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে আমি মনে করি।’

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট এ এইচ এম জিয়াউদ্দিন বলেন, ‘আইন ও অধিকার অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক আলোচনা হয়। এখানে লিগ্যাল কিছু বিষয় আছে যেগুলো প্রচারিত হওয়া দরকার। আইন সম্পর্কে জানলে মানুষ নিজেও সতর্ক হবেন। আইন সম্পর্কে সবার জ্ঞান থাকা দরকার।’