ঢাকা: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাবে চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে; যা সরকারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সামান্য বেশি। সামগ্রিক অর্থনীতিতে এ গতিশীলতার ফলে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয়ও বেড়েছে। মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়ে এক হাজার ৬০২ ডলার হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিএস।
চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসের (জুলাই-এপ্রিল) অর্থনীতির বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিবিএস জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয়ের সাময়িক এ হিসাব করেছে।
রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বিবিএসের এ হিসাব তুলে ধরেন। বৈঠকে এ তথ্য অনুমোদন করা হয় বলে পরে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের জানান পরিকল্পনামন্ত্রী।
বৈঠক শুরুর আগে অর্থনৈতিক অগ্রগতির এসব তথ্য তুলে ধরা হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। সরকারের ধারাবাহিকতার কারণে এ ফসল অর্জিত হয়েছে।’
বিবিএস এ বছর চলতি হিসাবে মোট জিডিপি ধরেছে ১৯ লাখ ৫৬ হাজার ৫৬ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছর ছিল ১৭ লাখ ৩২ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। বিবিএসের চূড়ান্ত হিসাবে গত অর্থবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয় ৭ দশমিক ১১ শতাংশ। আর গত অর্থবছরে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল এক হাজার ৪৬৫ ডলার।
প্রায় এক দশক ৬ শতাংশের বৃত্তে আটকে থাকার পর গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ঘর অতিক্রম করে। চলতি অর্থবছরে সরকার ৭ দশমিক ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। চলতি অর্থবছরে কৃষি খাতে ৩ দশমিক ৪০, শিল্প খাতে ১০ দশমিক ৫০ এবং সেবা খাতে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে ধরা হয়েছে।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিশ্বব্যাপী অর্থনেতিক মন্দা চলছিল। বড় ও শক্তিশালী দেশগুলোতে সুনামির মতো অর্থনৈতিক বিপর্যয় আসে। আমেরিকা-ইউরোপে অনেক মানুষ বেকার হয়ে পড়ে। অনেকে ঋণ শোধ করতে না পেরে বাড়ি ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে চলে আসতে বাধ্য হয়। এরকম বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার প্রজ্ঞাময় নির্দেশনায় ও দক্ষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে বাংলাদেশ সবকিছু সুন্দরভাবে সামাল দিতে পেরেছে। অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। এখন ভালো খবর হচ্ছে, আগামী ১০ বছর বৈশ্বিক অর্থনীতি ইতিবাচকভাবে এগোবে। তাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি আরও গতিশীল হবে।’
তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপরে নেওয়া অনেকদিনের প্রত্যাশা ছিল। অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। কিন্তু গত বছর থেকে সে গণ্ডি পেরোনো সম্ভব হয়েছে। এটি অসাধারণ সফলতা। এতে ব্যবসায়ী, কৃষকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অবদান রয়েছে।’
এ বছর শুধু ভারত ৭ শতাংশের ওপরে প্রবৃদ্ধি পেতে পারে উল্লেখ করে মুস্তফা কামাল বলেন, ‘এটা ভালো লাগার বিষয়। ২০২০ সালে বাংলাদেশ ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে পৌঁছাবে। পাশাপাশি ২০৩০ ও ২০৪১-এর যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, সেগুলোও যথাযথভাবে অর্জিত হবে। কারণ এজন্য প্রধানমন্ত্রী সরকারে যারা আছেন তাদের সবাইকে প্রভাবিত ও প্ররোচিত করছেন।’
তিনি বলেন, ‘যখন ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলো, তখন অনেকের আশঙ্কা ছিল, এ অর্জন ধরে রাখা যাবে না। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, দেশে জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগ কম। জিডিপির ৩০ শতাংশ বিনিয়োগ না হলে এ অর্জন ভঙ্গুর হয়ে পড়বে। চলতি অর্থবছরে বিনিয়োগের পরিমাণ জিডিপির ৩০ দশমিক ২৭ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে সে আশঙ্কাও এখন কেটে গেছে। এ বিনিয়োগ বৃদ্ধিতেও সবার অংশীদারিত্ব আছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে এ বিনিয়োগ এসেছে।’
মন্ত্রী জানান, ‘চলতি অর্থবছরে মোট যে বিনিয়োগ হয়েছে, তার ৭ দশমিক ২৬ শতাংশ সরকারি বিনিয়োগ। আর ২৩ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ বেসরকারি বিনিয়োগ। গত অর্থবছরে জিডিপির ২৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ বিনিয়োগ ছিল।’
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘অবকাঠামো সুবিধার অভাবে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে না। বিনিয়োগ লাভবান না হলে বেসরকারি বিনিয়োগকারী আসবে না। আর বিনিয়োগ লাভবান হতে অবশ্যই অবকাঠামো সুবিধা লাগবে। এখনও চাহিদামাফিক অবকাঠামো সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এখনও চাইলেই বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অন্যান্য ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে আগামী এক বছরের মধ্যে এসব সীমাবদ্ধতা দূর হবে।’
বিশ্বব্যাংক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হবে বলে প্রক্ষেপণ করেছে; সরকার কিসের ওপর ভিত্তি করে ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলছে—এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক এ বছর অনেক হৃদয়বান। সংস্থাটি কখনও ৬ দশমিক ৭ শতাংশের ওপরে প্রক্ষেপণ করেনি, এবার প্রথম ৬ দশমিক ৮ শতাংশ করেছে। অন্যদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ৬ দশমিক ৯ শতাংশ প্রক্ষেপণ করেছে। সরকারের সব তথ্য ওয়েবসাইটে আছে। কোথাও কোনো ব্যত্যয় ঘটলে সেগুলো অবশ্যই দেখা হবে।’