রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

মরণঘাতি হেপাটাইটিস ভ্যাকসিনের আওতায় এসেছে শুধু চট্টগ্রামেরই আড়াইশ’ হিজড়া

ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদের অনন্য উদ্যোগ
| প্রকাশিতঃ ৭ অগাস্ট ২০২২ | ১২:৪০ অপরাহ্ন


একুশে প্রতিবেদক : তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর জীবনমান নিয়ে সরকারি-বেসরকারি কারোরই উদ্যোগ তেমন চোখে পড়ে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান– মৌলিক কিংবা কোনো নাগরিক সুযোগ সুবিধার আওতায় এখনো আসেনি তারা। নেই তাদের পরিপূর্ণ ভোটাধিকার। এমনকি মৃত্যুর পর ৩ হাত কবরের জায়গা জোটাতেও তাদের হিমশিম খেতে হয়।

সেই অচ্যুত, অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে বিনামূল্যে হেপাইটাইটিস বি ভাইরাসের রক্তপরীক্ষা ও ভ্যাকসিনের আওতায় এনেছে চট্টগ্রাম লিভার কেয়ার সোসাইটি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হেপাটোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ প্রতিষ্ঠিত লিভার কেয়ার সোসাইটির অনেকগুলো স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্পেইন, সচেতনতা ও ইতিবাচক উদ্যোগের মাঝে চট্টগ্রামের হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রায় ২৫০ জনকে মরণঘাতি হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ভ্যাকসিনের আওতায় আনা শুধু চট্টগ্রাম নয়, সমগ্র বাংলাদেশেই অনন্য ও নজিরবিহীন উদ্যোগ বলে মনে করেন অনেকে।

২০১৬ সালে ক্ষুদ্র পরিসরে চট্টগ্রাম লিভার কেয়ার সোসাইটির যাত্রা শুরু হলেও সংগঠনটির সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কাজ শুরু হয় মূলত বছর দুয়েক আগে। এর মধ্যে সংগঠনটি হিজড়া জনগোষ্ঠী ছাড়াও বিভিন্ন স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, বস্তি এলাকায় অন্তত দুই হাজারের বেশি মানুষকে হেপাটাইটিস সংক্রান্ত স্ক্রিনিংয়ের আওতায় এনেছে। যারা নেগেটিভ চিহ্নিত হয়েছেন তাদের বেশ কয়েকজনকে ভেকসিনের আওতায় এনেছে।

এ প্রসঙ্গে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি লিভার বিশেষজ্ঞ ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, একজনের ব্লাড স্ক্রিনিংয়ে খরচ হয় ৩শ’ টাকা। দুই হাজারের বেশি মানুষকে আমরা সেটি বিনামূল্যে করে দিয়েছি। এর মধ্যে যাদের রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে তাদের মধ্য থেকে ৭০ জনকে আমরা ভ্যাকসিনের আওতায় এনেছি। অন্যদিকে ৩ ডোজের ভ্যাকসিন দিয়েছি আড়াইশ’র বেশি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে। ৩ ডোজ ভেকসিন সম্পন্ন করতে ন্যূনতম খরচ পড়ে ১৪ শ’ টাকা।

‘স্ক্রিনিং বাদে শুধু ভ্যাকসিনের খাতেই আমাদের খরচ হয়েছে প্রায় ৫ লাখ টাকা। যদি আমাদের পর্যাপ্ত সামর্থ্য থাকত, সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পাওয়া যেতো, তাহলে পর্যায়ক্রমে আমরা চট্টগ্রামের হতদরিদ্র সকলকে ব্লাড স্ক্রিনিং ও ভ্যাকসিনের আওতায় নিয়ে আসতে পারতাম। স্ক্রিনিংয়ে যারা পজিটিভ অর্থাৎ ভাইরাসটির ক্যারিয়ার হিসেবে ধরা পড়েছে, আজীবন তাদের একটা স্বাস্থ্যগত গাইডলাইনের মধ্যে থাকতে হবে। বিনামূল্যে আমরা সেই গাইডলাইন কিংবা সহজ উপায়ে চিকিৎসার উপায় বাতলে দেওয়ার কাজটিও করেছি।’- বলেন ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ।

হিজড়াদের ব্যয়বহুল ভ্যাকসিনের আওতায় আনা প্রসঙ্গে ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, এমনিতেই তারা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। তাছাড়া যেসব কারণে ভাইরাসটি ছড়ায় যেমন, যত্রতত্র যৌনসংশ্রব, অরক্ষিত পানি পান, ঝুঁকিপূর্ণ রক্রসঞ্চালন, দাতের ডাক্তার, সেলুন- এসব থেকে মূলত হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ছড়ায়। এ ক্ষেত্রে হিজড়ারাই সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত বলে আমাদের মনে হয়েছে।

বিষয়টি মাথায় কাজ করার পর একদিন দেখা করি চট্টগ্রাম সমাজ সেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালকের সঙ্গে। তিনি আমাকে হিজড়াদের প্রধান ফাল্গুনি হিজড়ার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তারপর তাদের যারা নিয়ন্ত্রণ করে ঢাকার হিজড়া সোসাইটি, তাদের অনুমতি সাপেক্ষে হিজড়াদের নিয়ে আমরা কাজ শুরু করি। নগরের ঝাউতলা, আকবর শাহ, ঈদগা কাঁচারাস্তা, চাক্তাই এলাকার প্রায় আড়াইশ’ হিজড়াকে আমরা প্রথমবারের মতো ব্লাড স্ক্রিনিং ও ভ্যাকসিনের আওতায় এনেছি।

এসব অর্থসংস্থান কীভাবে হয়েছে জানতে চাইলে ডা. মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের সংগঠনের সদস্যদের সদস্যগ্রহণের টাকা (সাধারণ সদস্য ৫শ’, আজীবন সদস্য ৫ হাজার, করপোরেট সদস্য ৫ হাজারের বেশি) মাসিক ও বাৎসরিক চাঁদা এবং আমাদের স্বজন-শুভার্থী, বন্ধুমহলের সহযোগিতায় আমরা এসব কাজ করে যাচ্ছি।’

তিনি বলেন, আমাদের সবচেয়ে বেশি অর্থব্যয় হচ্ছে সমাজে সচেতনতা তৈরি ও প্রচার-প্রচারণায়। কারণ ১০ জন হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ক্যারিয়ারের মাঝে ৯ জনই জানেন না তিনি হেপাটাইটিস ভাইরাসের বহনকারী। এই যে না জানা- তার ফলে একটা পর্যায়ে তিনি লিভার ক্যান্সার ও লিভার সিরোসিসের মতো প্রাণঘাতি রোগের দিকে ধাবিত হচ্ছেন। আর জানলে পরে, তিনি সুনির্দিষ্ট নিয়ম-শৃঙ্খলা ও চিকিৎসকের গাইডলাইনে থাকতে পারছেন। এতে করে অনেক সময় ভাইরাসটি নিষ্ক্রিয় থাকে।’

‘গত তিন বছর ধরে আমরা এই সচেতনতামূলক কাজগুলো করে যাচ্ছি। গেলো সপ্তাহে রয়েল গার্ডেন কমিউনিটি সেন্টারে আমরা ৫ শতাধিক মানুষকে নিয়ে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে বিশাল ক্যাম্পেইন ও র‍্যালির আয়োজন করেছি। সেখানে বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কথামালা, আকর্ষণীয় র‍্যাফেল ড্র, উপস্থিত সবাইকে টিশার্ট ও ক্যাপ উপহার এবং দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করেছি। আমরা চাইছি এখান থেকে হেপাটাইটিস সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করে বাড়ি কিংবা গ্রামে গিয়ে একেকজন দূত হিসেবে কাজ করবেন। কারণ সময় অনেক গড়িয়েছে। আমাদের আর এক মুহূর্তও বসে থাকার সময় নেই।’ – যোগ করেন ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ।


চট্টগ্রামে হিজড়াদের প্রধান ফাল্গুনি হিজড়া ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘আমরাই সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত জনগোষ্ঠী। না সরকার, না রাষ্ট্রযন্ত্র কেউ আমাদের খবর রাখে না। একমাত্র ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদই আমাদের কথা ভেবেছেন। মরণঘাতি হেপাটাইটিস ভাইরাস থেকে রক্ষার লক্ষ্যে আমাদেরকে বিনামূল্যে রক্তপরীক্ষা ও ভ্যাকসিনের আওতায় এনেছেন। আমরা হিজারা জনগোষ্ঠী কখনো ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদের কথা ভুলব না।’

প্রসঙ্গত, মহামারি করোনা ভাইরাসের চেয়েও বহুগুণ ভয়াবহ হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস। কারণ, হেপাটাইটিসের তেমন কোনো লক্ষণ বা উপসর্গ থাকে না। ফলে অজান্তেই এই ভাইরাস বহন করছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। অন্যদিকে সামান্য জ্বর, সর্দি, গলাব্যথা হলেই পরীক্ষা করে করোনার অস্তিত্ব জেনে নেওয়া যায়। গত আড়াই বছরে বাংলাদেশে প্রায় ৩০ হাজার লোক করোনায় মারা গেছেন। আর হেপাটাইটিস ভাইরাসে বছরেই মারা যাচ্ছেন ২৫ হাজার মানুষ। সে হিসেবে গত আড়াই বছরে এই ভাইরাসে বাংলাদেশে মারা গেছেন ৬২ হাজার ৫শ’ জন। অথচ এদিকে সরকারের কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। নেই বাস্তবসম্মত উদ্যোগ, সচেতনতা। বর্তমানে বাংলাদেশে হেপাটাইটিস ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি। বিশাল এই জনগোষ্ঠী কিংবা ওয়ার্কফোর্সকে মৃত্যুঝুঁকিতে ঠেলে দিয়ে দেশের উন্নয়ন, অগ্রযাত্রা কীভাবে আশা করে সরকার?

সচেতন মহলের এই প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে আজ সরকারের কাছে দাবি উঠেছে, সরকার দ্রুত এই খাতে নজর দিক। অন্তত ফ্রি স্ক্রিনিং, ভ্যাকসিন ও ওষুধগুলো বিনামূল্যে মিলুক সরকারি হাসপাতালগুলোতে।