শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

চট্টগ্রাম বন্দরে নিলামের নামে ‘পুকুরচুরির’ আয়োজন!

| প্রকাশিতঃ ৭ অগাস্ট ২০২২ | ৬:৫৬ অপরাহ্ন


জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত : চট্টগ্রাম বন্দরের ভাণ্ডার বিভাগে পণ্য নিলামের নামে পুকুরচুরির আয়োজন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বাজার দরের দ্বিগুণ দামে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মালামাল কিনছে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চলছে অসম প্রতিযোগিতা। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দ্বিগুণ দামে মালামাল কেনার কারণ অনুসন্ধানে নেমে মিলল চাঞ্চল্যকর তথ্য।

জানা যায়, গত ৪ জুলাই অপ্রয়োজনীয়, অকেজো ও বাতিল পণ্য বিক্রির জন্য ৩৪টি লটে দরপত্র (স্টোর/অকশন/০৩/২১-২২) আহ্বান করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ‘কন্ট্রোলার অব স্টোরস’ দপ্তর। যদিও বন্দর কর্তৃপক্ষের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে ‘দরপত্র রেফারেন্স নং- স্টোর-অকশন-০৩-২১-২২, তারিখ: ০৪-০৭-২০২২খ্রিঃ – চবক এর বিভিন্ন বিভাগের অকেজো ও বাতিল মালামাল নিলামে বিক্রয়’ শিরোনামে বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ করা হয় ৯ দিন পর ১৩ জুলাই।

নিলামে উঠা ৩৪টি লটের জন্য দরপত্র পড়ে মোট ৪৯টি। পূর্বঘোষিত দিনে (২ আগস্ট) কন্ট্রোলার অব স্টোরস’ দপ্তরে খোলা হয় দরপত্র। তবে সবচেয়ে বেশি দরপত্র পড়েছে ১৫টি লটের জন্য। এরমধ্যে ১নং লটে (আয়রন স্ক্র‍্যাপ ও স্টীল ওয়্যার রোপ) ১৩টি, ২নং লটে (পুরাতন ব্যাটারি) ১৮টি, ২১নং লটে (মেশিনারি স্ক্র‍্যাপ ও মিসিলিনিয়াস স্ক্র‍্যাপ) ১৫টি, ২২নং লটে (আয়রন স্ক্র‍্যাপ, স্টীল ওয়্যার রোপ ও জি. আই. পাইপ) ১০টি, ২৩নং লটে (পুরাতন ব্যাটারি) ১২টি দরপত্র পড়েছে।

১নং লটের ৮৩ হাজার ৬৪৭ কেজি আয়রন স্ক্র‍্যাপ ও ১২ হাজার ১৭০ কেজি স্টিল ওয়্যার রোপের জন্য সর্বোচ্চ দর পড়েছে ৫১ লাখ ৫১ হাজার ৩১৩ টাকা ১০ শতাংশ হারে আগাম আয়কর এবং ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে মূল্য সংযোজন কর সহ এই মূল্য দাঁড়ায় ৬০ লাখ ২৭ হাজার টাকা। কেজি প্রতি এর মূল্য পড়ে ৬৩ টাকা। ডিসমেন্টাল ও পরিবহন খরচসহ এই মূল্য ঠেকে প্রায় ৮০ টাকায়।

২১নং লটের ২৬ হাজার ১০৯ কেজি স্ক্র‍্যাপের জন্য সর্বোচ্চ দর পড়েছে ১৯ লাখ ১৯ হাজার ২৭৩ টাকা। ১০ শতাংশ হারে আগাম আয়কর এবং ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে মূল্য সংযোজন করসহ এই মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। ফলে কেজি প্রতি এর দর হয় প্রায় ৮৬ টাকা। ডিসমেন্টাল ও পরিবহন খরচসহ এই মূল্য ঠেকে প্রায় ১০০ টাকায়।

একইভাবে ২২নং লটের ৫৬ হাজার ৫৮ কেজি আয়রন স্ক্র‍্যাপ ও স্টিল ওয়্যারের জন্য সর্বোচ্চ দর পড়েছে ৩৬ লাখ ৩৬ হাজার ২৫ টাকা। ১০ শতাংশ হারে আগাম আয়কর এবং ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে মূল্য সংযোজন করসহ এই মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৪২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। যার কেজি প্রতি দর হয় প্রায় ৭৩ টাকা। ডিসমেন্টাল ও পরিবহন খরচসহ এই মূল্য ঠেকে প্রায় ৯০ টাকায়।

জানা গেছে, বাজারে শিপ ব্রেকিংয়ের লোহা ও এর স্ক্র‍্যাপগুলো এ গ্রেডের হওয়ায় এর দাম সবচেয়ে বেশি। খোলা বাজারে এসব স্ক্র‍্যাপের দর কেজি প্রতি ৫৭ টাকা; যা এ যাবতকালের সর্বোচ্চ মূল্য। তবে বন্দরের এ ধরনের স্ক্র‍্যাপগুলো সাধারণত হয় সি গ্রেডের। এক্ষেত্রে এর বাজার দরও অনেক কম। এক্ষেত্রে লাভ করতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এসব স্ক্র‍্যাপ কিনতে হবে ৪৫-৫০ টাকার মধ্যে। মজার বিষয় হলো ৩টি লটেই মালামালের জন্যই প্রায় দ্বিগুণ মূল্যে সর্বোচ্চ দরদাতা হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মামুন এন্ড ব্রাদার্স।

অন্যদিকে, ২নং লটের ২২৩টি (প্রায় ৫ টন) ও ২৩ নং লটের ৩৩২টি (প্রায় ৬ টন) পুরনো ব্যাটারির জন্য সর্বোচ্চ দর পড়েছে যথাক্রমে ১০ লাখ ৪১ হাজার ৯৯৯ টাকা ও ১১ লাখ ৭৬ হাজার ৯৯৯ টাকা। ১০ শতাংশ হারে আগাম আয়কর এবং ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে মূল্য সংযোজন করসহ এই মূল্য দাঁড়ায় যথাক্রমে ১২ লাখ ১৯ হাজার ও ১৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে কেজিপ্রতি দর হয় প্রায় ২৩৬ টাকা পরিবহন খরচসহ এই মূল্য ঠেকে প্রায় ২৪৫ টাকায়।

দুটি লটের জন্য সর্বোচ্চ দর দিয়ে দরপত্র পেয়েছে মেসার্স ইউনাইটেড বলগারনাইজিং নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। যদিও বাজার দর অনুযায়ী প্রতি কেজি ব্যাটারির দাম ১৩৪ টাকা। বাজারে দরের সাথে সামঞ্জস্য রেখে লাভ করতে হলে প্রতিকেজি ব্যাটারি কেনার জন্য যেকোন প্রতিষ্ঠানকে দিতে হবে ১২০-১২৫ টাকা। কিন্তু আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো প্রায় দ্বিগুণ মূল্যে এসব ব্যাটারি কিনেছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রশ্ন উঠেছে, ভান্ডার ডিপোতে রক্ষিত এসব মালামাল নিতে কেন এই অসম প্রতিযোগিতা? বাজার দরের (বিক্রয় মূল্য) চেয়ে দ্বিগুণ দামে এসব মালামাল কেনার পেছের উদ্দেশ্য কী? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অনুসন্ধানে নামে একুশে পত্রিকা। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বেশকিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য।

জানা যায়, সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের দেওয়া দর জেনে আগমুহূর্তে নিলামে সর্বোচ্চ দর দেয় প্রতিষ্ঠানগুলো। এক্ষেত্রে বাজার দরের দ্বিগুণ দামে এসব মালামাল কেনার উদ্দেশ্যেটাও বেশ পরিষ্কার।

দরপত্রের শর্তানুযায়ী, মালামাল সরবরাহ আদেশ ইস্যুর দিন থেকে ৩০ দিনের মধ্যে মালামাল নিয়ে যেতে হয়। অন্যথায় জামানত, মালামাল ও জমাকৃত টাকা বাজেয়াপ্ত করার এখতিয়ার রাখে কর্তৃপক্ষ। মূলত এই শর্তকেই ঢাল বানিয়ে চলছে মূল অনিয়ম। জানা যায়, মালামাল কিনে সাথে সাথে ডেলিভারি নেওয়ার নিয়ম থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে এসব মালামাল ভান্ডার বিভাগে রেখে দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো।

ডেলিভারি প্রদানের নির্দিষ্ট সময় সীমার পর বিশেষ বিবেচনায় যদি অতিরিক্ত সময় মঞ্জুর করা হয় তাহলে বর্ধিত সময়সীমার জন্য প্রতি বর্গমিটার বা অংশ বিশেষের জন্য প্রতিদিন হিসেবে প্রথম সপ্তাহে ৪.৪৬ টাকা, দ্বিতীয় সপ্তাহে ৬.১৫ টাকা ও তৃতীয় সপ্তাহে ৯.৮৫ টাকা হারে জায়গা ভাড়া আরোপ করা হবে।

কয়েক ধাপে এসব মালামাল ডেলিভারি নেয় তারা। এর উদ্দেশ্য হতে পারে, প্রতিবার ডেলিভারি নেওয়ার সময় অতিরিক্ত (মূল মালের সমপরিমাণ) মালামাল নিয়ে যাওয়ার সুযোগ। দায়িত্বরত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হাত করে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড করার সুযোগ আছে প্রতিষ্ঠানগুলোর। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত মালামাল নিতে টন প্রতি বিরাট অংকের উৎকোচ দেওয়া হতে পারে সেসব কর্মকর্তাদের।

শুধু তাই নয়, দরপত্রের ৩নং শর্তানুযায়ী বর্ণিত মালামাল লটভিত্তিক এবং যেখানে যে অবস্থায় আছে সেইভাবেই ডেলিভারি দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। পণ্যের আকার ও মান নিয়েও বড় জালিয়াতির সুযোগ আছে। নিলামে অপেক্ষাকৃত ছোট ও অকেজো পণ্য প্রদর্শিত হলেও আকারে বড় ও সচল পণ্য দিয়ে দেওয়া হয় ডেলিভারিতে সময়, এমন অভিযোগও আছে। এমনটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হয়ে থাকে ব্যাটারি, টায়ারসহ অন্যান্য জিনিসের ক্ষেত্রে। এতে একদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন লাভবান হয় তেমনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পকেটও ফুলে ফেঁপে উঠার সুযোগ আছে।

সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে জানান, সিসিটিভি ক্যামেরা ফাঁকি দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অগোচরে এ ধরনের কর্মকাণ্ড হচ্ছে। এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড হয় বলেই দ্বিগুণ দামে মালামাল কেনার ঘটনা ঘটছে। নয়তো অন্য কোন কারণ নেই দ্বিগুণ দামে মালামাল কেনার। সঠিক তদন্ত হলে এসব অনিয়ম বেরিয়ে আসবে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মেসার্স মামুন এন্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী মঞ্জুর মোর্শেদ মামুনসহ বেশ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে সখ্যতা আছে ভান্ডার বিভাগের এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ম্যানেজ করেই দীর্ঘদিন ধরে কিছু প্রতিষ্ঠান ভান্ডার বিভাগের মালামাল লুট করছে বলে অভিযোগ আছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক একুশে পত্রিকাকে অভিযোগ করে বলেন, বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে নিলামের মালামাল নিয়ে নয়ছয় করা হচ্ছে। এসব নিয়ে কেউ কিছু বলতে পারে না। কারণ যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের দৌড় অনেকদূর। তাদের বিরুদ্ধে বললে ভবিষ্যতে টেন্ডারে অংশ নেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। অন্যদিকে যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ ধরনের কার্যক্রম করে তাদের ক্ষমতাও অনেক। তাই সবাই এ বিষয়ে মুখ খুলতে ভয় পায়।

জানতে চাইলে ভান্ডার বিভাগে কর্মরত ইউনুস মিয়া (পণ্য হ্যান্ডেলিং) একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ভান্ডার বিভাগের সকল কার্যক্রম কাগজপত্রের মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। এ ধরনের কিছু করার সুযোগ নেই। এখানে ক্যামেরা আছে, গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন অফিসাররা আছেন, কন্ট্রোলার অব স্টোর আছেন। তাদের ফাঁকি দিয়ে এমন কিছু করা অসম্ভব। আমাদের হেনস্তা করার জন্যই এসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘করোনাকালে কিছু মালামাল এখানে ছিল, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর এসব মালামাল নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কেউ যদি বানিয়ে কিছু বলে তাহলে আমাদের কিছু করার নেই।’

এ বিষয়ে জানতে আরেক অভিযুক্ত স্টোর কিপার আলী আকবরকে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি।

বাজার দরের চেয়ে দ্বিগুণ দামে মালামাল কেনার কারণ জানতে চাইলে মেসার্স মামুন এন্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী মঞ্জুর মোর্শেদ মামুন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ক্যালকুলেশন করেই এই মালামালগুলো আমরা কিনেছি। এসবের মধ্যে কিছু জিনিস আমরা হয়তো নিজের জন্য ব্যবহার করবো। আবার কিছু জিনিস বিক্রি করবো। আমাদের একটা বিজনেস পলিসি আছে। এভাবে আমরা পুষিয়ে নিতে পারি।’

ডেলিভারির সময় বাড়তি মালামাল নিয়ে আসার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের সুবিধা আমি কখনো পাইনি। এমন অসংগতিপূর্ণ অভিযোগ কে করলো সেটা আমি বুঝতে পারছি না। হয়তো পণ্যগুলোর নিলাম আমি পেয়ে যাওয়ায় এমন অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু অন্য যারা নিলামে অংশগ্রহণ করেছেন তাদের সাথে আমার তফাৎ খুব একটা বেশি না।’

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ভান্ডার বিভাগের কন্ট্রোলার অব স্টোরস মো. আবদুল হান্নান বলেন, ‘সবেমাত্র (১ মাস আগে) এই ডিপার্টমেন্টে এসেছি। এ ধরনের কোনো বিষয় আগে ঘটেছে কিনা তা আমি খতিয়ে দেখলে বুঝতে পারবো। আমি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলবো। আগের কোনো নিলামে অসংগতি আছে কিনা সেটা দেখবো। এ ধরনের কিছুর প্রমাণ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

চট্টগ্রাম বন্দর সচিব ওমর ফারুক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এমন কোনো অভিযোগ বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে আসলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া যারা টেন্ডারে অংশগ্রহণ করেছেন তাদের কোনো অভিযোগ থাকলে তারা সে বিষয়ে মিটিংয়ে বলতে পারে। আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিলে তা খতিয়ে দেখা হবে।’