
চট্টগ্রাম : চলমান উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের বাংলা প্রথমপত্রের ৪০ নম্বরের সৃজনশীল প্রশ্নে ৪১টি ভুল পাওয়া গেছে। এই ভুল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে।
গত রোববার পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ভুলগুলো তুলে ধরে ভাষাবিদ ড. মোহাম্মদ আমীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, চট্টগ্রাম বোর্ডের বাংলা (আবশ্যিক) সৃজনশীল (প্রথমপত্র) ৪০ নম্বরের প্রশ্নপত্রে ৪১টি ভুল/অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান’ (বাএআবাঅ) এবং বাংলা একাডেমি প্রণীত ‘বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ (বাএপ্রবাবানি) পুস্তিকা অনুসারে ভুল/অসংগতিসমূহ চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, মাতৃভাষার প্রতি এমন অবহেলা পৃথিবীর আর কোনো জাতির মধ্যে দেখা যায় না। শিক্ষকরা যদি এমন আচরণ করেন তো সাধারণ বাঙালির কী অবস্থা হবে তা ভাবতেই লজ্জা আর শঙ্কায় নত শিউরে উঠতে হয়।
চট্টগ্রাম বোর্ডের প্রশ্ন ঘেঁটে দেখা গেছে, ৪ পৃষ্ঠার প্রশ্নের পূর্ণমান ৪০। ‘হালদা’ নামের প্রশ্নের এক নম্বর পৃষ্ঠায় ৫টি ভুল।
এর মধ্যে প্রশ্নের শুরুতেই ১. ‘যে কোনো’ লেখা আছে। প্রকৃতপক্ষে এটি ‘যে-কোনো অথবা যেকোনো’ এভাবে লেখা উচিত। ২. দাবী> দাবি, ৩. আকাশ ছোঁয়া> আকাশ-ছোঁয়া, ৪. সঙ্গতিপূর্ণ> সংগতিপূর্ণ, [(সংগতি+পূর্ণ) বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ১২৬৫], ৫. নেয়না> নেয় না [না-বাচক না এবং নি-এর প্রথমটি (না) স্বতন্ত্র পদ হিসেবে এবং দ্বিতীয়টি (নি) সমাসবদ্ধ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। বাএপ্রবাবানি, অনুচ্ছেদ: ৩.৩]। দ্বিতীয় পৃষ্ঠার প্রশ্নের ভুলগুলোর মধ্যে রয়েছে, ৬. মুক্তি বাহিনীতে> মুক্তিবাহিনীতে (বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ১১১৮)। একবার লেখা হয়েছে ‘মুক্তি বাহিনী’ আরেকবার লেখা হয়েছে ‘মুক্তিবাহিনী’। ৭. তাকে> তাঁকে [একই ব্যক্তির জন্য পরের সর্বনামসমূহে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করা হয়েছে।] ৮. দেননা> দেন না [না সংশ্লিষ্ট পদ হতে ফাঁক রেখে বসে; বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম, অনুচ্ছেদ: ৩.৩, প্রাগুক্ত: ৫] ৯. লাগবেনা> লাগবে না [প্রাগুক্ত: ৫], ১০. গার্মেন্টস কর্মী> গার্মেন্টসকর্মী [বাএপ্রবাবানি, অনুচ্ছেদ: ৩.১]।
১১. নানা-নানীর> নানা-নানির [বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ৭২৬], ১২. গরীব> গরিব [বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ৩৯০], ১৩. নানা-নানী> নানা-নানি [বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ৭২৬], ১৪. সাধ্যমত> সাধ্যমতো [বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ১৩১৮], ১৫. হলনা> হলো না [বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ১৩৮৫, বাএপ্রবাবানি, অনুচ্ছেদ: ৩.৩], ১৬. নানা-নানীর> নানা-নানির [বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ৭২৬], ১৭. নানা-নানী> নানা-নানি [বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ৭২৬], ১৮. নানা-নানীর> নানা-নানির [বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ৭২৬], ১৯. ছেলে- মেয়েরা > ছেলে-মেয়েরা [হাইফেনের পর ফাঁক হয় না।], ২০. নেয়ার> নেওয়ার [নেয়ার অর্থ খাটের পৃষ্ঠদেশে বুননের জন্য (কাঠের পাটাতনের পরিবর্তে) ব্যবহৃত মোটা সুতোয় বোনা চওড়া ফিতে (বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ৭৬০)। ‘নেয়া’ শব্দটি ‘লওয়া’ অর্থে আঞ্চলিক ভাষায় ব্যবহৃত হতে পারে।]। তৃতীয় পৃষ্ঠার ভুলগুলো হচ্ছে, ২১. হৈচৈ> হইচই [বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ১৩৭৯], ২২. গরীব ঘরের> গরিব ঘরের [বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ৩৯০], ২৩. বয়সী> বয়সি [বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ৯১৯], ২৪. বয়সী> বয়সি [বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ৯১৯]।
২৫. চায়না> চায় না [চায়না একটি দেশ ও ভাষার নাম; প্রাগুক্ত: ৫], ২৬. ভেংচি> ভ্যাংচি [ভ্যাংচানো থেকে ভেংচি; বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ১০৬১], ২৭. শাড়ীর> শাড়ির [বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ১২২৯], ২৮. সঙ্গতিপূর্ণ> সংগতিপূর্ণ (সংগতি+পূর্ণ; বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ১২৬৫]। চার নম্বর পৃষ্ঠার ভুলগুলো হচ্ছে, ২৯. বড়> বড়ো [বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ৯১২], ৩০. উচ্চ শিক্ষা> উচ্চশিক্ষা [বাএআবাঅ এবং বাএপ্রমবাবানি, অনুচ্ছেদ: ৩.১], ৩১. পাঠায়> পাঠান [একই ব্যক্তির জন্য এর আগে সম্মানসূচক ক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে।], ৩২. অসহায়, দুস্থ রোগীদের> অসহায় ও দুস্থ রোগীদের [বাক্য বিন্যাস অনুযায়ী কমা-চিহ্ন সমীচীন হয়নি।], ৩৩. তাবিজ কবজ> তাবিজ-কবজ/তাবিজকবজ [বাএপ্রবাবানি, অনুচ্ছেদ ৩.১], ৩৪. ঝাড় ফুঁক> ঝাড়ফুঁক [বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ৫৪০]।
৩৫. অন্ধ বিশ্বাস> অন্ধবিশ্বাস [বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ৫৬], ৩৬. পারেনা> পারে না [প্রাগুক্ত: ৫], ৩৭. কোন> কোনো [বাংলা কোন (উচ্চারণ: কোন্) অর্থ (সর্বনামে) কী, কে, কোনটি (কোন বছর, কোন লোক, কোন জিনিস); (ক্রিয়াবিশেষণে) কী প্রকারে, কীভাবে, কীসে (তুমিই বা কোন লাট বাহাদুর)। এটি কোনো বা কোনও শব্দের সমার্থক নয়। যেমন: “তুমি কোন জামাটি চাও” বাক্যে একই অর্থ প্রকাশে ‘কোনও’ বা ‘কোনো’ ব্যবহার বিধেয় নয়। ৩৮. কোন দিকে> কোনোদিকে, ৩৯. শিকর> শিকড় [বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ১২৩৩], ৪০. বড়>বড়ো [বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ৯১২] এবং ৪১. সঙ্গতিপূর্ণ> সংগতিপূর্ণ (সংগতি+পূর্ণ; বাএআবাঅ, পৃষ্ঠা: ১২৬৫)।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নারায়ণ চন্দ্র নাথ বলেন, বাংলা প্রথমপত্রের প্রশ্ন প্রণয়নকারী ও পরিশোধনকারীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেব। ভুল প্রশ্ন প্রণয়নকারী ও পরিশোধনকারীরা যেন ভবিষ্যতে বোর্ডের কোনো কাজে সম্পৃক্ত হতে না পারে সে বিষয়ে আন্তঃশিক্ষাবোর্ড ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করা হবে।