চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার নিরসনে কাজ চলছে জানিয়ে নগরবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। সোমবার দুপুরে নগরভবনের কে বি আবদুচ ছত্তার মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান। জলাবদ্ধতা নিরসনে ও বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামত করণে গৃহীত উদ্যোগ ও কার্যক্রম বিষয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে আমরা বসে নেই। আমরা কাজ করছি। কাজ করছি বলেই, কিছু কিছু এলাকায় ভালো ফল এসেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকবে। আগামী দিনগুলোতে এটা আরও বেগবান হবে। আমাদের বিশ্বাস চসিকের সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে নগরীতে জলাবদ্ধতা আর হবে না।
মেয়র বলেন, জলাবদ্ধতা নানা কারণে সৃষ্টি হয়। এরমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি, কাপ্তাই বাঁধের পানি ছাড়া, অতিবর্ষন, পাহাড়ের বালি মাটি মিশ্রন, খাল-নালা দখল, জলাদার ও জলাশয় কমে যাওয়া এবং খাল-নালার ধারন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া।
মেয়র বলেন, প্রকৃতি সৃষ্ট দুর্ভোগ লাঘব করা দুঃসাধ্য বিষয়। তবে মানব সৃষ্ট দুর্ভোগ লাঘব করা জনসচেতনতার মাধ্যমে সম্ভব। স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা, সোয়ারেজ ও মাষ্টার প্লান্ট বাস্তবায়িত হলে নাগরিক দুর্ভোগ অনেকাংশে নিরসন করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, অতীতের তুলনায় জলাবদ্ধতার কারণে সৃষ্ট নাগরিক দুর্ভোগ কিছুটা কমেছে। ফ্লাইওভার নির্মাণ, ওয়াসা, পিডিবি ও টিএন্ডটি ও গ্যাস কোম্পানীর রোড কাটিং এর কারণে নগরীতে জনদুর্ভোগ অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারী এ কাজে বাধা দেয়ার কোন সুযোগ আমার নেই।
মহেশখালের কার্যক্রম এবং আগামী পরিকল্পনা বিষয়ে একটি ম্যাপ তুলে ধরে তিনি বলেন, মহেশখালের পানি কর্ণফুলী নদীতে প্রবাহের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে প্রবাহের লক্ষ্যে ড্রাইভারশান খাল খনন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। নগরীর খালগুলোর জরিপ কাজ চলমান আছে। জরিপ শেষে খালের দু’পাড়ে রাস্তা নির্মাণ এবং অবৈধ দখল ও স্থাপনা চিরতরে উচ্ছেদ করা হবে। খালের পাড়ে কোন বসতি গড়ে তুলতে দেয়া হবে না।
আ জ ম নাছির উদ্দীন সংবাদ সম্মেলন বলেন, চট্টগ্রাম নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে অবস্থিত ১৪৪ কিমি খাল এবং প্রায় ৬ শত কিমি নালা-নর্দমা পরিষ্কার করার জন্য ১৮ কোটি টাকার দরপত্র আহবান করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু কাজ সমাপ্ত হয়েছে। কিছু কাজ চলমান রয়েছে এবং অবশিষ্ট কাজের কার্যাদেশ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়াও শ্রমিক নিয়োগ করে নিজস্ব ও ভাড়াকৃত এস্কেভেটর এর মাধ্যমে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ খাল সমূহে প্রতিনিয়ত মাটি উত্তোলনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, প্রতি বছর বর্ষাকালে পাহাড় থেকে নেমে আসা বালিতে নালা-নর্দমা ভরাট হয়ে পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। ফলে ভরাটকৃত বালি ও ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করার জন্য প্রকল্প নেয়া হয়। গত অর্থবছরেও নালা-নর্দমা পরিষ্কার করার জন্য ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নালা-নর্দমা পরিষ্কার করা হয়েছে। এ ছাড়াও বিমান বন্দর সড়কের সিমেন্ট ক্রসিং থেকে রুবি সিমেন্ট ফ্যাক্টরী পর্যন্ত রাস্তার অংশে জলাবদ্ধতা দূরীকরণের জন্য ৪ হাজার ৬ শত ফুট ড্রেইন নির্মাণ কাজের জন্য ৬ কোটি ২৪ লক্ষ ৩২ হাজার টাকার দরপত্র আহবান করা হয়েছে।
মেয়র বলেন, প্রায় ৩২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বহদ্দারহাট বারইপাড়া হয়ে কর্নফুলী নদী পর্যন্ত খাল খনন প্রকল্প চলমান রয়েছে। এ খাতে বর্তমানে ৬০ কোটি টাকা মন্ত্রনালয় থেকে ছাড় দেয়া হয়েছে। যা ভূমি অধিগ্রহনের জন্য ব্যয় হবে।
আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা সমূহের উন্নয়ন এবং নালা, প্রতিরোধ দেয়াল, ব্রীজ ও কালভার্ট নির্মান প্রকল্পে ৭ শত ১৬ কোটি ২৮ লক্ষ টাকার আওতায় ২৩৪টি রোড সংলগ্ন ড্রেইন, ৬৯টি ড্রেইন, ২২টি ব্রীজ, ৪টি কালভার্ট নির্মাণের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
তিনি বলেন, মহেশখালে বাঁধ নির্মাণের ফলে পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ায় গত জুন মাসে তা অপসারণ করা হয়। মহেশখাল, চাক্তাইখাল সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খালে এস্কেভেটর মাধ্যমে মাটি উত্তোলন ও অপসারণ কাজ চলমান রয়েছে। তা ছাড়াও মহেশখাল থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত একটি ড্রাইভারশান খাল খনন বিষয়ে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। যাতে বর্ষনজনিত কারণে সৃষ্ট পানি সহজে বঙ্গোপসাগরে চলে যেতে পারে।
মেয়র বলেন, সিটি গভর্নেন্স প্রকল্পের আওতায় জাইকার অর্থায়নে ১ শত কোটি টাকা ব্যয়ে মহেশখাল, সুরভীখাল, ডাইভারশন খালে খাল সংলগ্ন রাস্তা ও রিটেইনিং ওয়ালের কাজ চলমান রয়েছে এবং প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮টি ব্রীজ নির্মাণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম নগরের আওতায় সংসদ সদস্যদের নির্ধারিত প্রকল্পে ডোমখালের উপর ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রীজ নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। সিটি কর্পোরেশন এবং চীনের সরকারী প্রতিষ্ঠান পাওয়ার চায়নার সাথে জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে ২৭টি স্লুইচ গেইট, বড় খাল সমূহের দু’পাশে রিটেইনিং ওয়াল এবং খাল সমূহের ড্রেজিং এর জন্য ৫ হাজার ৬ শত কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটি পিডিপিপি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন হয়েছে এবং প্রকল্পটি জি টু জি এর মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য ইআরডি-তে প্রেরণ করা হয়েছে। বর্তমানে ডিপিপি প্রস্তুতির কাজ চলছে।
মেয়র বলেন, সাম্প্রতিক বর্ষণে নগরীর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এতে ক্ষতির পরিমান আনুমানিক ৫শত কোটি টাকা। এ সমস্ত রাস্তা চসিকের মালামাল দ্বারা পট-হোল মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে। বৃষ্টির সময় ব্রীক সলিং ও খোয়া দ্বারা মেরামত করা হচ্ছে। অনুকুল আবহাওয়া ফিরে আসলে এ্যাসফল্ট প্ল্যান্ট দ্বারা কার্পেটিং করে দেওয়া হবে।
অতিবর্ষন ও অতি জোয়ারের পানির কারণে নগরীতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় নাগরিক দুর্ভোগের জন্য সংবাদ সম্মেলনে দুঃখ প্রকাশ করেন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সামসুদ্দোহা, প্রধান প্রকৌশলী লেফটেন্যান্টে কর্নেল মহিউদ্দিন আহমদ, কাউন্সিলর নাজমুল হক ডিউক ও হাসান মুরাদ বিপ্লব উপস্থিত ছিলেন।