রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ‘ভাড়াটে’ সংগঠন : হাছান মাহমুদ

| প্রকাশিতঃ ৭ জুলাই ২০১৭ | ২:৩৩ অপরাহ্ন

চট্টগ্রাম: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে (এইচআরডব্লিউ) ‘ভাড়াটে’ সংগঠন বলে আখ্যায়িত করেছেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন ক্ষমতাসীন দলটির মুখপাত্র।

এর আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ২০১৩ সাল থেকে শত শত মানুষকে বেআইনিভাবে আটক করে গোপন স্থানে আটকে রেখেছে বলে গত বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে অভিযোগ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

এ নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হাছান মাহমুদ বলেন, ‘সময়ে সময়ে বেগম খালেদা জিয়া ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যে বিবৃতি দেন সেটা আর হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এখনকার বিবৃতি এক ও অভিন্ন। আসলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ হচ্ছে একটি ভাড়াটে সংগঠন। তারা বিভিন্ন সময়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য, সরকারের কর্মকান্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য বিবৃতি দিয়ে থাকে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সেই প্রতিবেদন আমরা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখান করছি।’

তিনি বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী যেসব যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে রায় হয়েছে, সেই রায় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনটি। এ কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক তারা দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। আদালতের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমাও চেয়েছে সংগঠনটি।’

হাছান মাহমুদ আরও বলেন, ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন। যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমাগত মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর হাজারো মানুষ নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বিচারবর্হিভূত হত্যার শিকার হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে ৮৭ জন মানুষ হত্যা হয়েছে। গুয়েনতানামো বেসহ বিভিন্ন কারাগারে যেভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কখনো এ নিয়ে বিবৃতি দেয়নি। কোন কথা বলেনি। ইসরাইল কর্তৃক নির্বিচারে ফিলিস্তিনি নাগরিক হত্যার কোন প্রতিবাদ করেনি এই তারা।’

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতি হাছান মাহমুদ বলেন, ‘বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক গোষ্টীর পক্ষাবলম্বন না করে নিরপেক্ষভাবে কাজ করুন। আপনারা ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি পক্ষপাতদুষ্ট সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্টিত হয়েছেন। আর বাংলাদেশের গণমাধ্যমের প্রতি আমি অনুরোধ জানাব এই এক পেশে সংগঠনের যে প্রতিবেদন সেটি প্রত্যাখ্যান করুন।’

তিনি বলেন, ‘১৯৮৭ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নির্বাহী পরিচালক আরিয়াহ নাইয়ার তার ডেপুটি হিসেবে কেনেথ রথকে নিযুক্ত করেন। ১৯৯৩ সালে নাইয়ার হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ছেড়ে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী জর্জ সোরসের ওপেন সোসাইটি ইন্সিটিটিউট (ওএসআই) এর প্রধান হিসেবে যোগ দেন। তখন নাইয়ারের স্থলাভিষিক্ত হন রথ। এখন পর্যন্ত রথ সংগঠনটির প্রধান। তার প্রতিষ্ঠিত অন্য সংস্থাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল টাইডস ফাউন্ডেশন, থ্রেশল্ড ফাউন্ডেশন ও মেইলম্যান ফাউন্ডেশন, সোস্যাল ভেঞ্চার নেটওয়ার্ক। এসব সংগঠন থেকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নিয়মিত মোটা অংকের অনুদান পায় এবং যার প্রত্যেকটিই বাংলাদেশের গ্রামীণ পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওপেন সোসাইটি ইন্সিটিটিউট হচ্ছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বড় অর্থ যোগানদানকারী সংস্থা। ২০১১ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে ১০০ মিলিয়ন ডলার অর্থসহায়তা দেয় ওপেন সোসাইটি ইন্সিটিটিউট এর প্রধান আরিয়াহ নাইয়ার। নাইয়ারের স্ত্রী ইভেট নাইয়ার হচ্ছেন ড মুহাম্মদ ইউনূসের গ্রামীণ ফাউন্ডেশনের বোর্ড অব ডিরেক্টরদের একজন। ওপেন সোসাইটি ইন্সিটিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা জর্জ সোরস হচ্ছেন হিউম্যান রাইটস ওয়াটের আমেরিকা এবং ইউরোপ ও মধ্য এশিয়া বিভাগের উপদেষ্ঠা কমিটির সদস্য। সুতরাং বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করতে কারা অর্থ দিচ্ছে ও কারা কথিত তথ্য দিচ্ছে তা এখন পুরোপুরি পরিস্কার।’

হাছান মাহমুদ অভিযোগ করে বলেন, ‘২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে অতিমাত্রায় হত্যা আর সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়েছিল বাংলাদেশে। আওয়ামী লীগের ২১ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয় সে সময়। তখন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেনি। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে ও পরে এবং ২০১৫ সালের প্রথম তিনমাসে বিএনপি-জামাতের হত্যাযজ্ঞ, পুড়িয়ে মারা নিয়েও কিছু বলেনি তারা। অথচ কামারুজ্জামান, নিজামী, সাকা- এদের ফাঁসির বিরুদ্ধে বিবৃতি দেয় এই সংস্থাটি। এমনকি সিলেটের দুর্নীতিবাজ ডা. রাগীব আলীকে মুক্তির জন্যও বিবৃতি দিয়েছে তারা। বিষয়টি আশ্চর্যজনক বটে।’

যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে ভুল মন্তব্য করে ড. কামাল হোসেনের জামাতা ডেবিড বার্গম্যান আদালতে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছিলেন জানিয়ে হাছান মাহমুদ আরও বলেন, ‘বিতর্কিত সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের তথ্যসূত্র নিয়ে বাংলাদেশের কথিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবেদন প্রকাশ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। বার্গম্যান ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সেন্টার ফর কর্পোরেট অ্যাকাউন্টেবিলিটি নামের একটি সংগঠনের প্রধান ছিলেন। সংগঠনটি ২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত প্রায় দুই কোটি টাকা অনুপান পায় সিগ্রিড রেয়্যুসিং ট্রাস্ট থেকে। সিগ্রিড রেয়্যুসিং ট্রাস্ট্রের একজন ট্রাস্ট্রি জশুয়া মেইলম্যান হচ্ছেন গ্রামীণ টেলিকমের সহপ্রতিষ্ঠাতা।’

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের আধ্যপান্ত তুলে ধরে হাছান মাহমুদ বলেন, ‘১৯৭৮ সালে রবার্ট বারনেস্টাইনের নেতৃত্বে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রতিষ্ঠা হয়। এর আগে হেলসিংকি ওয়াচ নাম নিয়ে এই সংগঠনের কাজ শুরু হয় ১৯৭৫ সালে। এই সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ব্লকের কর্মকান্ড হেলসিংকি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগঠনটিতে নৈতিক অবক্ষয় দেখা দেয়।’

হাছান মাহমুদ বলেন, ‘প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান রবার্ট বারনেস্টাইন থেকে শুরু করে টাইম ম্যাগাজিসসহ উল্লেখযোগ্য প্রায় সব মিডিয়াই একমত হয় যে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠির বা দলের মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করার কারণে নিরপেক্ষতা হারিয়েছে। কোন দেশের সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ততাবিহীনভাবে কাজ করার নীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও সৌদি সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিপুল অংকের অনুদান নেয়ার অভিযোগ উঠে তাদের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে তারা। এমনকি তাদেরই প্রাক্তন প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট বারনেস্টইন এর সমালোচনা করেন।’

আওয়ামী লীগের মুখপাত্র আরও বলেন, ‘সৌদি অনুদান নেয়ার পর কাকতালীয়ভাবে মুসলিমপ্রধান দেশের, বিশেষ করে ইসলামিক সংগঠনগুলোর কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে হিউম্যান রাইটন ওয়াচের। সংস্থাটির প্রধান কেনেথ রথের কাছে নানান দেশ থেকে খোলা চিঠিও দেওয়া হয়েছে, কেন তারা সাম্প্রদায়িক গোষ্টির পক্ষে কথা বলছেন।’

ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘ইসলামের নামে মিশরে নারীদের স্বাধীন চলাফেরায় ব্রাদারহুড যে বাধা দিয়েছিল তার পক্ষেই সাফাই গেয়েছিলেন কেনেথ রথ। সাম্প্রতিককালে নানান প্রশ্নবিদ্ধ মানুষকে উপদেষ্ঠা বোর্ডে নিয়োগ দিয়ে যথেষ্ট সমালোচিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে সংস্থাটি। আমেরিকান সেনাবাহিনীর প্রাক্তন সদস্য ও প্রকাশ্যে নাৎসি সমর্থক গার্লেস্কোকে নিয়োগ নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে তাকে বরখাস্ত করে সংস্থাটি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইরাকের রাসায়নিক অস্ত্র ও নার্ভ গ্যাস ব্যবহারের প্রমাণ আছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রকারান্তরে বুশের ইরাক আক্রমণের পক্ষে রায় দিয়েছিল। তাদের দেওয়া সেই প্রতিবেদনটি পরবর্তীতে শতভাগ মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়। তাদের মিথ্যা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শুরু হওয়া ইরাক যুদ্ধের ৬ লাখ অকারণ মৃত্যুর দায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কখনও স্বীকার করেনি।’

সচেতন স্বেচ্ছাসেবকরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিতর্কিত কর্মকান্ড উইকিপিডিয়াতে ‘ক্রিটিসিজম অব হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ লিখে রেখেছেন এবং নিয়মিত সেটা হালনাগাদ করা হচ্ছে বলেও তথ্য দেন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ।

সুন্দরবনের কাছে রামপালে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে জাতিসংঘ সংস্থা ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটি তাদের আগের আপত্তি তুলে নিয়েছে জানিয়ে হাছান মাহমুদ বলেন, ‘বিদ্যুৎ কেন্দ্র যেখানে হচ্ছে সেটা সুন্দরবনের প্রান্তসীমার চেয়ে ১৪ কিলোমিটার দূরে এবং বনের বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে। এই সমস্ত তথ্য-উপাত্ত ইউনেস্কোর সামনে উপস্থাপন করার পর তারা আপত্তি তুলে নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত যে সঠিক ছিল তা প্রমাণিত হয়েছে। শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির বিপক্ষে প্রচারণা চালানো হয়েছিল।’

সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল আলম চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক এম এ সালাম, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।