এম কে মনির : খননযন্ত্র ব্যবহার করে বঙ্গোপসাগরের সন্দ্বীপ চ্যানেল থেকে অবৈধভাবে তিন লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অভিযোগ পেয়ে তদন্তে নামে পরিবেশ অধিদপ্তর। আর এ তদন্তে উঠে এসেছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুইজন ইউপি চেয়ারম্যানের নাম। এরা হলেন, সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত আলী জাহাঙ্গীর ও বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছাদাকাত উল্লাহ মিয়াজী।
শওকত আলী জাহাঙ্গীর বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের মধ্যম বাঁশবাড়িয়া এলাকার হাসান উকিলের বাড়ির জাফর আহমদের ছেলে। তিনি পরপর দুইবার ক্ষমতাসীন দল থেকে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।
অন্যদিকে ছাদাকাত উল্লাহ মিয়াজী বাড়বকুণ্ডের মিয়াজী পাড়ার মিয়াজী বাড়ির মৃত মৌলভী আবুল খায়েরের ছেলে। তিনিও পরপর তিনবার আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হয়েছেন। আছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদেও।
এ দুইজনের বিরুদ্ধে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, কেওড়া বন, পর্যটন শিল্পকে ভয়াবহ হুমকিতে ফেলে সমুদ্রের তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তাদের বিরুদ্ধে পরিবেশ আইনে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশও করা হয়েছে।
এ বিষয়ে পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরি করে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালকের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন জেলার কর্মকর্তারা। যেখানে বলা হয়েছে, একজন শিপইয়ার্ড মালিকসহ উপরোক্ত দুই চেয়ারম্যান ৩ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করেছেন।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলা অফিস সূত্রে জানা যায়, সীতাকুণ্ডের সমুদ্র উপকূল থেকে অবৈধভাবে দিনরাত বালু উত্তোলন করার অভিযোগ পেয়ে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের সমুদ্র উপকূল পরিদর্শন করেন এ কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। ওইসময় বাড়বকুণ্ডের বেড়িবাঁধের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা ক্যাপিটাল পেট্রোলিয়াম, ইউরো গ্যাস, ইউনি গ্যাস, জেএমআইসহ বেশ কয়েকটি এলপিজি কোম্পানির বিরুদ্ধে সাগর থেকে পাইপ বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সত্যতা পাওয়া যায়।
একইসাথে বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত একটি স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের নামও উঠে আসে পরিদর্শনে। পরবর্তীতে জানা যায়, বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নে সমুদ্র উপকূল থেকে বালু উত্তোলনে জড়িত আছেন খোদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছাদাকাত উল্লাহ মিয়াজী। যিনি স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ভাড়া দিচ্ছেন বালু উত্তোলনের কাজে নিয়োজিত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি।
একইভাবে গত ৪ জানুয়ারি বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের আকিলপুর সমুদ্র সৈকত এলাকা থেকে মাদার স্টীল শিপইয়ার্ড ও মিডল্যান্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান মাস্টার আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে সাগরের বালু উত্তোলনের অভিযোগ পেয়ে সরেজমিনে তদন্ত করেন পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলার কর্মকর্তারা।
উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের আকিলপুর ও কুমিরা ঘাটঘর এলাকা পরিদর্শন করে কর্মকর্তারা দেখতে পান সেখানে সাগরের তলদেশ থেকে বেশ কয়েকটি খননযন্ত্র দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। অর্ধ শতাধিক শ্রমিক বালু উত্তোলন, বালুর পাইপ মেরামত, স্কেভেটর দিয়ে স্তূপ করা, ট্রাকে করে বালু অন্যত্র সরবরাহ এবং উত্তোলিত বালু দিয়ে সমুদ্র পাড় সংলগ্ন পুকুর, কৃষি জমি ভরাটের কাজ করা হচ্ছে।
পরবর্তীতে জানা যায়, বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত আলী জাহাঙ্গীর অবৈধভাবে সাগর থেকে বালু উত্তোলনের সাথে পুরোপুরি সম্পৃক্ত। তার মালিকানাধীন বেশ কিছু ড্রেজার মেশিন ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ দিয়েই সমুদ্র উপকূল থেকে অবাধে বালু তোলা হচ্ছে।
পরিদর্শনের দিন বালু উত্তোলনে জড়িত এক যুবক পরিদর্শক দলের কর্মকর্তা মো. আশরাফ উদ্দিনকে চট্টগ্রাম বন্দরের সূত্র দিয়ে উল্লেখ করা পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি একটি অনাপত্তিপত্রের কপি প্রদর্শন করেন। পরে পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আশরাফ উদ্দিন সেটিকে ভুয়া প্রমাণিত করলে ওই যুবক সটকে পড়েন।
পরে দুই ইউপি চেয়ারম্যান ও মাদার স্টীল শীপ ইয়ার্ডের মালিক মাস্টার আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালকের কাছে।
জানা যায়, সীতাকুণ্ডের সন্দ্বীপ চ্যানেলটিকে বালু উত্তোলনের বৈধ অঞ্চল বা বালু মহাল ঘোষণা করা হয়নি। ড্রেজিং কার্যক্রম বা বালু উত্তোলনে অনুমোদন নেই জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট কোন সংস্থার। তবুও এখানে বালু উত্তোলন থেমে নেই। রাতদিন অবৈধভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যাক খননযন্ত্র ব্যবহার করে সাগরের তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করছে একটি চক্র। স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতায় দিনদিন আগ্রাসী এসব কর্মকাণ্ড বেড়েছে। কখনোই তাদের লাগাম টানা যায়নি। যদিও গত দুই বছরে সীতাকুণ্ডে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অন্তত চার বার পরিদর্শন করেছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত আলী জাহাঙ্গীর একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার ভাইয়ের প্রতিষ্ঠান বালু উত্তোলনের কাজ করছে। যতটুকু জানি তারা অনুমতি নিয়েই বালু উত্তোলন করছে। আমি সেগুলো দেখেছি। ঠিক না থাকলে তো অনুমতি দিতাম না।’ একসময় তিনি স্বীকার করে নেন, বালু উত্তোলনে কাজে নিয়োজিত ড্রেজার মেশিন ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ তার ভাইয়ের এবং তার বিষয়গুলো তিনিও দেখভাল করেন।
এই সময় তিনি এ প্রতিবেদককে নিজের ভাইয়ের পক্ষে নানা যুক্তি দেন এবং অনুমোদনের কাগজপত্র হোয়াটসঅ্যাপে প্রতিবেদককে পাঠাবেন বলে জানান। যদিও পরবর্তীতে তিনি কোন ডকুমেন্টস সরবরাহ করেননি। পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে অনাপত্তিপত্র তৈরির বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জানতে চাইলে বালু উত্তোলনের অভিযোগ অস্বীকার করে বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছাদাকাত উল্লাহ মিয়াজী বলেন, ‘আমি বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত নই। তবে পরিবেশ অধিদপ্তর আমাকে চিঠি দিয়েছে। সেটি হাতেও পেয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাড়বকুণ্ডে বালু উত্তোলন হয় না। পাশের ইউনিয়ন বাঁশবাড়িয়া ও কুমিরায় হয়। সেখানে পুরো সাগর থেকে বালু উত্তোলন করা হয়। বাঁশবাড়িয়ার চেয়ারম্যান আমাকে মুঠোফোনে জানিয়েছেন তিনি বালুর বোট ভাড়া দিয়েছেন। কিন্তু বালু উত্তোলন কারা করছে সেটি তিনি জানেন না। বাঁশবাড়িয়া ও বাড়বকুণ্ড একেবারে পাশাপাশি হওয়াতে বাড়বকুণ্ডের নাম পড়ে যায়। আসলে আমি এসব ব্যবসায় জড়িত নাই। আমার এসব করার সময়ও নাই। আমি অসুস্থ ছিলাম দীর্ঘ দিন। ওমরা করে এসেছি। তবে আমাদের এলাকার ছেলেরা বালু উত্তোলন করে। একসময় বছর দুয়েক আগে বাড়বকুণ্ডে অনেক বালু উত্তোলন হয়েছে। আপাতত বন্ধ আছে।’
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক মো. আশরাফ উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ইউপি চেয়ারম্যান শওকত আলী জাহাঙ্গীর ও ছাদাকাত উল্লাহ মিয়াজী এবং মাদার স্টীল শিপইয়ার্ডের মালিক মাস্টার আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে সীতাকুণ্ডের সমুদ্র উপকূল থেকে অবৈধভাবে ৩ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের প্রমাণ মিলেছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অঞ্চল কার্যালয়ের পরিচালকের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ফেরদৌস আনোয়ার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে সমুদ্রের বালু উত্তোলনের ফলে ওই এলাকার বেড়িবাঁধ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এলাকার ভূ-প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। একইসাথে গুলিয়াখালী, বাঁশবাড়িয়া ও আকিলপুর সমুদ্র সৈকতের পর্যটন শিল্প মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে। সেখানে কৃষি জমি ও পুকুর ভরাট করা হচ্ছে। যা দীর্ঘ দিনের জন্য পরিবেশে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।’