রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

চবিতে ছাত্র হতে লাগে ৮ পয়েন্ট, শিক্ষক হতে ৭!

| প্রকাশিতঃ ৯ মার্চ ২০২৩ | ১০:১৬ পূর্বাহ্ন


আবছার রাফি : সম্প্রতি পাঁচ বিভাগ ও দুই অনুষদে সহকারী, সহযোগী ও প্রভাষক পদে স্থায়ী-অস্থায়ী মোট ২১ জন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি)। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়— আলোচ্য ৩ পদে শিক্ষক নিয়োগের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ‘যোগ্যতা’ হিসেবে এসএসসি ও এইচএসসিতে ন্যূনতম জিপিএ ৭ চাওয়া হয়েছে।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ম্যানেজমেন্ট ছাড়া বাকি ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদ, কলা ও মানবিদ্যা অনুষদ, বাংলা ও ইংরেজি বিভাগে ন্যূনতম জিপিএ ৭.০০ আর কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ন্যূনতম জিপিএ ৬.০০ চাওয়া হয়েছে। আবার ডিভিশন পদ্ধতিতে পাশ করা চাকরিপ্রার্থীদের এসএসসি ও এইচএসসিতে থাকতে হবে প্রথম বিভাগ ও অনার্স-মাস্টার্সে দ্বিতীয় শ্রেণি।

অপরদিকে চবিতে শিক্ষার্থী ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়— চলমান শিক্ষাবর্ষের যে-কোনো ইউনিটে ভর্তির আবেদনের জন্য প্রার্থীর এসএসসি ও এইচএসসিতে ন্যূনতম জিপিএ ৮.০০ অথবা ৭.৫০ থাকতে হবে। এভাবে ন্যূনতম যোগ্যতায় শিক্ষক নিয়োগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ‘নিয়োগ বাণিজ্য’র মতো অপ্রীতিকর ঘটনাগুলোর লাগাম টানা যাচ্ছে না বলে অভিমত শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের।

তাদের মতে, গুণগত শিক্ষার জন্য যে উপাদানটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে মানসম্পন্ন শিক্ষক। শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য ভালো শিক্ষাগত যোগ্যতার অধিকারী মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে।

প্রকাশিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে অন্যান্য বিভাগের পাশাপাশি বাংলা বিভাগেও একজন স্থায়ী সহকারী অধ্যাপক, একজন স্থায়ী প্রভাষক ও পাঁচজন অস্থায়ী প্রভাষক নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। শিক্ষকদের অভিযোগ— বর্তমানে বাংলা বিভাগে ১৭ জন শিক্ষক রয়েছেন। এ বিভাগে পর্যাপ্ত শিক্ষক আছে, আর শিক্ষকের প্রয়োজন নেই। বিভাগ থেকে শিক্ষক চাওয়া না হলেও নতুন করে শিক্ষকের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা বিশ্ববিদ্যালয় আইন পরিপন্থী।

জানা গেছে, চবির বাংলা বিভাগ বারবার ন্যূনতম যোগ্যতায় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিরোধীতা করে আসছে। এবং যোগ্যতা নির্ধারণে ইউজিসির সমস্ত শর্ত সম্পন্ন করে প্ল্যানিং কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নতুন নীতিমালাও তৈরি করেছে। যা কলা অনুষদের ডিন অফিস ও অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলেও পাশ হয়।

কিন্তু বাংলা বিভাগের একাধিক শিক্ষকের অভিযোগ, একজন শিক্ষক তার হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতেই কর্তৃপক্ষের সাথে যোগসাজসে পূর্বের ‘ন্যূনতম যোগ্যতায়’ শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালা বলবৎ রাখার অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রকাশিত ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আরও দেখা গেছে, বাংলা বিভাগের শিক্ষক নিয়োগে অনার্স-মাস্টার্সে ন্যূনতম সিজিপিএ চাওয়া হয়েছে ৩.৩০। যা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) নীতিমালা ২০২১-এর পরিপন্থী।

ইউজিসির নীতিমালায় উল্লেখ আছে, মানবিক অনুষদভুক্ত বিভাগসমূহের ক্ষেত্রে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় পরীক্ষায় সিজিপিএ-৪ এর মধ্যে যে-কোনো একটিতে সিজিপিএ ন্যূনতম ৩.৫০, অন্যটিতে ৩.২৫ থাকতে হবে।

অভিযোগ উঠেছে, প্ল্যানিং কমিটির সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নিয়মবহির্ভূতভাবে এ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। একাধিক শিক্ষকের অভিযোগ, প্ল্যানিং কমিটির সুপারিশ ছাড়া বাংলা বিভাগে সদ্য প্রমোশন পাওয়া একজন অধ্যাপকের কারসাজিতে এ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তারা আরও জানান, এ শিক্ষকের বিরুদ্ধে খাতার বান্ডিল না খুলেই আন্দাজে-ভৌতিক নাম্বার দেওয়ার অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে। এজন্য তাকে শোকজও করা হয়েছিল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান তসলিমা বেগম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘প্ল্যানিং কমিটির মিটিং হয়নি। শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হচ্ছে না। আগে তো আমরা চাইব, তারপর প্ল্যানিং হবে, তারপর শিক্ষক নিয়োগ দেবে, এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তো যেতে হয়। এ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অবশ্যই নিয়মবহির্ভূত। আমাদের বাংলা ডিপার্টমেন্টে ১৭ জন শিক্ষক আছেন। তাতে আমাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আর কোনো শিক্ষকেরও প্রয়োজন নেই, এটা আমরা জানিয়েছিলাম কর্তৃপক্ষকে। এখন যে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে তা আমরা অফিসিয়ালি জানিও না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার আগের চেয়ারম্যান শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন, এটা আমি মৌখিকভাবে জানি। তবে কাগজপত্র না দেখে এ মুহূর্তে বলতে পারবো না। আমি দায়িত্ব নিয়েছি একবছরও হয়নি। তার আগেই চেয়েছিলেন।’

অন্যদিকে পরিকল্পনা কমিটিকে উপেক্ষা করে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগেও দুজন স্থায়ী প্রভাষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করায় ৮ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) উপাচার্য ড. শিরীণ আকতার বরাবর চিঠি দিয়েছেন এ বিভাগের চার শিক্ষক। তারা হলেন অধ্যাপক ড. মো. আছিয়র রহমান, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সানাউল্লাহ চৌধুরী, অধ্যাপক ড. রাশেদ মোস্তফা ও সহকারী অধ্যাপক এ এইচ এম সাজেদুল হক।

শিক্ষকরা জানান, ২৩ জানুয়ারি প্রকাশিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে সিএসই বিভাগের স্থায়ী প্রভাষক পদে দুজন নতুন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। বর্তমানে বিভাগে ১৯ জন শিক্ষক কর্মরত এবং ২ জন ছুটিতে আছেন। বিভাগের সব শিক্ষক আন্ডারলোডে থাকায় বিভাগীয় পরিকল্পনা কমিটির সভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়। তা সত্ত্বেও নতুন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বিশ্ববিদ্যালয় আইনের পরিপন্থি।

এ বিষয়ে কথা বলতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতারকে দু’দিন ধরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। যোগাগোগ করা হলে চবির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার কে এম নুর আহমেদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আইনমতে যা হয় তা হবে। আমাকে বিষয়টা আগে জানতে হবে। আমি তো সব বিষয়ে জানবো না। এগুলোর জন্য আলাদা সেকশন আছে। তারা ডিল করে।’

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য প্রফেসর ড. দিল আফরোজা বেগম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বিষয়টা আমি জানি। এটা অবশ্যই নিয়মতান্ত্রিকভাবে হয়নি। কারণ হচ্ছে প্ল্যানিং কমিটির রিকুইজিশন থাকতে হবে। আমাদের কমিশন লোড ক্যালকুলেশন নীতিমালা পাস করেছে। তা সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে দেয়া হয়েছে। এই লোড ক্যালকুলেশনের আলোকে দেখতে হবে ওই ডিপার্টমেন্টে কোনো শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা। যদি প্রয়োজনীয়তা থাকে তখন প্ল্যানিং কমিটি রিকুইজিশন দিতে পারে। প্ল্যানিং কমিটিকেও আইনের ভিত্তিতে রিকুইজিশন দিতে হবে। আমি কানাডা থেকে ভিসি মহোদয়ের সাথে কথা বলেছি। এটা ঠিক করতে বলেছি। বলেছি, নিয়ম মোতাবেক বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে। আর না দিলে ঈদের পর চট্টগ্রামে গিয়ে সবার বক্তব্য নিয়ে ব্যবস্থা নেব।’