
এম কে মনির : এক সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলি নিয়ে ব্যাপক তদবির ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ ছিল। কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগের প্রমাণও মিলেছিল। পরে অনিয়ম-দুর্নীতি ঠেকাতে শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম ‘অ্যানালগ’ থেকে ‘ডিজিটাল’ করার উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে এবার ডিজিটাল পদ্ধতির বদলিতেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে চট্টগ্রামে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, সমন্বিত অনলাইন বদলি নির্দেশিকা লঙ্ঘন করে একজন সহকারী শিক্ষিকাকে বদলির আদেশ দিয়েছেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ রেজওয়ান হায়াত। অথচ হাছিনা আকতার নামের ওই সহকারী শিক্ষিকার বদলি আবেদন নানা ত্রুটির কারণে অনেক আগেই থানা শিক্ষা অফিসার বাতিল করে দিয়েছিলেন।
এই অনিয়মের ঘটনায় শিক্ষকদের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের প্রশ্ন, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে সমন্বিত বদলি নীতিমালা লঙ্ঘন করে সারাদেশে এভাবে কতজনকে বদলি করা হয়েছে বা হচ্ছে? বদলি নীতিমালা যদি মহাপরিচালক নিজেই লঙ্ঘন করেন তাহলে সেটি মানবে কে?
নিয়মানুযায়ী প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত অনলাইন শিক্ষক বদলি নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষক-শিক্ষিকা চাকরির আগে অথবা পরে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে স্বামী-স্ত্রীর স্থায়ী ঠিকানায় বদলি হতে চাইলে তাদের আবেদনের ভিত্তিতে শুন্য পদ থাকলে বদলি করা যাবে। এ ধরণের বদলির ক্ষেত্রে স্থায়ী ঠিকানার পক্ষে বিয়ের কাবিননামা, প্রত্যয়ণপত্র, সংশ্লিষ্ট পৌর মেয়র, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান অথবা ওয়ার্ড কাউন্সিলরের প্রত্যয়নপত্র, স্থায়ী ঠিকানার জমির দলিল, খতিয়ান, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা প্রদর্শন করতে হবে। আর এসব কিছু প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ঢুকে সম্পন্ন করতে হবে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, কেবল আন্তঃবিভাগ ও প্রশাসনিক অপরিহার্যতার ক্ষেত্রে বদলির কর্তৃপক্ষ হবেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। তবে চট্টগ্রামে আন্ত উপজেলা-থানা পর্যায়ে সহকারী শিক্ষিকা হাছিনা আকতারের ক্ষেত্রে এসব নীতিমালার কোনোটিই মানা হয়নি। খোদ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নীতিমালা লঙ্ঘন করে থানা পর্যায়ে এই সহকারী শিক্ষিকার বদলি আদেশ দিয়েছেন। অথচ হাছিনা আকতারের বদলি আবেদনে নানা ত্রুটি থাকায় বন্দর থানা শিক্ষা অফিসার সেটি বাতিল করে দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, হাছিনা আকতারকে তড়িঘড়ি করে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। কিন্তু একই থানায় অন্যান্য শিক্ষকদের এখনও ছাড়পত্র দেয়া হয়নি। হাছিনা আকতার ইতিমধ্যেই গত রোববার পছন্দের বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে যোগদানও করে ফেলেছেন।
জানা যায়, ২০১৯ সালে বাঁশখালী উপজেলা থেকে নগরীর নিশ্চিন্তাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা পদে বদলি হন হাছিনা আকতার। গত ৩ মার্চ অনলাইনে বদলি আবেদন শুরু হলে তিনি তার স্বামীর কর্মস্থল কোতোয়ালী এলাকা জানিয়ে সেখানের ফিরিঙ্গিবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হতে আবেদন করেন৷ আবেদনে একটি মাত্র প্রত্যয়ন যুক্ত করেন তিনি। যেখানে বলা হয়েছে, হাছিনা আকতারের স্বামী চসিকের একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। কিন্তু চসিকের কোন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন সেটি উল্লেখ করা হয়নি।
অপরদিকে নীতিনালা অনুযায়ী, যেসব কাগজপত্র জমা দেয়ার কথা সেগুলোর ঘাটতি রয়েছে হাছিনা আকতারের। এমনকি বিয়ের কাবিননামাও যুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি৷ এসব ত্রুটির কারণে তার বদলি আবেদনটি বন্দর থানা শিক্ষা অফিসার সেলিনা আখতার বাতিল করে দেন। সেই হিসেবে তিনি বদলি হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছেন এবং নিশ্চিন্তাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই বহাল থাকার কথা।
কিন্তু গত ৯ মার্চ রাত বারোটার পর অনলাইন সার্ভারে হাছিনা আকতারের পছন্দের বিদ্যালয় ফিরিঙ্গিবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করার তথ্য হালনাগাদ করা হয়। একই রাতে (৯ মার্চ) ফিরিঙ্গিবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হতে ইচ্ছুক নগরীর পাঁচলাইশ ওয়াজেদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষিকার আবেদন বাতিল করা হয়। রাত এগারোটা ৫০ মিনিটে ওই শিক্ষিকার মুঠোফোনে ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়ে জানানো হয় তার আবেদনটি বাতিল করা হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, বদলি আবেদন বাতিল হলেও উপর মহলকে ম্যানেজ করে হাছিনা আকতার তার পছন্দের বিদ্যালয়ে বদলির আদেশ নিয়েছেন। যদিও তার স্বামীর কর্মস্থল ওই এলাকায় নয়। কেবল পারিবারিক সুবিধা ভোগ করতে তিনি সেখানে বদলি হয়েছেন।
ওয়াজেদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওই সহকারী শিক্ষিকা বলেন, আমার আবেদনটি থানা শিক্ষা অফিসার অনুমোদন দিয়েছিলেন। কিন্তু ৯ মার্চ রাতে আমার আবেদনটি বাতিল করা হয়। অথচ একই জায়গায় আরেকজনকে বদলি করা হয়েছে। যার আবেদন ভুলে ভরা, ত্রুটিপূর্ণ।
জানতে চাইলে বন্দর থানা শিক্ষা অফিসার সেলিনা আখতার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সম্ভবত স্বামীর কর্মস্থল বা নিজ ঠিকানায় বদলি হওয়ার জন্য তিনি (হাছিনা) বদলির আবেদন করেছিলেন। তবে তার কাগজপত্রের স্বল্পতা ছিল। আবেদনের বিপরীতে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস দেখাতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। তাই আমি তার আবেদনটি বাতিল করে দিয়েছিলাম।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যতটুকু দেখলাম ডিজি (মহাপরিচালক) স্যারের আদেশে তাকে সেখানে বদলি করা হয়েছে। এ বিষয়ে আমার কোনো মতামত নেয়া হয়নি কিংবা মতামত নিতে হয় কিনা আমি তাও জানি না। আমি শুধু এটুকু দেখেছি ডিজি স্যারের আদেশেই তাকে বদলি করা হয়েছে। কীসের ভিত্তিতে করা হয়েছে তা বলতে পারছি না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা অফিসের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘হাছিনা কীভাবে পছন্দের বিদ্যালয়ে বদলি হয়েছেন তা আমাদের জানা নেই। তবে এতে আমরা হতবাক, হতভম্ব হয়েছি। স্বজনপ্রীতি কিংবা অবৈধ লেনদেন না হলে এটা কিছুতেই সম্ভব নয়। ডিজিটাল বদলি ব্যবস্থায়ও আগের মতো সেই অ্যানালগ অনিয়ম হয়েছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘বড় কর্তারা কোনো নীতিমালার তোয়াক্কা করেন না। ওনারা নিয়মকে অনিয়ম আর অনিয়মকে নিয়ম বানান। যত আইন সব ছোটদের জন্য। তাছাড়া এটা তো বাংলাদেশ। জাপান নয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে এসব হরহামেশা ঘটছে। নিয়ম-নীতির বালাই নেই।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. শহীদুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে জানি না। কারও পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা প্রতিকারের জন্য ব্যবস্থা নিব। কে কি কারণে বদলি হয়েছেন কিংবা কোথা থেকে বদলি হয়েছেন তা আমার জানা নেই। কাগজপত্র না দেখে বলতে পারছি না।’
এ বিষয়ে সহকারী শিক্ষিকা হাছিনা আকতারের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তার আগের কর্মস্থল নিশ্চিন্তাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা শুভ্রা রাণী দে’কে মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি এ প্রতিবেদককে হাছিনা আকতারের মুঠোফোন নম্বরটি দেয়ার আশ্বাস দেন। কিন্তু পরবর্তীতে বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও মুঠোফোন নম্বর না পাঠালে পুনরায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে শুভ্রা রাণী দে এ প্রতিবেদককে বলেন, আপনার নম্বরটি হাছিনা আকতারকে দেয়া হয়েছে। তিনি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন বলেছেন। যদিও হাছিনা আকতার এ প্রতিবেদককে তার বক্তব্য জানাননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ রেজওয়ান হায়াত একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘৪ লাখ শিক্ষক ও দেড় লাখ স্টাফের ডাটা আমার কাছে আছে। আমি আলাদা করে কোনো ব্যক্তির সম্পর্কে জানতে পারবো না। এটি সবচেয়ে ভালো বলতে পারবে ডিপিও। কেননা তার আবেদনে ডকুমেন্টস শর্ট থাকলে থানা শিক্ষা অফিসার সেটি করে দিয়েছেন হয়তো। কিন্তু সেটি ডিপিও বরাবর দাখিল করেছেন। কী কারণে কে কোথায় বদলি হয়েছেন তা আমি আলাদা করে বলতে পারব না।’
থানা শিক্ষা অফিসার আবেদন বাতিল করে দেয়ার পরও বদলি হতে পারেন কিনা এমন প্রশ্নে মহাপরিচালক বলেন, ‘প্রশাসনিক কারণে হতে পারেন।’ যদিও প্রশাসনিক কারণ বলতে আচরণবিধি লঙ্ঘন ও শৃঙ্খলাভঙ্গ অথবা জনস্বার্থ কিংবা প্রশাসনিক অপরিহার্যতাকে বুঝায়। এখন হাছিনা আকতারের ক্ষেত্রে কী হয়েছে তা স্পষ্ট নয়!