
মাওলানা শামছুল ইসলাম হাকেমী : দীর্ঘ একমাস নফসের সাথে যুদ্ধ করে রোজাদাররা নফসানিয়াতের যে সাফল্য অর্জন করে সে জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্তের প্রতি অশেষ শুকরিয়া আদায়, আনন্দ উৎসবই হচ্ছে ঈদুল ফিতর। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক জাতিরই আনন্দ-উৎসব রয়েছে। আমাদের আনন্দ উৎসব হচ্ছে ঈদ।’ দুনিয়ার মুসলিম উম্মাহের নিকট ঈদুল ফিতর এক আনন্দঘন অনুষ্ঠান। ঈদ দুনিয়াতে জান্নাতি সুখের বাস্তব নমুনা।
ঈদের দিনে ঈদগাহে উপস্থিত হয়ে নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়ে ঈদের আনন্দ শুরু হয়। নামাজ সবচেয়ে বড় ইবাদত মুসলমানদের। সে নামাজ দিয়ে ঈদুল ফিতরের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এর পিছনে রয়েছে ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার মানুষের ত্যাগ, তিতীক্ষা এবং নিবেদিত প্রাণের আকুতি।
রোজাদার মুসলমানরা যখন ঈদের দিনে নামাজ পড়ার জন্য ঈদগাহে বা মসজিদে আসতে শুরু করেন তখন আল্লাহতায়ালা ফেরেশতাদের ডেকে ডেকে বলেন, দেখো ফেরেশতারা! মানুষ সৃষ্টি করার সময় তোমরা বলেছিলে যে, তারা পৃথিবীতে ফেতনা, ফ্যাসাদ ও খুন খারাবিতে লিপ্ত থাকবে। আর এখন দেখো, কীভাবে আমার আনুগত্যের নিদর্শনস্বরূপ তারা আমার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
আল্লাহ আরও বলবেন, হে ফেরেশতারা তোমরা তাদের অভ্যর্থনা জানাও এবং বলে দাও, আমি আল্লাহ্ তাদের গোনাহ্ সমূহ ক্ষমা করে দিয়েছি। আল্লাহ্ তায়ালার তরফ থেকে রোজাদার মুসলমানদের মধ্যে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সনদ বিতরণের দিনই হলো ঈদুল ফিতর। তাই রমজানের রোজার শেষে ঈদুল ফিতর হলো রোজাদারদের পুরস্কারের দিন।
আল্লাহ বলেন, রোজা আমার জন্য, আমি নিজেই এর পুরস্কার প্রদান করবো। মহাপবিত্র ও মহাবরকতময় রমজান মাসে দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে যাবতীয় পানাহার ও কামাচার থেকে কঠোর সতর্কতা সহকারে বিরত থেকে শাওয়ালের পহেলা তারিখে এসে রোজাদাররা আবার প্রচলিত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।
আনন্দ হিল্লোল নিয়ে আসে পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদুল ফিতর প্রচলিত হয় রমজানে আত্মশুদ্ধির ও স্পর্শমণ্ডিত বহুবিধ কল্যাণ আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে রোজার মাসে মুসলমানরা আত্মনিয়ন্ত্রণ, পরিশীলন ও পরিশুদ্ধ করার জন্য যে সিয়াম সাধনা করেন তার পুরস্কার হিসেবে আল্লাহ্ তায়ালার পক্ষ থেকে ঈদুল ফিতরের আগমন ঘটে। ঈদুল ফিতর সবার কাছে চির নতুন সমুজ্জ্বল একটি দিন।
ইসলাম মুসলমানদের জন্য উত্তম বিধান দিয়েছে। ঈদের আনন্দ কারও একার নয় বরং পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী গরীব-দুঃখী সবার মধ্যেই এ আনন্দের সেতুবন্ধন হলো ঈদুল ফিতর, গরীব-দুঃখীদের ঈদের ব্যবস্থা না করে ধনীদের ঈদগাহে যাওয়ার অনুমতি ইসলাম দেয়নি। ঈদের খুশি সবাই ভাগাভাগি করে নিতেই ঈদুল ফিতর আমাদের মাঝে বয়ে এনেছে সেই সাম্যের সুন্দরতম ব্যবস্থা।
ঈদুল ফিতরের সকাল আসে মানুষে-মানুষে সমতার এক আনন্দ উজ্জীবিত চেতনায় অনুপ্রেরণার পসরা নিয়ে। বঞ্চিত, অভাবি, দরিদ্রদের মধ্যে সচ্ছল ও বিত্তশালীদেরও নির্দিষ্ট হারে ঈদের প্রত্যুষে ফিতরা দেয়া ওয়াজিব। ফিতরা মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধকে জাগ্রত ও সুসংহত করে এবং সিয়ামের বুনিয়াতকে মজবুত করে। ফলে মানুষের মধ্যে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের এক অনাবিল আনন্দ প্রজ্জ্বলিত হয়।
ঈদুল ফিতর বিশ্ব মুসলিমের সাম্য ও সমতার উদ্দীপনাকে উজ্জীবিত করে। দুনিয়ার সকল মুসলমান একই আনন্দে এবং একই অনুভূতিতে সার্বজনীন ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠে ঈদুল ফিতর। ঈদুল ফিতর মানুষের হৃদয় মনকে পরিচ্ছন্নতার আলোকে বিকশিত করে তোলে। সকল বিবাদ-বিভেদ, অশান্তি, বৈষম্য, জুলুম অনাচার, অশ্লীলতা দূর করে এক পরিশীলিত জীবন চেতনা সঞ্চালিত হয় ঈদুল ফিতরে।
এ ঈদ প্রাচুর্যের ও বরকতের। অবশ্য মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয় তাকওয়ার মাপকাঠিতে। তাকওয়া অর্থ আল্লাহ্ ভীতি। তাকওয়ার জীবন হচ্ছে আত্মসংযমী ও সাবধানী জীবন, পাপ বর্জিত শুদ্ধ জীবন। সুদীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ প্রতিটি মুসলমানদের ঘরে নিয়ে আসে আনন্দের সওগাত। ঈদ এমন এক নির্মল ও অনাবিল আনন্দের আয়োজন, যেখানে মানুষ আত্মশুদ্ধির আনন্দে পরস্পরের মেলবন্ধনে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং আনন্দ সমভাগাভাগি করে।
মাহে রমজানের রোজার মাধ্যমে নিজেদের অতীত জীবনের পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হওয়ার অনুভূতি ধারণ করেই পরিপূর্ণতা লাভ করে ঈদের খুশি। ঈদ সকল বৈষম্যের স্তর ভেঙে চুরমার করে দেয়। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ দূর করার জন্যই সব মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে এক সুদৃঢ় মানববন্ধন তৈরি করে দেয় ঈদুল ফিতর।
ঈদের দিনে বিশ্বজগতের রব আল্লাহ্ তায়ালার শ্রেষ্ঠত্ব ও বিরাটত্বের ঘোষণা বারবার উচ্চারিত হয়, আল্লাহ্ আকবর তাকবীরের মাধ্যমে। জীবনের সর্বক্ষেত্রে একটা মহাসত্য বারবার উদ্ভাসিত হয়ে থাকে, সেটা হলো আল্লাহর দেয়া জীবনবিধান সর্বাত্মকভাবে জীবনের প্রতিমুহূর্তে গ্রহণ করতে পারলে পৃথিবীটা প্রকৃত সুখের ও শান্তির হয়ে উঠতো। ঈদুল ফিতর সেই বার্তা নিয়েই আমাদের কাছে আসে বারবার।
মাওলানা শামছুল ইসলাম হাকেমী : লেখক