রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

কারসাজি করে বাড়ানো হচ্ছে পণ্যের দাম

| প্রকাশিতঃ ৫ মে ২০২৩ | ২:৩৩ অপরাহ্ন


ঢাকা : ঈদুল ফিতরের আগে থেকেই অস্থির হওয়া বাজারদর এখনো স্থির হয়নি। উল্টো ঈদের পর নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে চিনি, তেল, পেঁয়াজ, আলু, আদা ও ডিমের দাম। কেজিতে এসব পণ্যের দাম বেড়েছে ১৫ থেকে ২০ টাকা করে।

বিক্রেতারা বরাবরের মতো সরবরাহ সংকটকে দায়ী করলেও সরকারের নজরদারির অভাবকেই দায়ী করছেন সাধারণ ক্রেতা। তাদের মতে, নজরদারি না থাকার সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াচ্ছে।

অপরদিকে, অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ মুহূর্তে এসব পণ্যের দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। তাই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ আশা করছেন তারা। এতে মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের লোকজন চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে বলেও মনে করেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ঈদপরবর্তী সব পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। চাল-তেল থেকে মাছ-সবজিসহ প্রায় সব নিত্যপণ্য নিয়েই বাজারে চলছে কারসাজি। বর্তমানে আলোচনায় চিনির দাম হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে। সরকারের তদারকিতেও নাগালের মধ্যে আনতে পারছে না পণ্যটির দাম। বাজারে সপ্তাহের ব্যবধানে খোলা চিনির দাম কেজিতে বেড়েছে ১৫-২০ টাকা পর্যন্ত।

যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমায় সরকার গত ৮ এপ্রিল থেকে পরিশোধিত খোলা চিনির কেজিতে ৩ টাকা কমিয়ে ১০৪ টাকা এবং প্যাকেট চিনির দামও ৩ টাকা কমিয়ে ১০৯ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু সরকার ঘোষণা করলেও বাস্তবে বাজারে উল্টো চিত্র। প্রতি কেজি খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। যেখানে ঈদের আগে বাজারে প্রতি কেজি খোলা চিনির দাম ছিল সর্বোচ্চ ১২৫ টাকা। খোলা চিনি কিছুটা পাওয়া গেলেও প্যাকেটজাত চিনি মিলছে না বাজারে।

বাজারে আরেক দফা বেড়েছে ভোজ্যতেলের দাম। ভোজ্যতেল আমদানিতে সরকারের ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা জানিয়ে সয়াবিন তেলের মূল্য সমন্বয় করেছে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স এন্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশন। সংস্থাটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের জন্য এখন থেকে ১৯৯ টাকা গুনতে হবে ক্রেতাকে। আগে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১৮৭ টাকা। সমন্বয়কৃত মূল্য অনুযায়ী এখন থেকে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হবে ১৭৬ টাকায়। এছাড়া সয়াবিন তেলের ৫ লিটারের বোতল ৯৬০ টাকা এবং খোলা পাম সুপার তেলের প্রতি লিটার বিক্রি হবে ১৩৫ টাকায়।

বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৪০-৫০ টাকা। অন্য সবজির তুলনায় এ দামকে বেশি বলার সুযোগ নেই। তবে এক সপ্তাহের মধ্যে ৩৫ থেকে আলুর দাম ৫০ টাকায় পৌঁছার কারণ কী তা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন ভোক্তারা। চলতি বছর আলুর উৎপাদন যা হয়েছে তার পরিমাণ স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি।

অন্যদিকে ঈদের আগে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৪০ টাকা কেজি। সেই পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি বিক্রি করা হচ্ছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদে কৃষকরা এসব বিক্রি করে দিয়েছে। বর্তমানে তা বিভিন্ন আড়তে ও মোকামে চলে গেছে। তারা সিন্ডিকেট করে ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছে। এজন্য আমাদেরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।

হঠাৎ করে ডিমের দাম হালিতে পাঁচ টাকা বেড়েছে। ডজনে বেড়েছে ২০ টাকা। দুই দিন আগেও প্রতি ডজন ডিমের দাম ছিল ১৩০ থেকে বাজারভেদে ১৩২ টাকা। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালেই উঠে গেছে ১৫০ টাকায়।

এদিকে আগে ১৮০ টাকা কেজি বিদেশি আদা বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা কেজি। তারপরও লাভ থাকছে না বলে জানান ব্যবসায়ীরা। তবে দেশি আদা ১৭০ টাকা বিক্রি করা হচ্ছে। যা ঈদের আগে ছিল ১২০ টাকা কেজি।

বাজার ঘুরে ও বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কারণে-অকারণে দেশে একেক সময় একেক পণ্যের দাম বাড়ছে। কোনো পণ্যের দাম বাড়লে তা সহজে কমছে না। দাম বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট কারণ না থাকলেও ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ, ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া, সময় মতো এলসি খুলতে না পারাসহ বিভিন্ন যুক্তি দাঁড় করিয়ে রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। এমনকি সরবরাহ সংকট দেখাতে অনেক সময় বাজার থেকে পণ্য হাওয়া করে দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এসব কাজে শক্ত ভিত তৈরি করে রেখেছে অসাধু সিন্ডিকেট। তবে এ সিন্ডিকেট ভাঙতে বিভিন্ন সময় সরকারি উদ্যোগ দেখা গেলেও কার্যকর হয়নি।

সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকারকে আরো কঠোর আইন করতে হবে। সুনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থা নেই বলেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবার একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সরকারের একার পক্ষে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, দ্রব্যমূল্য মানুষের নিয়ন্ত্রণে নেই, এটাই বাস্তবতা। তিনি বলেন, এমন বাস্তবতায় মানুষের কষ্ট হচ্ছে। বিশেষ স্বল্প আয়ের বা নির্ধারিত আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস অবস্থা। সুতরাং সাধারণ মানুষের আয় না বাড়লে তাদের জীবনমানের অবনতি হবে।

ক্যাব সভাপতি বলেন, সরকারও দ্রব্যবমূল্যের লাগাম টানতে পারছে না। এজন্য আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট যেমন দায়ী, তেমনি অভ্যন্তরীণ যেসব নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন তা নিতে পারছে না। বিশেষ করে আর্থিক নীতি এবং মুদ্রানীতি।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফিতি রোধ করতে মুদ্রানীতিতে যেসব পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন সেইসব পদক্ষেপ নিতে সরকার হয়তো সামর্থ নয়। অথবা কর্তৃপক্ষের যথাযথ উদ্যোগ নেই।