
একুশে প্রতিবেদক : জেলেদের জালে ধরা দিতে শুরু করেছে রুপালি ইলিশের ঝাঁক। কিন্তু সে ইলিশ ধরা দিচ্ছে না সাধারণ মানুষের পাতে। চড়া দামের তাপে হাত পুড়ে যাওয়ার অব্স্থা। অথচ বিশ্বে যে পরিমাণ ইলিশ আহরণ হয় তার ৮০ শতাংশই বাংলাদেশে। মৎস্য অধিপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১২-১৩ অর্থবছরের পর থেকে দ্বিগুণ হয়েছে ইলিশের আহরণ। তারপরও জাতীয় মাছ থেকে যাচ্ছে নাগালের বাইরে। এতটাই বাইরে যে, বেশির ভাগ মধ্যবিত্তের কাছে তা ক্রমশ হয়ে উঠছে দূরের বস্তু।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭-০৮ সালে দেশে ইলিশের আহরণ ছিল ২ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন। যা বেড়ে ২০১২-১৩ অর্থবছরে হয়েছিল তিন লাখ ৫১ হাজার ২২৩ মেট্রিক টন। বর্তমানে ইলিশের উৎপাদন প্রায় ছয় লাখ মেট্রিক টন।
ইলিশের জেলা চাঁদপুরে এক কেজি ওজনের একেকটি মাছ বিক্রি হচ্ছে ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকায়। ৭০০/৮০০ গ্রাম ইলিশের দাম ১১০০ টাকার আশপাশে। আর দুই কেজি ওজনের ইলিশের ক্ষেত্রে প্রতি কেজির দাম দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত। বরিশাল, পটুয়াখালী এবং চট্টগ্রামেও এই মুহূর্তে ইলিশের দাম আকাশছোঁয়া। এই জেলাগুলোই ইলিশ আহরণের প্রধান কেন্দ্র। এক সময় ‘মাছের রাজা’ খ্যাত জাতীয় মাছ ইলিশ ছিল দামে একেবারেই সস্তা। দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজলভ্য। আর এখন সে হয়ে উঠেছে দামের রাজা। বাজারে এখন ইলিশ মাছের চেয়ে বেশি দামের মাছ নেই।
চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাট বাজারে রুপালি ইলিশ রূপ দেখে অনেক ক্রেতাকেই দরদাম করতে দেখা গেল। কিন্তু দাম শোনার পর তাদের অনেকেই চলে যান রুই, পাঙাশ, তেলাপিয়াসহ অন্য মাছের দিকে। ক্রেতারা জানান, এ বছর ইলিশের দাম অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে এমনিতেই সংসার চালাতে হিমশিম অবস্থা। তাই এত দাম দিয়ে ইলিশ কিনলে অন্য পদে টান পড়বে।
বহদ্দারহাটে ইলিশ কিনতে আসা সাইফুল আলম নামে এক ক্রেতা বলেন, এক হাজার টাকায় ৮০০/৯০০ গ্রামের একটা ইলিশ কিনে ফেলতে পারলেও কোনো পরিবারের দুবেলা খাওয়ার উপায় নেই। এ দামে বরং ইলিশ কেনার চাইতে দুইটা ব্রয়লার মুরগি আর সবজি কেনা যাবে। ইলিশ তো পুকুরে চাষ করতে হয় না। নদীতেই পাওয়া যায়। তাহলে এর কেন এত দাম হবে?
জেলে, পাইকার, আড়তদার ও মৎস্য বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, এ বছর সাগরে ইলিশ পাওয়া গেলেও নদনদীতে ধরা পড়ছে না। সুস্বাদু হওয়ায় ভোক্তাদের কাছে নদীর ইলিশের চাহিদা বেশি। আবার চাহিদার কারণে বাজারের অনেক ব্যবসায়ী সাগরের ইলিশকে নদীর বলে চড়া দাম হাঁকছেন। তবে মাছ ব্যবসায়ীদের দাবি, কয়েক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি তেল ও বাজারে নিত্যপণ্যের দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে ইলিশের দামেও।
চট্টগ্রামের কয়েকজন জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ী জানান, মাছ ধরার একটা ট্রলারে জ্বালানি তেল লাগে ১২ ব্যারেল। সঙ্গে লাগে মবিল। এ খরচা প্রায় ৪০/৪৫ হাজার টাকা বেড়েছে। আবার বরফের খরচ ৬০/৭০ হাজার টাকা। যেটা গত বছর ছিল ৩৫/৪০ হাজার। জেলেদের ১৪/১৫ দিনের বাজার খরচ লাগে প্রায় এক লাখ ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। সহযোগীদের বেতনও এখন বেশি দিতে হয়। ঘাটের ইজারা, মাছঘাটের শ্রমিকের মজুরি, পাইকার, আড়তদারের কমিশনসহ অনেকগুলো খাতে টাকা যায়। এ ছাড়া প্রতিবছর ট্রলার মেরামত ও মাছ ধরার উপযোগী করতে কোটি টাকার বেশি খরচ হয়। এতসব খরচ তুলতে একটা ট্রলারকে একেকবার অন্তত ১৪ থেকে ১৫ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করতে হয়। আর যারা দাদনে টাকা নেয়, তাদের লাভ কম হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইলিশ আহরণ বাড়ছে। শুধু বাজারেই দাম কমছে না। এর পেছনে বিপণন ব্যবস্থাপনায় সিন্ডিকেটের কারসাজি রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নদী বা সাগর থেকে ইলিশ ধরার পর তা ঘাটে আনেন জেলেরা। এরপর তা নিলামে ওঠে। সবার প্রথমে আসা কয়েকটি ট্রলারের নিলাম মূল্য বেশি থাকে। কিন্তু যত ট্রলার আসতে থাকে নিলাম মূল্যও কমতে থাকে। কখনও এক কেজি ওজনের এক মণ ইলিশ ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা ওঠে। আবার কখনও বড় সাইজের মাছ ৬০-৬৫ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম ফিশারিঘাটের কয়েকজন মৎস্য ব্যবসায়ী জানান, ইলিশের দাম বাড়তে থাকে মূলত আড়তদার থেকে। কারণ প্রতিদিনই তারা ইলিশ সংগ্রহ করেন এবং তা কোল্ডস্টোরেজে সংরক্ষণ করেন। যেদিন ইলিশের নিলাম দাম কম থাকে সেদিন তারা সেগুলো কোল্ডস্টোরেজে রেখে দেন। এ ছাড়া যেসব বড় মাছ ধরার প্রতিষ্ঠান আধুনিক জাহাজে মাছ ধরেন তারা সেখানেই মাছ সংরক্ষণ করে থাকেন। পরে মাছ আহরণ নিষিদ্ধ বা কম মাছ উঠলে বাজারে সংকট দেখা দেওয়ার সুযোগে তারা মাছগুলো বাজারে ছাড়েন। এতে পাইকারিসহ বিভিন্ন পর্যায়ে ইলিশের দাম থাকে চড়া। তবে এখন দেশে ইলিশ ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেড়েছে। এ কারণে ঘাট ও আড়ত থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় কয়েকশ হাতে চলে যাচ্ছে মাছ। ফলে তাদের মাধ্যমেই গড়ে উঠছে সিন্ডিকেট।
চট্টগ্রামের সামুদ্রিক মৎস্য জরিপ ইউনিটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইউসুফ হাসান বলেন, ইলিশের দামটা কখন বাড়ে সেটি নিয়ে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, মূলত এ সময়ের ভরা মৌসুম থেকে শুরু করে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দাম স্থিতিশীল থাকে। এরপরে মার্চের শুরু থেকে এপ্রিল পর্যন্ত দুই মাস মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে; আর মে মাসে যখনই মাছ ধরা শুরু হয় ঠিক তখন থেকে দাম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়ে যায়। গত বছর এক কেজি সাইজের ইলিশের দাম ছিল ১২০০ টাকা। এ বছর সেই মাছ বিক্রি হচ্ছে ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকায়। অর্থাৎ দ্বিতীয়বার যখন মাছ আসে তখন দাম বাড়ছে।
তিনি বলেন, প্রতিবছর অক্টোরে ২২ দিনের জন্য সরকারিভাবে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ থাকে, এ বছরও থাকবে। এরপর নভেম্বরে মাছ কম থাকে, তবে পাওয়া যায়। তাই দামও বাড়ে। এখন নদী থেকে যেসব জেলে ইলিশ ধরে আনছে তারা ধরেই নেয় এটা কেজিপ্রতি বিক্রি করবে ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা। এর নিচে নামবে না। একটা সময় মাছ সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না, নষ্ট হয়ে যেত। কিন্তু এখন সে আশঙ্কা নেই। তা ছাড়া এখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে; কোনো মাছ বিক্রি না হয়ে থাকে না। এ কারণেও দাম ধরে রাখছে বিক্রেতারা।
মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খন্দকার মাহবুবুল হক বলেন, এক কেজি সাইজের ইলিশের গড়পরতা দাম এ মুহূর্তে অনেকটা কমেছে। গত দুই থেকে তিন বছরে এ সাইজের মাছ উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারে ইলিশের দাম বেশি বা কম এটা শুধু উৎপাদন বা আহরণের ওপর নির্ভর করে না। এখানে কতগুলো হাতবদল হলো ইত্যাদিসহ অনেক বিষয় রয়েছে। দামবৃদ্ধির বিষয় নিয়ে আমাদের কোনো গবেষণা নেই। তবে সরকার যদি মৎস্য অধিদপ্তরকে দায়িত্ব দেয় তাহলে আমরা দাম নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কাজ করব।