চট্টগ্রাম : ইলিশ সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় বরফের উচ্চমূল্যের কারণে ভরা মৌসুমেও ইলিশের দাম পড়ছে বেশি। বরফ ছাড়াও ইলিশ সংরক্ষণের একাধিক উপকরণের মৌসুমি ব্যবসায়ী দাম বাড়িয়ে দেয়ায় বিপাকে পড়েছে আড়তদাররা।
দেশে সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক মৎস্য অবতরণকেন্দ্র ফিশারিঘাটের ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিটি বরফের (ক্যান) দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকা। কিন্তু ইলিশের মৌসুম শুরু হলেই আইস ফ্যাক্টরিগুলো বরফের দাম বাড়িয়ে দেয়। হঠাৎ করেই অতিরিক্ত চাহিদার সুযোগে দাম বাড়ানোর ফলে ইলিশ মজুদদার ও ব্যাপারীরা বিপাকে পড়েছেন।
দুই সপ্তাহ আগেও প্রতি ক্যান বরফের দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও বর্তমানে দাম কয়েকগুণ বেড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে করে আড়ত থেকে নিলামের মাধ্যমে কম দামে মাছ ক্রয়ের পরও খুচরা বাজারে গিয়ে বেশি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে।
মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের ফিশারিঘাট দেশের সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক মৎস্য অবতরণকেন্দ্র। ফলে প্রতিবছর মৌসুমে প্রায় প্রতিদিন সাগরে মাছ ধরার জন্য ট্রলার সাগরে যায়। প্রতিটি ট্রলারে সর্বনিম্ন ১০ থেকে ১৫০টি পর্যন্ত বরফ প্রয়োজন হয়। এ হিসাবে বিভিন্ন তিথিতে সপ্তাহব্যাপী প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ হাজার পিস বরফের চাহিদা রয়েছে। চট্টগ্রামে প্রায় ৫০টির মতো বরফ তৈরির কারখানা থাকায় হঠাৎ করে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে দামও বাড়িয়ে দেয় কারখানা মালিকরা। বাড়তি দামে বরফ ক্রয়ের ফলে বোট মালিকরা সংগৃহিত ইলিশ তুলনামূলক বেশি দামেই বিক্রি করতে বাধ্য হয়।
এছাড়াও সাগর থেকে উত্তোলিত মাছ আড়তে আসার পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়ে যেতে এবং মজুদ রাখতে বরফের প্রয়োজন হয়। সাগর থেকে ইলিশ ধরা ও ডাঙায় মজুদের জন্য বাড়তি দামে বরফ ক্রয়ের ফলে ভরা মৌসুমেও ইলিশের দামে প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের মেসার্স পাপ্পু আইস কোম্পানির স্বত্তাধীকারী মো. আবদুল মান্নান বলেন, প্রতিটি বরফকলের উৎপাদন ক্ষমতা নির্দিষ্ট। ইলিশের মৌসুমে চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন কম থাকায় ক্রেতারাই বেশি দামেই বরফের বুকিং দেয়। এছাড়া অফ সিজনে লোকসানে থাকার ফলে মৌসুমে বাড়তি চাহিদা থাকায় লোকসান কিছুটা কমিয়ে আনতে দাম বেশি রাখা হয়। এতে দোষের কিছু নেই বলে দাবি করেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ইলিশের মৌসুম শুরু হওয়ার পর থেকেই প্রতিটি অমাবশ্যা ও পূর্ণিমার সময়ে সাগরে প্রচুর পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ছে। দেশের উপকূলীয় বিভিন্ন অঞ্চলের জেলেরা মাছ নিয়ে চট্টগ্রামের ফিশারিঘাটে নিয়ে আসে। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের আগে মাছ বিক্রি না হওয়ায় গুণগত মান রক্ষায় বরফ, প্লাস্টিক, কার্টনের মাধ্যমে মজুদ করা হয়। কোল্ডস্টোরেজে রাখতে প্রসেসিং ব্যবস্থায় এসব পণ্যের দাম বেশি থাকায় কম দামে ক্রয়ের পরও ইলিশের দাম বেশি পড়ছে। এতে খুচরা বাজারে নিয়ে যাওয়ার পর অতিরিক্ত দামেই এসব মাছ বিক্রি করতে হয় বলে জানিয়েছেন মাছ ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রামের মেসার্স মিতালী আইসের স্বত্তাধীকারী মোহাম্মদ হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় গত কয়েক বছরের চেয়ে বেশি দামেই বরফ বিক্রি করতে হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে ৮০ থেকে ১০০ টাকায় প্রতিটি বরফ বিক্রি হলেও সাগরে বোট যাওয়ার সময় চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা দরে বরফ বিক্রি করতে হয়। লোকসান পুষিয়ে নিতে বেশি দাম রাখা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
জানা গেছে, গত দুই বছর ধরে বরফ ও লবণের বাড়তি দামের কারণে ভরা মৌসুমে আহরিত মাছ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মজুদ করতে পারেনি ব্যবসায়ীরা। অনেকেই ছোট ও পঁচে যাওয়া মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ না করেই সমুদ্রতীরে ফেলে দিয়েছে। এবছরও বরফ কিংবা লবণের দাম সহনীয় পর্যায়ে নেমে না আসলে ইলিশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ দূষণের মতো ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফিশারিঘাট মৎস্য আড়তদার সমিতির নেতা সাব্বির আহমেদ বলেন, নানান কারণে চট্টগ্রামের ফিশারিঘাটে মৎস্য অবতরণে বোট মালিকদের অনীহা রয়েছে। এর উপর চট্টগ্রামে দেশের অন্যান্য জেলার চেয়ে বরফের দাম বেশি হওয়ায় বাধ্য হয়ে দেশের বিভিন্ন আড়তে নিয়ে যাচ্ছে মাছ। ইলিশ মাছ প্রক্রিয়াজাত ও মজুদে বরফসহ আনুষঙ্গিক বিভিন্ন পণ্যের দাম বেশি থাকায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যাপারীরাও ফিশারিঘাটের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে। বরফকলগুলোর উপর তদারকি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো গেলে ভরা মৌসুমেও মাছের দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকতো বলে জানিয়েছেন তিনি।