ফাহিমা সাথী : কারও হাতে ভাঁজ করা ছিল সাদা কাগজ। তাতে আঁকা নানান ছবি বা জন্মদিনের শুভেচ্ছা বার্তা। কেউ এসেছে কলম হাতে। কারও হাতে দেখা গেছে ছোট ডায়েরী। কারও কারও হাতে দেখা গেছে জন্মদিনের শুভেচ্ছা গাঁথা কার্ড। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন প্রফেসর ড. গাজী সালেহ উদ্দিনের জন্মদিনে তার বাসায় এমন নানান উপহার হাতে ভিড় করেছিল সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা।
ছোট্ট শিশু কুলসুমকে জিজ্ঞেস করা হল, ‘তোমার হাতে কি?’ উত্তরে জানালো গেল, ‘আমাদের স্যারের আজ জন্মদিন। স্যারের জন্য আমি শহীদ মিনারের ছবি এঁকে এনেছি। এটি স্যারকে উপহার দেব।’ কুলসুম পড়ে প্রথম শ্রেণীতে। বয়স হবে সাত কি আট বছর। বাবা নেই। হোটেলে হোটেলে মসলা বেটে রোজগার করে মা।
শুধু কুলসুম নয়, এমন সুবিধাবঞ্চিত প্রায় চল্লিশজন শিশু ড. গাজী সালেহ উদ্দিনের জন্মদিনে উপহার হাতে হাজির হয়েছে বাসায়। তাদের সবার বয়সই ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে। এরা সবাই আবার বিজিএমইএ ভবনের পাশে গড়ে ওঠা ‘নৈতিক’ স্কুলের শিক্ষার্থী।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর গ্রহনের পর ড. গাজী সালেহ উদ্দিন এ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। স্কুলটিতে শিশুদের নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়া হয়। শেখানো হয় নাচ, গান, সুন্দর কথা বলা। স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে স্কুলটিতে পড়ায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষা উপকরণসহ স্কুলটির সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন ড. গাজী।
জন্মদিন উপলক্ষ্যে স্কুলের শিশুদের দুপুরে খাবারের আয়োজন করেন তিনি। স্যারের বাসার কেয়াটেকার আব্দুল চাচা শিশুদের জন্য রান্না করলো মাংস-পোলাও। খাওয়া-দাওয়ার পর স্যার শিশুদের গাড়ি করে স্কুলের স্বেচ্ছাসেবীদের সাথে পাঠালেন সাগড়পাড়ে। জন্মদিনের দুপুর-বিকেল কাটলো স্যারের এভাবেই।
এর আগে দুপুরে যখন শিশুরা হাজির তখন স্যার সবাইকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন ছবি তুলতে, আর ছোট ছোট উপহার থেকে নিতে। শিশুদের হাত থেকে এমন উপহার পেয়ে বারবারই আপ্লুত হচ্ছিলেন স্যার। ‘নৈতিক’ স্কুলের শিশুরা প্রত্যেকেই যেন ড. গাজী সালেহ উদ্দিনের পরম বন্ধু। তাদের সাথেই মেঝেতে বসে দুপুরের খাবার খেলেন তিনি।
এরপর সন্ধ্যা নামতেই বাসায় আসেন স্যারের শুভাকাঙ্ক্ষী ও ছাত্র-ছাত্রীরা। তারা কেক কেটে উদযাপন করেন স্যারের ৬৯তম জন্মদিন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন প্রফেসর ড. গাজী সালেহ উদ্দিন। ছিলেন দুই দফা এই অনুষদের ডীন। মুক্তিযুদ্ধ গবেষক হিসেবে সুমান রয়েছে এ সমাজবিজ্ঞানীর। মুক্তিযুদ্ধে উপর লিখা তার বই সমাদৃত হয়েছে সবখানে। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রতিষ্ঠাকালীন দায়িত্বশীল ছিলেন তিনি।
স্যারের জন্মদিনের অনুষ্ঠান এবং শিশুদের আনন্দভ্রমনের সার্বিক সহযোগিতায় ছিলো ‘নৈতিক স্কুল’র ভলান্টিয়াররা। তাদের মধ্যে ছিলো হাবীব, মহসিন, আরমিন, বাহার, মামুন, জাহিদুল, সিফাত ও আরো অনেকে।
স্যার আমাদের মাঝে বেঁচে থাকুন অনেক অনেক দিন। আমাদের বটবৃক্ষ হয়ে। স্যারের ৬৯তম জন্মদিনে শুভেচ্ছা।
লেখক : সমন্বয়ক, নৈতিক স্কুল; সাবেক শিক্ষার্থী, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।