রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

সুদীপ্ত হত্যা ও ১১ দিনের ময়নাতদন্ত…

| প্রকাশিতঃ ১৭ অক্টোবর ২০১৭ | ৬:৫৬ অপরাহ্ন

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের রাজনীতিতে ওমরগণি এমইএস কলেজ ও সিটি কলেজের বেশ গুরুত্ব রয়েছে। ছাত্রলীগের রাজনীতি দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে এই দুটি কলেজ থেকেই। এ দুই কলেজের ছাত্রলীগের প্রভাবশালী নেতারাই সব সময় মহানগরের পাশাপাশি বিভিন্ন থানা, ওয়ার্ড ও কলেজ পর্যায়ে ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রণ করেন।

এই দুটি কলেজই নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী ছাত্রলীগ নেতারা। ফলাফল হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দুটি পদই যায় মহিউদ্দিনের ঘরে। সর্বশেষ মহানগর ছাত্রলীগের কমিটির সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু সিটি কলেজের ছাত্র এবং সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি এমইএস কলেজের ছাত্র; দুজনই মহিউদ্দিনের অনুসারী।

সিটি কলেজে এখনো শক্ত অবস্থানে মহিউদ্দিন পক্ষ। এই অবস্থার পরিবর্তন চান মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা। সিটি কলেজে নিয়ন্ত্রণ নিতে আগ্রহী হয়ে উঠেন ওই শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতা। নতুন কমিটিতে মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের যে কোনো একটি পদ নিজের অনুসারীদের এনে দিতে পারলে ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া যাবে- এই ধারণায় সিটি কলেজে একক আধিপত্য বিস্তারের লক্ষে নিজের অনুসারীদের নিয়ে শক্ত গ্রুপ তৈরীর পরিকল্পনা করেন তিনি। এই পরিকল্পনায় যুক্ত হন সিটি কলেজ ছাত্রলীগের এক সাবেক সভাপতি, সিটি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক তিন ভিপি, একজন সাবেক জিএস ও অন্তত তিনজন কাউন্সিলর।

২০১০ সালে কলেজ ছাত্রলীগের সর্বশেষ কমিটি হয়েছিল। দুই বছরের এ কমিটি এখনো বহাল। একইভাবে ২০০৬ সালের পর ছাত্রসংসদের নির্বাচনও বন্ধ। কলেজের নতুন কমিটি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে নানা আলোচনা চলছিল সাম্প্রতিক সময়ে। এতে সক্রিয় ছিলেন সুদীপ্ত। ফেসবুকে বিভিন্ন স্ট্যাটাস ও কমেন্ট দিয়ে ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত বিশ্বাস বিভিন্ন অনিয়ম ও সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে লেখালেখি করেন।

সিটি কলেজ ছাত্রলীগের নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণে দুই পক্ষই একক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে আসছিল। একসময় ছাত্র শিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল, বর্তমানে বোল পালটে ছাত্রলীগের রাজনীতি করে- এমন একজনকে কমিটিতে রাখতে চেয়েছিলেন মহিউদ্দিনের বিরোধী পক্ষে থাকা এক নেতা; তিনি একটি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। মহিউদ্দিনের অনুসারী সুদীপ্ত এই মতের বিরুদ্ধে জবাব দেয় মুখের উপর। এতে ঐ নেতা অপমানিত হন। মুখে মুখে তর্ক করার কারণে তাকে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা করা হয় এবং মোবাইল ফোনে তাকে দেখে নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। তার প্রত্যুত্তরে সুদীপ্ত তার ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেয়, ‘অপেক্ষায় রইলাম’।

৬ অক্টোর সকালে সুদীপ্তকে বেধড়ক পিটিয়ে রাস্তায় ফেলে চলে যাওয়ার সময় মোটর সাইকেল আরোহীদের একজন ফোন করে ঐ নেতাকে জানান, ‘কাজ হইছে। মোটামুটি ছয় মাস আর নড়তে-চড়তে পারবে না।’ সুদীপ্ত খুনের ঘটনায় গ্রেফতার মোক্তার হোসেনকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করে এসব তথ্য পেয়েছে পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, পরিকল্পনা ছিল সুদীপ্তকে পঙ্গু করার, খুনের পরিকল্পনা ছিল না। হামলার সময় সুদীপ্তের হাত বেধে ফেলেছিল দুর্বৃত্তরা। এরপর হাত-পা ভেঙে ফেলে। অসতর্কতাবশত তার মাথার পেছনে আঘাতের ফলে ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়। তবে মাথার বাইরে তেমন ফেটে যায়নি। প্রাথমিক পর্যায়ে তার অবস্থা গুরুতর হিসেবেও মনে হয়নি স্বজনদের কাছে। তার শরীরে ছুরিকাঘাতের কোন চিহ্ন নেই। মেরে ফেলার উদ্দেশ্য থাকলে ছুরিকাঘাত অথবা গুলি করতো। এছাড়া মাথার স্পর্শকাতর জায়গায় আঘাতের পর চিকিৎসা পেতে দেরী হয়েছে তার। সাড়ে ৭টায় ঘটনার পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার চিকিৎসা শুরু হয় সাড়ে ১০টার দিকে। সাড়ে ১১টার দিকে সুদীপ্ত মারা যাওয়ার আরও আধাঘন্টা পর মেডিকেল পুলিশ ফাঁড়ি থেকে সদরঘাট থানায় খবরটি জানানো হয়।

এদিকে সুদীপ্ত বিশ্বাস হত্যাকাণ্ডের হোতাকে গ্রেফতারের জন্য গত ১০ অক্টোবর পুলিশকে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেয় মহানগর ছাত্রলীগ। তা না হলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনারের কার্যালয় ঘেরাও এর কর্মসূচি দেওয়ার হুমকি দেয় তারা। সুদীপ্তের খুনি গ্রেফতারে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশের পরদিন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সুদীপ্ত হত্যার বিচার দাবিতে এক সমাবেশে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। নগর ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ও সিটি কলেজ ছাত্রলীগ নগর সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী।

শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ওই সমাবেশে ছাত্রলীগ নেতারা বলেছিলেন, খুনিদের আটকে অভিযান চলছে পুলিশের এ বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। মহানগর আওয়ামী লীগের অসুস্থ একজন শীর্ষ নেতার বেড রুমের সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করলে পুলিশের বক্তব্য মিথ্যা প্রমাণ হয়ে যাবে।

এর আগে ৮ অক্টোবর নগরীর কয়েকজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত হত্যা নিয়ে ‘অপরাজনীতির’ প্রতিবাদ জানিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছিল। ওই বিবৃতিতে লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম মাসুম ও চকবাজার ওয়ার্ডের যুগ্ম সম্পাদক মাসুদ করিম টিটুর বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচার’ এর প্রতিবাদ জানানো হয়। বিবৃতিদাতা পাঁচ ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছিলেন- হাসান মাহমুদ হাসনী, তারেক সোলায়মান সেলিম, নাজমুল হক ডিউক, হাসান মুরাদ বিপ্লব ও মোহাম্মদ জুবায়ের। এই পাঁচ কাউন্সিলর এবং লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা দিদারুল আলম মাসুম নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

এদিকে সুদীপ্ত হত্যার ঘটনায় অনেকই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে অংশ নিলেও এখন পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছে মোক্তার নামের শুধু একজন; ১৩ অক্টোবর রাতে নগরের বড়পোল থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এরইমধ্যে আগে থেকে ঘোষণা দিয়ে ১৫ অক্টোবর হত্যাকারী ও ইন্ধনদাতাদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও ফাঁসির দাবিতে’ নগর পুলিশের কমিশনারকে ঘেরাওয়ের কথা থাকলেও পরে তা বদলে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের অবস্থান কর্মসূচি যেখানে চলেছিল তার ঠিক বিপরীতেই চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কার্যালয়।

সেদিনের সমাবেশে মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি বলেন, আমাদের প্রশ্ন হলো সুদীপ্ত হত্যার বিচার হবে কি হবে না? আসামিরা গ্রেফতার হবে কি হবে না? একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বরাত দিয়ে পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে লালখান বাজারে বৈঠকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়। কার নির্দেশে হতাকাণ্ড ঘটানো হলো? ভিডিও ফুটেজসহ সব তথ্য পুলিশের কাছে আছে। কার নির্দেশে হত্যার পর পাঁচ ওয়ার্ড কাউন্সিলর বিবৃতি দিয়েছিল?

সেদিন তিনি আরও বলেন, দিয়াজকে হত্যার পর কেন আত্মহত্যা বলা হয়েছিল? মেহেদী হাসান বাদলকে হত্যার পর নেতৃবৃন্দ কেন গুপ্তহত্যা বলেছিল? সোহেল হত্যার পর কেন ভিসির পদত্যাগ দাবি করা হয়েছিল? কারণ একটাই খুনিদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। প্রত্যেকটি একই সূত্রে গাঁথা।

এদিকে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সহ সম্পাদক সুদীপ্তের ফেসবুক ওয়ালে গিয়ে দেখা গেছে, ৬ সেপ্টেম্বর সুদীপ্ত লিখেছেন, ‘প্রিয় নেতৃবৃন্দ, সিটি কলেজ ছাত্রসংসদ কমিটিটা খুব দরকার। আমার কোনো স্বার্থ নেই কিন্তু।’ ৪ অক্টোবর আরেক পোস্টে লিখেন, ‘প্রজা ছাড়া রাজার দাম যেমন নেই তেমনি কর্মী ছাড়া নেতারও দাম নেই। কর্মীদের বিদ্রোহ দরকার নতুন কিছু প্রাপ্তির জন্য।’ তার আগের দিন আরেক পোস্টে লিখেন ‘ওয়ান ইলেভেনে অনেককেই দেখি নাই রাজপথে.. ও সরি এটা বললে আবার অন্যায়।’

২৮ সেপ্টেম্বর আরেক পোস্টে লিখেন ‘কলেজের বারান্দায় হাঁটেনি এমন পাবলিকও আজকাল মিছিল পরবর্তী সমাবেশের মঞ্চে উঠে। নোংরামি আর কতো?’ ১ অক্টোবর আরেক পোস্টে লিখেন- ‘রাজনীতি বড়ই জটিল জিনিস- একসময়কার কথিত ডাস্টবিন এখন ফুলের বাগানের সৌরভ ছড়াচ্ছে!’ আর ২৪ আগস্টের এক পোস্টে তিনি লিখেন, ‘২০১৭, আর কতো অকাল মৃত্যু চাও’। কাকতালীয়ভাবে এই পোস্টের ৪৪ দিন পর সুদীপ্তও অকালে ‘দুর্বত্তের’ হাতে প্রাণ হারান। আর সর্বশেষ ৫ অক্টোবর রাতে লিখেন, ‘অপেক্ষায় রইলাম’। এর ঠিক ছয় থেকে সাত ঘন্টা পর খুন হতে হয় তাকে।

সুদীপ্তদের বাসা চট্টগ্রাম নগরের দক্ষিণ নালাপাড়া এলাকায়। গত ৬ অক্টোবর সকাল সাড়ে সাতটার দিকে দুই যুবক বাসায় এসে সুদীপ্তকে জানান, তার এক বন্ধুর বাবা মারা গেছেন। খবরটি শুনেই তাদের সঙ্গে বেরিয়ে যান তিনি। এর ১০ মিনিট পর চিৎকার শুনে তার মা টিনের ঘরের বাসা থেকে বেরিয়ে গলির মুখে যান। বাসা থেকে ওই পথের দূরত্ব প্রায় ১০০ ফুট। সেখানে ছেলেকে রাস্তার পাশে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। পরে তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে সকাল ১১টায় মৃত্যু হয় এই ছাত্র নেতার।