শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

এস আলম গ্রুপের সাতটি ব্যাংকসহ ৯টি ব্যাংকের বিশেষ সুবিধা বন্ধ

সরকার পরিবর্তনের পর আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ফেরাতে নতুন উদ্যোগ
| প্রকাশিতঃ ১৪ অগাস্ট ২০২৪ | ১০:২৯ পূর্বাহ্ন


একুশে প্রতিবেদক : বাংলাদেশ ব্যাংক, চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন বেসরকারি খাতের সাতটিসহ মোট নয়টি ব্যাংকের বিশেষ সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছে। এর আগে, এই ব্যাংকগুলোর চলতি হিসাবে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলেও, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ সুবিধার কারণে তাদের ব্যাংকের নামে উপস্থাপিত চেক ক্লিয়ার করা হতো। এই সুবিধা ব্যবহার করে, ব্যাংকগুলি থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর, এই বিশেষ সুবিধা বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত সোমবার রাতে, বাংলাদেশ ব্যাংক এই নয়টি ব্যাংককে এক কোটি টাকার বেশি চেক অন্য ব্যাংকগুলোতে উপস্থাপন বা ক্লিয়ার না করার নির্দেশ দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম ডিপার্টমেন্ট থেকে সব ব্যাংককে মৌখিকভাবে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মূলত এস আলমের বেনামি ঋণ এবং আমানতের টাকা আটকাতেই এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা প্রাপ্ত ব্যাংকগুলি হলো ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক এবং পদ্মা ব্যাংক। এর মধ্যে প্রথম সাতটি ব্যাংকের মালিকানা এস আলম গ্রুপের।

এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক মন্তব্য করেছেন যে, তিনি এ ধরনের কোনো নির্দেশনা সম্পর্কে অবগত নন। তবে তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলি সাধারণত বড় অঙ্কের চেক গ্রহণ করছে না।

অপরদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকার পরিবর্তনের পর থেকে বেনামি ঋণের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এস আলম গ্রুপ বিভিন্ন সময়ে এই ব্যাংকগুলি থেকে বেনামি ঋণের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে নিয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাই বেনামি ঋণের অর্থ বা বড় অঙ্কের অর্থ অবৈধভাবে উত্তোলন রোধ করতে এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে বলে তারা মনে করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মৌখিক নির্দেশনা পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বেসরকারি খাতের একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, তারা ৯টি নির্দিষ্ট ব্যাংকের এক কোটি টাকার অধিক মূল্যের চেক উপস্থাপন না করার একটি মৌখিক নির্দেশনা পেয়েছেন। তবে, যেহেতু এটি কোনো আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন বা লিখিত নির্দেশনা নয়, তাই তারা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। একই সাথে, চেক ক্লিয়ারিং বা আরটিজিএসের মাধ্যমে লেনদেনের ক্ষেত্রে, যদি উক্ত ব্যাংকগুলোর কোনো চেক পাওয়া যায়, তবে তা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সাথে আলোচনা করে উপস্থাপন করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সরকার পরিবর্তনের পর, বেনামি ঋণের মাধ্যমে বেসরকারি ইসলামী ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠান, গ্লোডেন স্টার এবং টপ টেন ট্রেডিং হাউস, একদিনেই ৮৮৯ কোটি টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করেছিল, যা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সফলভাবে প্রতিহত করেছে।

গত ৬ আগস্ট, ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শাখায় সোনালী, জনতা, রূপালী, পূবালী এবং সিটি ব্যাংকের পাঁচটি চেক নগদায়নের জন্য জমা দেওয়া হয়। এই চেকগুলি ইস্যু করেছিল গ্লোডেন স্টার নামক একটি প্রতিষ্ঠান, যার মূল হিসাব ছিল আগ্রাবাদ শাখাতেই। শাখা ব্যবস্থাপকের প্রাথমিক অনুমোদনের পর, ৩৪৬ কোটি টাকা উত্তোলনের উদ্দেশ্যে এই চেকগুলি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু ব্যাংক কর্মকর্তাদের সতর্কতার কারণে এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

একই দিন, টপ টেন ট্রেডিংয়ের ৫৪৩ কোটি টাকার বেনামি ঋণের আবেদনও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ প্রত্যাখ্যান করে।

এস আলমের মালিকানাধীন সাতটিসহ মোট নয়টি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত নাজুক। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত সিআরআর এবং এসএলআর সংরক্ষণ করতে পারছে না। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে সংরক্ষিত চলতি হিসাবেও তাদের বিপুল পরিমাণ ঘাটতি রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, গত ১৬ মে পর্যন্ত পাঁচটি ব্যাংকের চলতি হিসাবে মোট ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ৪১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি ছিল ৮ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংকের ১ হাজার ১১ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩ হাজার ৩৬ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকের ২ হাজার ২৪ কোটি টাকা এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৬২ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন যে, এসব ব্যাংক তাদের জমাকৃত আমানতের তুলনায় অনেক বেশি ঋণ বিতরণ ও বিনিয়োগ করেছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে তাদের চলতি হিসাবের ঘাটতি আরও বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ বিবেচনায় এসব ব্যাংককে জামানত ছাড়াই ঋণ দিয়ে আসছে এবং তাদের লেনদেন হিসাব সচল রেখেছে। এই সুবিধার কারণেই মূলত ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ প্রদান করতে পারছে।

বর্তমানে এসব ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ ঘাটতি নিয়ে নানা মহলে আলোচনা চলছে। অনেকে এই ঘাটতির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সদ্য পদত্যাগ করা গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারকে দায়ী করছেন, কারণ তার ক্ষমতাবলেই এই সুবিধা দেওয়া হয়েছিল বলে তারা মনে করেন। শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর থেকে আব্দুর রউফ তালুকদারের খোঁজ মিলছে না। গত শুক্রবার অজ্ঞাত স্থান থেকে তিনি পদত্যাগপত্র পাঠান।