শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

এস আলমকে লাভবান করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজিরবিহীন লোকসান!

একই দিনে ভিন্ন দরে ডলার বেচাকেনা
| প্রকাশিতঃ ১৫ অগাস্ট ২০২৪ | ৭:২০ অপরাহ্ন


একুশে প্রতিবেদক : চট্টগ্রাম ভিত্তিক এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন ইসলামী ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অস্বাভাবিকভাবে সুবিধা দিয়েছে। তারা ব্যাংকটির কাছে কম দামে (১১০ টাকা) প্রচুর ডলার বিক্রি করে, পরে সেই ডলারই বেশি দামে (১১৬.৪৬ টাকা) ফেরত কিনে নেয়। এই লেনদেন একই দিনে ভিন্ন ভিন্ন দরে হয়েছে, যা খুবই অস্বাভাবিক। ‘ক্রলিং পেগ’ নামক নতুন নিয়ম চালুর পরদিনই এমনটা ঘটে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ৫৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব প্রতিবেদনেই এই তথ্য উঠে এসেছে।

অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, রিজার্ভ থেকে ডলার বেচাকেনা করে এত বড় লোকসান আগে কখনো হয়নি। এখন এটাকে স্বাভাবিক লেনদেন বলে চালানোর চেষ্টা হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৯ মে ইসলামী ব্যাংক থেকে দুই দফায় ৮৫ মিলিয়ন ডলার ১১৬.৪৬ টাকা দরে কেনা হয়, যার মূল্য প্রায় ৯৯০ কোটি টাকা। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, একই দিনে ওই ব্যাংককেই ৮২ মিলিয়ন ডলার ১১০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়, যার মূল্য মাত্র ৯০২ কোটি টাকা।

আইএমএফের পরামর্শে ৮ মে ডলারের দাম স্থিতিশীল করতে ‘ক্রলিং পেগ’ নামে নতুন পদ্ধতি চালু হয়। এতে ডলারের দাম ৭ টাকা বেড়ে ১১৭ টাকা হয়, যা ৯ মে থেকে কার্যকর। কিন্তু দাম বাড়ার আগেই, ইসলামী ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে গোপন সমঝোতা হয়। তারা পুরোনো দামে (১১০ টাকা) ডলার বিক্রি ও নতুন দামে (১১৭ টাকা) কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। লেনদেনের তারিখ পর্যন্ত পুরোনো করে দেখানো হয়, এমনকি ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পরদিন সন্ধ্যায় মেইল করে নিশ্চিত করে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিপুল লোকসান হয়।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরীর মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ ধরনের আর্থিক লোকসান অগ্রহণযোগ্য। তিনি প্রশ্ন তোলেন কেন বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ৫৪ কোটি টাকা লোকসান দিয়ে ডলার বিক্রি করবে এবং কার স্বার্থে এমনটা করা হয়েছে।

তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ছিল না বাড়তি দরে ডলার কিনে কম দরে বিক্রি করা। এই ঘটনার পেছনে কারা জড়িত এবং কোন পরিস্থিতিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা আরও তদন্ত করে সত্য উদঘাটন করা প্রয়োজন। দোষীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনারও দাবি জানান তিনি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ ও ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ডিলিং রুম বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন পরিচালনা করে। এই বিভাগের ফ্রন্ট অফিস ডলার কেনাবেচার ডিল সম্পাদন করে এবং মিডল অফিস এই লেনদেনের বার্তা অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের ব্যাক অফিসে পাঠায়। ব্যাক অফিস লেনদেনের নির্ভুলতা এবং অ্যাকাউন্টের অর্থের পরিমাণ তদারকি করে।

ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে চারটি লেনদেনের মধ্যে দুটি লেনদেনের ডিল ভ্যালু ডেটের মধ্যে ব্যাক অফিসে পাঠানো হয়নি, যা আন্তর্জাতিক রীতির ব্যত্যয়। যদিও ডিল যেদিন করা হয় সেদিনই ব্যাক অফিসে পাঠানো উত্তম, তবে ভ্যালু ডেটের মধ্যে পাঠানো বাধ্যতামূলক। এই অসঙ্গতি বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের ব্যাক অফিসে ধরা পড়ে।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসলামী ব্যাংকের কাছ থেকে পাওয়া ডিলের কনফার্মেশন গত ৯ মে ফ্রন্ট অফিস কর্তৃক ইনওয়ার্ড রেজিস্টারে নথিভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচার এই ডিলটি সংঘটিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাক অফিস যে ডিল কনফার্মেশন পায় তা-ও ইসলামী ব্যাংকের কাছ থেকে ই-মেইলের মাধ্যমে ওইদিন বিকাল ৬টা ১৩ মিনিটে পাওয়া গেছে। এসব তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে ডলার বিক্রির ডিল ডেট ৮ মে হলেও মূলত ডিলটি ৯ মে সম্পন্ন করা হয়েছে। অর্থাৎ ডিল ডেট আগের দিন দেখালেও মূলত অধিক মূল্যে ডলার ক্রয় করে তার পর কম মূল্যে বিক্রয় করা হয়েছে। একই ভ্যালু ডেটের ক্রয়-বিক্রয় ডিল ভিন্ন ভিন্ন বিনিময় হার ব্যবহার করার ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষতির পরিমাণ ৫৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা।

এতে আরও বলা হয়, ৮ মে তরিখের ডিল ডেটে সম্পাদনকৃত ২টি বিক্রয় ডিল ৯ তারিখ সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে প্রেরণ করার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে ফ্রন্ট অফিস শাখা থেকে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া ডিলের বিপরীতে (ডিলের ফরোয়ার্ডিং) সহকারী পরিচালক এবং চিফ ডিলার ব্যতীত ডিভিশন ১-এর সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত পরিচালক ও পরিচালকের কোনো স্বাক্ষর ছিল না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রিজার্ভ ম্যানেজমেন্ট অপারেশন ম্যানুয়াল অনুযায়ী, ফ্রন্ট অফিস কর্তৃক প্রস্তুতকৃত ডিলস্লিপ মিড অফিসে পাঠানোর নিয়ম থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা মানা হচ্ছে না। এছাড়াও, হেড অব ট্রেজারি বরাবর উপস্থাপিত ডিলের বিবরণীর অনুলিপি মিড অফিস ও ব্যাক অফিসে পাঠানোর বিধান থাকলেও গত ১ এপ্রিল থেকে তা আর পাঠানো হচ্ছে না। ফলে বিবরণী তৈরি ও প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রিজার্ভ ম্যানেজমেন্ট অপারেশন ম্যানুয়ালেরও ব্যত্যয় ঘটছে।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক মন্তব্য করতে রাজি হননি।