
ঢাকা: শিল্পকারখানা ও ক্যাপটিভে নতুন সংযোগে গ্যাসের দাম দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আমদানিকৃত এলএনজির খরচ যা পড়বে, সেই দর আদায় করতে চায় তারা। পুরোনো শিল্পকারখানায় লোড বাড়াতে চাইলেও গুনতে হবে দ্বিগুণ মূল্য। সরকারের এই সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোকে জানিয়ে দিয়েছে পেট্রোবাংলা।
বিতরণ কোম্পানিগুলো এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে প্রস্তাব পাঠাবে পেট্রোবাংলা। বিইআরসি এই প্রস্তাবের ওপর শুনানি করবে। এরপর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিইআরসি দাম বাড়ানোর বিষয়ে অনুমোদন দেবে অথবা বাতিল করবে।
এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে শিল্প সেক্টরে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেক্টরের বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এবং বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক সমিতির (বিজিএমইএ) শীর্ষ নেতারা।
তাদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে পুরো গার্মেন্ট ও সুতা সেক্টর পার্শ্ববর্তী দেশসহ অন্যান্য দেশে চলে যাবে। বেকার হয়ে যাবেন লাখ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী।
তারা বলছেন, এটি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশে আর কোনো শিল্প-কলকারখানা গড়ে উঠবে না। নতুন শিল্প টিকতে পারবে না। এই দাম দিয়ে গ্যাস কিনে কোনো শিল্পকারখানা লাভের মুখ দেখবে না। উলটো গ্যাস চুরি বেড়ে যাবে।
এতে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হবে বলে মনে করছেন তারা। নেতারা অবিলম্বে জ্বালানি বিভাগের এই সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।
জানা যায়, জ্বালানি বিভাগের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়লে গ্যাসের দাম বাড়বে। দাম কমে গেলে কমবে।
বর্তমানে শিল্পে ব্যবহৃত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দর নেওয়া হচ্ছে ৩০ টাকা। অপরদিকে ক্যাপটিভে ৩০.৭৫ টাকা। প্রস্তাবিত ফর্মুলা অনুমোদিত হলে প্রতিশ্রুত গ্রাহককে তার ব্যবহৃত অর্ধেক গ্যাসের জন্য ঘনমিটারপ্রতি প্রায় ৬০ টাকার মতো পড়তে পারে।
অর্ধেকের জন্য বিদ্যমান দর ৩০ টাকা হারে দিতে হবে। নতুন সংযোগের ক্ষেত্রে পুরোপুরি ৬০ টাকা হারে বিল দিতে হবে।
এলএনজি আমদানি মূল্য বলতে দাখিলকৃত বিলের পূর্ববর্তী তিন মাসের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এবং স্পট এলএনজি ক্রয় বাবদ মোট ব্যয় (এলএনজি ক্রয়মূল্য, রিগ্যাসিফিকেশন চার্জ, ভ্যাট, ট্যাক্স বিভিন্ন মার্জিনসহ সার্বিক মূল্য) গড় মূল্য বোঝাবে বলে জানানো হয়েছে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিলেট গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেড থেকে ১ টাকা দরে, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি থেকে ১.২৫ টাকা দরে, বাপেক্স থেকে ৪ টাকা দরে প্রতি ঘনফুট গ্যাস কেনা হয়।
এরপর বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন বাংলাদেশ ও টাল্লোর কাছ থেকে কেনা গ্যাসের সংমিশ্রণে ঘনমিটার গড় দর দাঁড়ায় ৬.০৭ টাকা।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে গড় মূল্য ছিল ২৪.৩৮ টাকা। আর গ্যাসের গড় বিক্রয় মূল্য ছিল ২২.৮৭ টাকা। এতে প্রতি ঘনমিটারে ১.৫৬ টাকা লোকসান হয়েছে পেট্রোবাংলার।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে স্পট মার্কেট থেকে আনা এলএনজির দাম পড়েছিল ৬৫ টাকা, যা আগস্টে (২০২৪) ৭১ টাকা দিয়ে কিনতে হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্বাহী আদেশে দাম বৃদ্ধি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাহী আদেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম নির্ধারণসংক্রান্ত আইন বাতিল করে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান একাধিক সভায় বলেছেন, এখন থেকে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করবে বিইআরসি। বিতরণ কোম্পানিগুলোর তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিইআরসিতে প্রস্তাব পাঠানো হবে।
শঙ্কা হচ্ছে, নতুন ফর্মুলায় শিল্পে অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করবে, বিদ্যমান শিল্প পাবে কম দামে। নতুন শিল্প বেশি দামে গ্যাস কিনে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। এতে নতুন শিল্প নিরুৎসাহিত হতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী নেতারা।