
সরকার নোবেলজয়ী ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংক আইনে বড় ধরনের সংশোধনী আনার পরিকল্পনা করছে। আইন সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো ও পরিচালনা পর্ষদে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। পরিকল্পনা অনুসারে, প্রতিষ্ঠানটিতে সরকারের অংশীদারত্ব ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। একই সঙ্গে, পরিচালনা পর্ষদে চেয়ারম্যানসহ তিনজন পরিচালক নিয়োগ দেওয়ার সরকারি ক্ষমতা কমিয়ে সরকারের জন্য দুইজন পরিচালক নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ রাখা হবে।
গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের আরও শক্তিশালী করা এবং ব্যাংক পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনতেই মূলত এই সংশোধনী আনা হচ্ছে। পাশাপাশি, ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনে সরকারি অংশের অনুপাত কমিয়ে ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ারের আনুপাতিক হার বাড়ানো হবে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ কর্তৃক গ্রামীণ ব্যাংক আইন, ২০১৩ সংশোধনের জন্য প্রস্তুত করা খসড়ায় এসব প্রস্তাব করা হয়েছে। আগামী ৯ মার্চ গ্রামীণ ব্যাংক আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়া পর্যালোচনাসভা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে, গত বছর ১৯ ডিসেম্বর ও ৩ ফেব্রুয়ারি আন্তঃমন্ত্রণালয় এবং অংশীজনদের নিয়ে সভা করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সভার সিদ্ধান্ত ও অর্থ উপদেষ্টার নির্দেশনা অনুসারে গ্রামীণ ব্যাংক আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
খসড়ায় প্রস্তাব করা হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড পরিচালকদের মধ্য থেকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন। বিদ্যমান আইনে ব্যাংকের বোর্ডে সরকারের নিযুক্ত পরিচালকদের মধ্য থেকে চেয়ারম্যান নিয়োগের বিধান আছে। এছাড়াও, এমডি নিয়োগে উপযুক্ত প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করে দেবে ব্যাংকের বোর্ড। সেখানে ৩ থেকে ৫ জন সদস্য থাকবেন। বিদ্যমান আইনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে আলাপ করে ৩ থেকে ৫ সদস্যের একটি সিলেকশন কমিটি গঠন করবেন।
চেয়ারম্যানের দায়িত্ব প্রসঙ্গে খসড়া আইনে বলা হয়েছে, যদি পদটি শূন্য হয়, কিংবা অনুপস্থিত, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে এমডি ছাড়া অন্য কোনো পরিচালক চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
বিদ্যমান আইনে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত চাকরি করার বিধান থাকলেও, সংশোধিত খসড়া আইনে বলা হয়েছে, বোর্ডের বিবেচনায় ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে ওই পদে চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে বোর্ড কর্তৃক সর্বোচ্চ ৬৫ বছর পর্যন্ত করা যাবে। এছাড়াও, ওই পদ তিন মাস শূন্য থাকলে বোর্ড নিজস্ব সিদ্ধান্তে নিয়োগ দিতে পারবে।
পদত্যাগ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান, এমডি অথবা অন্য কোনো পরিচালক বোর্ডের কাছে লিখিত পত্রযোগে পদত্যাগ করতে পারবেন। তবে, বোর্ড কর্তৃক গ্রহণ না হওয়া পর্যন্ত পদত্যাগ কার্যকর হবে না।
এছাড়াও, বর্তমান পর্ষদ বোর্ডে সরকারের নিযুক্ত তিনজন এবং ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডার থেকে নির্বাচিত ৯ জন পরিচালক আছেন। সংশোধিত আইনে সরকারের পরিচালক তিনজন থেকে কমিয়ে দুইজন এবং ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডার থেকে ৯ জন নির্বাচিত পরিচালকের সংখ্যা বাড়িয়ে ১০ জন করা হচ্ছে।
নির্বাচিত পরিচালকরা কার্যকাল থেকে প্রতি মেয়াদে তিন বছর এবং সরকারের নিযুক্ত প্রত্যেক পরিচালক সরকারের সন্তুষ্টি অনুযায়ী প্রতি মেয়াদে তিন বছরের বেশি থাকতে পারবেন না। তবে, কোনো পরিচালক ধারাবাহিকভাবে দুই মেয়াদের বেশি পরিচালক থাকতে পারবেন না। দুই মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী তিন বছর না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংকের পরিচালক পদে পুনর্নির্বাচন করতে পারবেন না।
খসড়ায় গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত তথ্যবহুল ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ ১৯৮৩-এর মাধ্যমে স্থাপিত গ্রামীণ ব্যাংক, যা ‘গ্রামীণ ব্যাংক প্রকল্প’ থেকে উদ্ভূত, এমনভাবে বহাল থাকবে যেন তা এ আইনের অধীনে স্থাপিত হয়েছে।
খসড়ায় গ্রামীণ ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৩০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের বা সরকার পরিচালিত বা নিয়ন্ত্রিত একক বা যৌথভাবে মোট শেয়ারের পরিমাণ ২৫ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আর, ৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৮৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক করা হয়েছে ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের (শেয়ারহোল্ডার)। ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের ক্রমান্বয়ে পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর পাশাপাশি পরিচালনা বোর্ড কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করলে পরিশোধিত শেয়ার মূলধনের অনুপাতে দেওয়া হবে।