শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

ভর্তুকি ছাঁটাই, দাম বৃদ্ধি: ঋণের জন্য তেতো ওষুধ গিলতে হবে বাংলাদেশকে?

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১ এপ্রিল ২০২৫ | ৯:৫৯ পূর্বাহ্ন


আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি পাওয়া নিয়ে প্রথমবারের মতো হোঁচট খেয়েছে বাংলাদেশ। তবে আগামী জুনে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি একসঙ্গে পাওয়ার আশা করছে সরকার। এ লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশকে ভর্তুকি কমানো, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো এবং মুদ্রা বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার মতো কঠিন শর্ত পূরণের পথে হাঁটতে হচ্ছে।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ঋণ কর্মসূচি শুরুর পর বাংলাদেশ তিন কিস্তিতে প্রায় ২৩১ কোটি ডলার পেয়েছে। বাকি রয়েছে প্রায় ২৩৯ কোটি ডলার। চতুর্থ কিস্তির অর্থ ছাড়ের আগে শর্ত পূরণের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় এই বিপত্তি দেখা দেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুটি কিস্তির অর্থ একসঙ্গে পেতে বাংলাদেশকে মোট তিনটি প্রধান বাধা অতিক্রম করতে হবে:

১. মুদ্রা বিনিময় হার সম্পূর্ণরূপে বাজারভিত্তিক করা।

২. মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ০.৫ শতাংশ সমপরিমাণ বাড়তি রাজস্ব আদায় করা।

৩. জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব প্রশাসন বিভাগকে আলাদা করা।

সরকারের পক্ষ থেকে আইএমএফকে এসব শর্ত পূরণের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবায়ন কিছুটা ধীরগতির। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এনবিআরের কাঠামো পৃথকীকরণের পদক্ষেপ নেওয়া হলেও মুদ্রা বিনিময় হার এবং রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

বর্তমানে ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতিতে ডলারের বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, যা আপাতত ১২২ টাকার কাছাকাছি স্থিতিশীল রয়েছে। তবে আইএমএফ চায় পুরোপুরি বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা। এ বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতির বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এখনই বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, যা পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, রেকর্ড প্রবাসী আয় ও ভালো রপ্তানি প্রবৃদ্ধির এই সময়ে বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়াই যৌক্তিক। তিনি আরও উল্লেখ করেন, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকা বাড়তি আদায় প্রয়োজন, কিন্তু সে অনুযায়ী উদ্যোগ কম। তবে এনবিআর পৃথকীকরণের কাজটি এগিয়ে চলেছে বলে তিনি মনে করেন, যদিও কর অব্যাহতি কমানোর ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের দিক থেকে বাধার আশঙ্কা রয়েছে।

শর্ত পূরণের অংশ হিসেবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপ আসতে পারে আইএমএফ থেকে, যা বর্তমান মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করেন জাহিদ হোসেন। তিনি উভয় পক্ষকে কিছুটা ছাড় দিয়ে ঋণ কর্মসূচিটি সচল রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আইএমএফ প্রতিনিধি দলের ঢাকা সফর

ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড়ের আগে শর্ত পূরণের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল আগামী ৫ এপ্রিল ঢাকায় আসছে। দলটি ৬ এপ্রিল থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত অর্থ বিভাগ, এনবিআর, বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে বৈঠক করবে। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গেও প্রতিনিধি দলের একাধিক বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। সফর শেষে ১৭ এপ্রিল তারা একটি প্রেস ব্রিফিং করবেন।

অর্থ উপদেষ্টা জানিয়েছেন, বাজেট সহায়তার জন্য আইএমএফের এই ঋণ অত্যন্ত জরুরি। তাই উভয় পক্ষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দুটি কিস্তি একসঙ্গে জুনে ছাড় করার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

যদি শর্ত পূরণে বাংলাদেশ ও আইএমএফ নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকে, তবে বাকি কিস্তিগুলো আটকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেক্ষেত্রে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোও বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে রক্ষণশীল হতে পারে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য নতুন জটিলতা সৃষ্টি করবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।