
প্রায় আট বছর ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন নিয়ে আবারও আশার আলো দেখা দিয়েছে। মিয়ানমারের জান্তা সরকার সম্প্রতি জানিয়েছে, বাংলাদেশের দেওয়া আট লাখ রোহিঙ্গার তালিকা থেকে এক লাখ ৮০ হাজার জনকে তারা পরিচয় যাচাই শেষে প্রত্যাবাসনের জন্য যোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে মিয়ানমারের উপপ্রধানমন্ত্রী উ-থান শোয়ে এবং বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি খলিলুর রহমানের বৈঠকে এই বার্তা দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা এই সংকট সমাধানে মিয়ানমারের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ। তবে, অতীতের দুটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা এবং মিয়ানমারের পরিবর্তিত ও জটিল অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির (এএ) ক্রমবর্ধমান প্রভাব, এই নতুন প্রতিশ্রুতি নিয়েও জন্ম দিয়েছে নানা প্রশ্ন ও সংশয়।
মিয়ানমারের জান্তা সরকার জানিয়েছে, বাংলাদেশের দেওয়া তালিকা থেকে এক লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে তারা ফেরত নিতে প্রস্তুত। এছাড়া আরও ৭০ হাজার রোহিঙ্গার নাম ও ছবি চূড়ান্ত যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে এবং বাকি সাড়ে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গার যাচাই প্রক্রিয়াও দ্রুত সম্পন্ন করার আশ্বাস দিয়েছে নেপিদো। এর আগে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে দুই দফায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও রাখাইনের পরিবেশ নিয়ে শঙ্কার কারণে তা ব্যর্থ হয়। স্থানীয় কূটনীতিকদের মতে, মিয়ানমার সরকার অতীতে বারবার আশ্বাস দিলেও তাদের আন্তরিকতার অভাব এবং ‘কূটকৌশলের’ কারণে প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মূল কেন্দ্র রাখাইন রাজ্যের বেশিরভাগ এলাকা বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। সেখানে জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত সীমিত। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে, জান্তা সরকার কোথায় এবং কীভাবে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করাবে? বিশ্লেষকরা বলছেন, রাখাইনের মংডু, বুথিডং, রাথিডংয়ের মতো রোহিঙ্গা অধ্যুষিত শহরগুলো যেখানে জান্তার নিয়ন্ত্রণেই নেই, সেখানে তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, “মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের পরিচয় যাচাইয়ের পর যে তালিকা দিয়েছে, সেটি ইতিবাচক। তবে, এটি বাস্তবায়ন করতে হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পর্কে আরাকান আর্মির মনোভাব বোঝাটা জরুরি। রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা এখন বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। জান্তা সরকার এখানে বেশ দুর্বল। আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে রাজি হলে ওই যাচাই তালিকা বাস্তবায়নযোগ্য হবে।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এখন আর শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়। রাখাইনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর প্রত্যাবাসন শুরু করতে হলে মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মিকেও আলোচনার টেবিলে আনতে হবে। এছাড়া, মিয়ানমারের ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততাও জরুরি।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও অতীতে বাংলাদেশ সফরের সময় রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আরাকান আর্মির সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশ সরকার পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ প্রতিনিধি খলিলুর রহমান নিশ্চিত করেছেন যে, বাংলাদেশ সরকার সীমান্ত সুরক্ষা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের স্বার্থে আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তিনি বলেন, “দেশের সীমান্ত সুরক্ষা এবং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের স্বার্থে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ দখল করে থাকা আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে ঢাকা।”
এই যোগাযোগের খবরের পরই জান্তা সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যাবাসনের নতুন বার্তা আসায় কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, এটি জান্তার কোনো নতুন কৌশল কিনা, অথবা এর পেছনে তৃতীয় কোনো পক্ষের (সম্ভবত চীন) ভূমিকা রয়েছে কিনা। উল্লেখ্য, মিয়ানমারের ওপর চীনের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে এবং দেশটি রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিরোধী।
নতুন প্রতিশ্রুতি নিয়ে সংশয় থাকলেও বাংলাদেশ হাল ছাড়তে নারাজ। খলিলুর রহমান আশা প্রকাশ করে বলেন, “আমরা মনে করি, এক লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত আমরা করতে পারব, তবে সময় লাগবে। এটা তো কালই হচ্ছে না, তবে দ্রুত সময়ে যাতে হয় সেই প্রচেষ্টা থাকবে। প্রধান উপদেষ্টাও বলেছেন, আগামী ইফতার (আগামী বছরের রমজান) তারা দেশে গিয়ে করবে। এটাই আমাদের লক্ষ্য।” তিনি আরও জানান, আরাকান আর্মির সঙ্গেও আলোচনা শুরু হয়েছে এবং রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া তাদেরও একটি নীতিগত অবস্থান।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখের বেশি, এর বাইরে আরও অন্তত দুই লাখ রয়েছে। গত কয়েক মাসেই নতুন করে প্রায় ৮০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং ক্যাম্পগুলোতে প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার শিশু জন্ম নিচ্ছে। একদিকে প্রত্যাবাসনের চেষ্টা, অন্যদিকে নতুন অনুপ্রবেশ ও ক্যাম্পে জনসংখ্যা বৃদ্ধি – এই উভয় সংকট বাংলাদেশকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
মিয়ানমারের নতুন প্রতিশ্রুতি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কিছুটা আশার সঞ্চার করলেও রাখাইনের জটিল পরিস্থিতি, বিশেষ করে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ এবং জান্তা সরকারের দুর্বল অবস্থান বিষয়টিকে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে। অতীতের ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা এবং মিয়ানমার সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব এই প্রক্রিয়া নিয়ে সংশয় জিইয়ে রেখেছে। সফল প্রত্যাবাসনের জন্য শুধু দ্বিপাক্ষিক আলোচনা যথেষ্ট নয়, বরং আরাকান আর্মি, চীন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়সহ সকল পক্ষকে যুক্ত করে একটি সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। আগামী দিনগুলোই বলে দেবে জান্তা সরকারের এই প্রতিশ্রুতি নিছক কোনো কৌশল নাকি আন্তরিক উদ্যোগ।