রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

শাপলা চত্বরের এক যুগ: বিচার ও মামলা প্রত্যাহারের দাবি, চলছে তদন্তও

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৫ মে ২০২৫ | ৩:১২ অপরাহ্ন


ঢাকার মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও হতাহতের ঘটনার এক যুগ পূর্ণ হলো আজ। ২০১৩ সালের ৫ মে রাতের ওই অভিযানে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক এখনও কাটেনি, ঝুলে আছে সে সময় দায়ের হওয়া কয়েকশ মামলার ভবিষ্যৎ, একই সঙ্গে চলছে ওই রাতের ঘটনা তদন্তের প্রক্রিয়াও।

হেফাজতে ইসলাম ওই ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়ে বরাবরই নিহতের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি বলে দাবি করে আসছে। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ তাদের এক প্রতিবেদনে ৬১ জনের নাম প্রকাশ করলেও সরকারিভাবে ৫৮ জনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছিল। তবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরবর্তী সময়ে মৃত্যুবরণকারীদের হিসাবে ধরা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

হেফাজতের নেতারা বলছেন, তৎকালীন শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকারের শীর্ষ মহলের নির্দেশে ওই অভিযান পরিচালিত হয়েছিল এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিচার চান তারা। সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক মাওলানা আফসার মাহমুদ বলেছেন, “দেশের নাগরিক হিসেবে এটার বিচার পাওয়া আমাদের অধিকার। আমরা এখন আমাদের ওপর হওয়া জুলুমের ইনসাফভিত্তিক বিচার চাই।”

অন্যদিকে, ওই রাতের ঘটনা এবং পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে হেফাজতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া তিন শতাধিক মামলা প্রত্যাহারের দাবি দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত মহাসমাবেশ থেকে আগামী দুই মাসের মধ্যে সব মামলা প্রত্যাহারের আল্টিমেটাম দিয়েছে সংগঠনটি।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী জানিয়েছেন, হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হকের করা আবেদনের প্রেক্ষিতে ঢাকার ৪৫টি মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং বাকি ১৫টির সুপারিশ পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। তবে কবে নাগাদ মামলাগুলো চূড়ান্তভাবে প্রত্যাহার হবে তা নিশ্চিত নয়।

পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে ইতিবাচক এবং সে লক্ষ্যে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।

২০১৩ সালের ৫ মে’র অভিযানে সাড়ে সাত হাজার পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি সদস্য অংশ নিয়েছিল বলে জানা যায়। অভিযোগ রয়েছে, রাতের অন্ধকারে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয় এবং এতে দেড় লক্ষাধিক বিভিন্ন প্রকার গোলাবারুদ ব্যবহৃত হয়। তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ এবং র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার তৎকালীন প্রধান লে. কর্নেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে এই অভিযানের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে মুখ্য ভূমিকা পালনের অভিযোগ উঠেছে।

এই ঘটনায় হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও (আইসিটি) অভিযোগ দায়ের হয়েছে। হেফাজতের পক্ষ থেকে ৫০ জনের বিরুদ্ধে এবং আলাদাভাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি জানান, ট্রাইব্যুনাল অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে এবং অভিযানের পরিকল্পনা, ফোর্সের অবস্থান ও কর্মকর্তাদের তৎপরতা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করছে।

হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী অবিলম্বে মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বলেন, “আমরা ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিরুদ্ধে লড়াই করে রক্ত দিয়ে এ সরকার প্রতিষ্ঠা করেছি। তাই অবিলম্বে আমাদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোর প্রত্যাহার চাই।”

১২ বছর পরও শাপলা চত্বরের ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনীতি এবং মানবাধিকার আলোচনায় একটি স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে, যার সম্পূর্ণ সুরাহা এখনও হয়নি।