
মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য রাখাইনে আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ এবং জান্তা বাহিনীর পিছু হটার প্রেক্ষাপটে আবারও জোরালো হয়েছে পুরনো এক গুঞ্জন— যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মিয়ানমারে চীনের প্রভাব খর্ব করতে একটি ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ শুরু করতে যাচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক, থিংকট্যাংক এবং মিয়ানমার বিশেষজ্ঞরা এমন দাবিকে সুস্পষ্ট তথ্যপ্রমাণহীন, বাস্তব ভিত্তিহীন এবং অতিশয় কল্পনাপ্রসূত বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁদের মতে, এই গুঞ্জনের নেপথ্যে রয়েছে স্বল্পপরিচিত ওয়েব পোর্টাল, সোশ্যাল মিডিয়া এবং কিছু কথিত নিরাপত্তা বিশ্লেষকের অতিরঞ্জিত অনুমান ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা।
রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৯০ ভাগ এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে আসার সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এই ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ তত্ত্ব নতুন করে সামনে আসে। বিশেষত আরাকান আর্মির সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতা এবং রাখাইনে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে একটি ‘মানবিক করিডোর’ তৈরির আলোচনাকে কেন্দ্র করে এই গুঞ্জন আরও ডালপালা মেলেছে। উল্লেখ্য, এই সংকটের সমান্তরালে গত বছরের ৫ আগস্ট গণ-আন্দোলনের মুখে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন, যা এই অঞ্চলের সামগ্রিক পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির অংশ।
বিভিন্ন অখ্যাত অনলাইন মাধ্যম, ইউটিউব চ্যানেল এবং কিছু কূটনৈতিক ব্লগ প্রচার করছে যে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের মাধ্যমে মিয়ানমারে হস্তক্ষেপ করে চীনের কৌশলগত করিডোর বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে। এসব বর্ণনায় বাংলাদেশ, তুরস্ক, পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা এবং রোহিঙ্গা গোষ্ঠীগুলোকে জড়িয়ে একটি আঞ্চলিক ষড়যন্ত্রের চিত্র আঁকা হচ্ছে। এমনকি কক্সবাজারে তুরস্কের ড্রোন ব্যবহার করে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে হামলা চালানোর জন্য একটি ‘ড্রোন ঘাঁটি’ তৈরি করা হচ্ছে এবং হাজার হাজার ব্রিটিশ ও আমেরিকান ভাড়াটে যোদ্ধা মিজোরাম হয়ে মিয়ানমারে প্রবেশ করেছে—এমন অবাস্তব দাবিও করা হচ্ছে। সবচেয়ে বিতর্কিত দাবিটি হলো, যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমার সীমান্তের কাছে চীনের ইউনান থেকে কিয়াউকপিউ পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ন্ত্রণের জন্য এক বা একাধিক ‘স্বাধীন রাষ্ট্র’ গঠনে মদদ দিচ্ছে।
তবে এসব দাবির সপক্ষে কোনো ধরনের প্রামাণ্য দলিল বা নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র উপস্থাপন করা হয়নি। বৈশ্বিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিষয়ক থিংকট্যাংক লোয়ি ইনস্টিটিউটের পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মিয়ানমারে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো পশ্চিমা দেশ প্রক্সি যুদ্ধ চালাচ্ছে—এর পক্ষে কোনো তথ্যপ্রমাণ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। লোয়ি ইনস্টিটিউট এই গুঞ্জনগুলোকে “অতিশয় কল্পনাপ্রসূত ও বিশ্বাসযোগ্য নয়” বলে মন্তব্য করেছে। তাদের মতে, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর পশ্চিমা দেশগুলো মিয়ানমারের বিরোধী পক্ষকে মানবিক সহায়তা এবং ‘প্রাণঘাতী নয়’ এমন কিছু সরঞ্জাম দিলেও সামরিক অস্ত্র বা রসদ সরবরাহের কোনো প্রমাণ নেই। এমন জটিল আঞ্চলিক সামরিক হস্তক্ষেপ গোপনে বাস্তবায়ন করা এবং তা দীর্ঘদিন গোপন রাখা প্রায় অসম্ভব।
ডেমোক্রেটিক ভয়েস অব বার্মা কিছু দাবির বিপরীতে সঠিক তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করলেও মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এসব তত্ত্ব তেমন গুরুত্ব পায়নি। গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির গ্রিফিথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের প্রফেসর ও মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু সেলথের মতে, মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরে অবাধ তথ্যপ্রবাহের অভাব থাকায় এটি গোপন সংযোগ ও গুজবের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তাঁর মতে, “কিছু খবরভিত্তিক ব্লগ ও কথিত গণমাধ্যমের খবর, প্রকৃত তথ্যের অভাব এবং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে রাজনৈতিক ‘ন্যারেটিভ’ তৈরির প্রতিযোগিতা গুজবের পেছনে জ্বালানির কাজ করছে।” তিনি আরও যোগ করেন, একটি পক্ষ বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস বাড়িয়ে অঞ্চলকে আরও জটিল করে তুলতে এই গুজবকে শক্তিশালী করতে চাইছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (সিএফআর) বলছে, মিয়ানমারের চলমান সংকট মূলত সেনাশাসিত জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ যুদ্ধ। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পশ্চিমা দেশগুলো এই সংকট মোকাবেলায় মূলত অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপের ওপরই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সিএফআর আরও মন্তব্য করেছে যে, মিয়ানমারে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে বরং অকার্যকারিতা দেখা গেছে, যা প্রকারান্তরে মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বৃদ্ধিতেই সহায়ক হয়েছে। এছাড়া, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘বিদেশী যুদ্ধ এড়িয়ে চলা’র নীতিগত অবস্থানের কারণেও যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক সহায়তা প্রদানের সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে, মিয়ানমারের জটিল পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া ‘প্রক্সি যুদ্ধ’র তত্ত্বটি জোরালো তথ্যপ্রমাণ এবং বাস্তবতার নিরিখে এখনো পর্যন্ত একটি ভিত্তিহীন গুঞ্জন হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।