
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর যে ঐক্যের বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল, তা ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে। আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও সমমনা দলগুলোর মধ্যে প্রাথমিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক এখন অনেকটাই পরিবর্তিত। ছাত্ররা ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)’ নামে নতুন দল গঠন করায় এবং বিভিন্ন ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেওয়ায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং দেশজুড়ে বিভিন্ন দাবিতে চলমান অসংখ্য প্রতিবাদ কর্মসূচি, যা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ছাত্রদের সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক বেশ আশাব্যঞ্জক ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে সম্পর্কে চিড় ধরেছে। এনসিপি, বিএনপি ও জামায়াত—এই তিন শক্তি এখন যেন তিনটি ভিন্ন পথে হাঁটছে। এর মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় নির্বাচনের কোনো স্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা না করায় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে, বিশেষত বিএনপি ও এর মিত্রদের মাঝে, নির্বাচন নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রাজপথের উত্তাপ ও নানামুখী সংকট
অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এমনকি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও যৌক্তিক-অযৌক্তিক নানা দাবিতে রাজপথে সক্রিয়। লাগাতার আন্দোলন, অবরোধ, কলম বিরতি কর্মসূচিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর ওপর সীমান্ত পরিস্থিতি, ভারতের কথিত ‘পুশইন’, মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও মানবিক করিডর ইস্যু, এবং চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেওয়ার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত ও গুজবে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে।
সম্প্রতি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের পর জামায়াতে ইসলামী ‘জুলাই সনদ’ ঘোষণায় গণভোটের দাবি তুললে তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে বিএনপিতে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম ছাত্রনেতা ও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টা ফেসবুকে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের সহযোগীদের ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে মন্তব্য করলে জামায়াতে ইসলামী তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়।
এদিকে, বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোও বিভিন্ন দাবিতে রাজপথে সক্রিয়। আদালতের রায় অনুযায়ী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনকে শপথ পড়ানো ও দায়িত্ব হস্তান্তর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যার বিচার দাবিতে তারা জোরালো কর্মসূচি পালন করছে। নবগঠিত এনসিপিও বসে নেই; নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবিতে তারাও আন্দোলনে নেমেছে এবং ইসি পুনর্গঠন ছাড়া নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের চোখে বর্তমান পরিস্থিতি
দেশের এই জটিল পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুবউল্লাহ্ বলেন, “আপাতদৃষ্টিতে দেশে যা ঘটছে, তাতে বিভেদ ও বিভাজন বাড়ছে বলেই মনে হয়। এটি দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়। এ ক্রান্তিকালে সব রাজনৈতিক দল, অন্তর্বর্তী সরকার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রাজনৈতিক মতৈক্য অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, এই বিভেদ ও বিভ্রান্তির সুযোগে ফ্যাসিবাদী শক্তি ও আধিপত্যবাদীরা জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের অর্জন নস্যাৎ করে দিতে পারে।”
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক আখ্যা দিয়ে বলেন, “ঘটনাপ্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে নির্বাচন ঝুলে যাচ্ছে। আমরা আশা করেছিলাম নিয়মতান্ত্রিকভাবে রাজনৈতিক সরকারের দিকে দেশ এগিয়ে যাবে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো ঐকমত্য দেখছি না। সরকারও ঢিলেঢালা কাজ করছে, রোডম্যাপ দিচ্ছে না।” এনসিপিকে “কিংস পার্টি” হিসেবে অভিহিত করে তিনি ছাত্রদের এমন দল গঠনকে ভুল সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেন। তার আশঙ্কা, দেশ গৃহযুদ্ধের দিকেও চলে যেতে পারে।
কূটনীতিক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির সীমান্ত ও আন্তর্জাতিক ইস্যু প্রসঙ্গে বলেন, “রোহিঙ্গা সমস্যা, করিডর ইস্যু, ভারতীয় নাগরিকের পুশইন—নানা দিকে আমাদের চ্যালেঞ্জ বাড়ছে।”
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া দেশি-বিদেশি কোনো বিনিয়োগই আসবে না। বর্তমানে অর্থনীতির আকাশে ঘন কালো মেঘ। সবার আগে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন।” তিনি বিভিন্ন দাবিতে রাস্তা অবরোধের মতো কর্মসূচিরও সমালোচনা করেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত অটলতার অভাব এবং বিভিন্ন ইস্যুতে (যেমন মেয়র নিয়োগ) অসামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “সরকার কী করতে চাচ্ছে, তা পরিষ্কার নয়। মানুষকে আস্থায় ফেরাতে হবে। নির্বাচনসহ সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের স্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করলে রাজনৈতিক দল ও জনগণের মধ্যে স্বস্তি ফিরতে পারে।”
দেশের মানুষ গত সাড়ে ১৫ বছর ধরে তাদের ভোটাধিকার সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারেনি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সেই অধিকার ফিরে পাওয়ার যে স্বপ্ন তারা দেখেছিল, বর্তমান উত্তপ্ত ও অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তা বাস্তবায়ন নিয়ে গভীর শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সকল পক্ষের মধ্যে দ্রুততম সময়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা এবং একটি স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষক মহল।