
প্রায় এক দশক আগে নিজের ‘গুম’ হওয়ার ঘটনায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দায়ের করেছেন। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ সাতজনকে এই ঘটনায় আসামি করা হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। ভারত থেকে দেশে ফেরার প্রায় ১০ মাস পর মঙ্গলবার (৩ জুন) ট্রাইব্যুনালে এই অভিযোগ দায়ের করে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমি আন্তর্জাতিক আদালতে আমার নিজের মামলাটি রেকর্ড করালাম।”
সালাহউদ্দিন আহমেদ উল্লেখ করেন, অভিযুক্ত হিসেবে প্রাথমিকভাবে সাতজনকে চিহ্নিত করা হলেও তদন্ত পর্যায়ে আরও অনেকের নাম বেরিয়ে আসবে বলে তিনি মনে করেন। দেশে ফেরার পর দেরিতে এই অভিযোগ দায়ের করার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “প্রত্যেক দিন আমার রাজনৈতিক ও সংস্কার কার্যক্রম যদি দেখেন… এগুলো নিয়ে আমার এত ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়েছে যে নিজের জন্য আলাদাভাবে সময় বের করতে পারিনি এতদিন। আর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা, আইনজীবীদের সাথে আলাপ করে ভালোমতো একটা ড্রাফট রেডি করে জমা দেওয়া, যাতে করে এই মামলাটা আমরা প্রমাণ করতে পারি, সেটার জন্য একটু সময় লাগে। তারপরও আমার কিছুদিন বিলম্ব হয়েছে। এটার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি।”
গত বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় দেড় দশকের শাসনের অবসানের ছয় দিন পর ভারত থেকে দেশে ফিরেছিলেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাতে ঢাকার উত্তরার একটি বাড়ি থেকে তাকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে তার স্ত্রী হাসিনা আহমেদ অভিযোগ করেছিলেন। এর ৬৩ দিন পর, ১১ মে, ভারতের মেঘালয়ের শিলংয়ে উদভ্রান্ত অবস্থায় তাকে খুঁজে পাওয়ার কথা জানায় সেখানকার পুলিশ। উদ্ধারের পর তিনি নিজেকে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন হিসেবে পরিচয় দিয়ে জানান, তাকে উত্তরা থেকে অপহরণ করা হয়েছিল এবং কীভাবে তিনি শিলং পৌঁছালেন তা তার মনে নেই।
ওই সময় বিএনপি দাবি করেছিল, সালাহউদ্দিনকে ধরে নিয়ে সীমান্তে পার করে দিয়েছে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার, যদিও আওয়ামী লীগ নেতারা তখন বলছিলেন সালাহউদ্দিন নিজেই আত্মগোপন করেছেন। ভারতে তার কোনো বৈধ কাগজপত্র না থাকায় মেঘালয় পুলিশ তার বিরুদ্ধে ফরেনার্স অ্যাক্টে মামলা দায়ের করে। সেই মামলায় ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর তিনি খালাস পেলেও ভারত সরকার এর বিরুদ্ধে আপিল করে। অবশেষে ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শিলং জজ কোর্ট তাকে চূড়ান্তভাবে খালাস দেয়। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তিনি আর দেশে ফেরার চেষ্টা করেননি।
এক সময়ের সরকারি কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন আহমেদ ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তার সহকারী একান্ত সচিব ছিলেন। পরে চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে ২০০১ সালে কক্সবাজার থেকে বিএনপির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০০১ সালের খালেদা জিয়ার সরকারে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব পদেও ছিলেন। ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচন বিএনপি বয়কট করার পর ২০১৫ সালে যখন সরকার পতনের আন্দোলন চলছিল, তখন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গ্রেপ্তার হওয়ার পর সালাহউদ্দিন আহমেদ অজ্ঞাত স্থান থেকে দলের পক্ষে বিবৃতি পাঠাচ্ছিলেন, সে সময়ই তিনি ‘গুম’ হন।
তার স্ত্রী হাসিনা আহমেদ স্বামীর সন্ধানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ চেয়ে স্মারকলিপিও দিয়েছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল। র্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশ তখন সালাহউদ্দিনের সন্ধানে তৎপরতার কথা জানালেও তার কোনো হদিস করতে পারেনি।