রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

তহবিল সংকটে রোহিঙ্গা শিবির, শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবা বন্ধের মুখে

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৩০ জুন ২০২৫ | ১২:৫৬ অপরাহ্ন


আন্তর্জাতিক তহবিলের অভাবে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরগুলোতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ অতি জরুরি সেবাগুলো মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম এই রাষ্ট্রবিহীন জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একদিকে ইউনিসেফের মতো সংস্থা অর্থ সংকটে শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত করছে, অন্যদিকে প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়াও মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে আরও জটিল হয়ে পড়েছে।

জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে যে ৪৪ লাখ রাষ্ট্রবিহীন নাগরিক রয়েছেন, তাদের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে বসবাস করছেন।

এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অর্থ বরাদ্দ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী গোয়েন লুইস বলেন, “রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট এখনো একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ। ২০২৫ সালে এই খাতে অর্থায়ন উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে এবং এরই মধ্যে তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।”

তহবিল সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে শিক্ষাখাতে। সম্প্রতি ইউনিসেফ তাদের সহায়তায় পরিচালিত অনেকগুলো শিক্ষাকেন্দ্রের কার্যক্রম স্থগিত করেছে, যার ফলে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা শিশুর পড়াশোনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই সিদ্ধান্তের কারণে প্রায় সাড়ে ১২শ বাংলাদেশি শিক্ষক চাকরিচ্যুত হয়েছেন, যারা পরবর্তীতে প্রতিবাদ কর্মসূচিও পালন করেন।

বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মানবিক কর্মী ইয়াসিন আবদুমোনাব বলেন, “তহবিল সংকটের কারণে স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। জীবিকার উৎস না থাকলে মানুষের মধ্যে অপহরণ, চাঁদাবাজিসহ অবৈধ কার্যকলাপের প্রবণতা বাড়তে পারে।”

এদিকে, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের সুযোগও আরও জটিল হয়ে উঠেছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বেশিরভাগ এখন দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) নিয়ন্ত্রণে। ফলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় মিয়ানমারের জান্তা সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সম্পৃক্ততাও জরুরি হয়ে পড়েছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে একটি অচলাবস্থার মধ্যে ফেলেছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য আমাদের নতুন কোনো প্রক্রিয়ায় যেতে হবে, যেটাতে মিয়ানমার সরকারও তাদের নিজেদের লাভ দেখতে পায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে আরাকান আর্মি বা জান্তা সরকার কেউই তাদের ফিরিয়ে নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।”

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করা। যতদিন তা না হচ্ছে, ততদিন তাদের জন্য ন্যূনতম সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করতে আমরা সচেষ্ট রয়েছি। আমরা আশা করি, আরাকান আর্মি তাদের শাসন ব্যবস্থায় রোহিঙ্গাদের অন্তর্ভুক্ত করে প্রত্যাবাসনের সুযোগ করে দেবে।”

তিনি আরও জানান, রোহিঙ্গাদের অবস্থানের কারণে স্থানীয় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীও নানা সংকটে রয়েছে। অনেক রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে এসে কম মজুরিতে কাজ করায় স্থানীয় শ্রমিকরা কাজ হারাচ্ছেন, যা সামাজিক অসন্তোষ তৈরি করছে। এছাড়া মাদক চোরাচালানের মতো অপরাধেও রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।