
চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির খবর প্রকাশ করতে গিয়ে খুন, হামলা, মামলাসহ চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছেন বাংলাদেশের সাংবাদিকরা। প্রভাবশালী সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে সত্য তুলে ধরতে গিয়েও পদে পদে বাধা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তারা। সবশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে গাজীপুরে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা এই পেশার নিরাপত্তাহীনতাকে আবারও সামনে এনেছে, যা নিয়ে দেশজুড়ে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে গত এক বছরে দেশে অন্তত ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। এই সময়ে হামলায় নিহত হয়েছেন তিনজন সাংবাদিক। তবে টিআইবির প্রতিবেদন প্রকাশের দিনই গাজীপুরে তুহিনকে হত্যা করা হলে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় চারজনে। টিআইবি বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও গণমাধ্যমের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি।
গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় বৃহস্পতিবার রাতে সন্ত্রাসীদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন ‘দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ’ এর স্টাফ রিপোর্টার আসাদুজ্জামান তুহিন। হত্যাকাণ্ডের কিছুক্ষণ আগে তিনি চাঁদাবাজদের নিয়ে ফেসবুকে একটি লাইভ প্রতিবেদন করেন। ছেলের এমন মৃত্যুতে তার ৮০ বছর বয়সী বাবা মো. জামাল কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘কী অপরাধ ছিল আমার ছেলের? তোমরা আমার ছেলেকে এনে দাও।’ এই হত্যাকাণ্ডের আগের দিনই গাজীপুরে সাংবাদিক আনোয়ার হোসেনকে পিটিয়ে গুরুতর জখম করে সন্ত্রাসীরা।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই দেশে সাংবাদিকদের ওপর ২৭৪টি হামলার ঘটনায় ১২৬ জন আহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএস ও অধিকারের প্রতিবেদন বলছে, সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত করা, হুমকি দেওয়া এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন আইনে মামলা দিয়ে হয়রানি করার ঘটনাও বেড়েছে। গত মার্চে রাজধানীতে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে এক নারী সাংবাদিকের দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
সন্ত্রাসী হামলার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক চাপেরও মুখোমুখি হচ্ছেন সাংবাদিকরা। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) এক উপপরিদর্শকের ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন করায় সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক লিখন রাজকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করে পিবিআই। যদিও ওই প্রতিবেদনের পর অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। পিবিআইয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিবেদনের তথ্যের উৎস যাচাইয়ের জন্য সাংবাদিককে ডাকা হয়েছে।
সাংবাদিকদের ওপর ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব)। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, গণ-অভ্যুত্থানের পর একটি গণতান্ত্রিক সমাজে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ হয়নি।
সাংবাদিক তুহিন হত্যাকাণ্ডকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের অধিকারের ওপর সরাসরি হামলা বলে উল্লেখ করেছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (স্পেশাল ক্রাইম) মো. আশিক সাঈদ বলেন, “আমরা অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। গাজীপুরে সাংবাদিক হত্যার ঘটনার তদন্ত চলছে এবং জড়িতদের অবশ্যই গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে।”