মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২

ফটিকছড়িতে কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা: ‘এক গ্লাস পানিও চাইল, দিতে পারিনি’

‘আমার ছেলের খুনিদের ফাঁসি না হলে বিষ খাব’–একমাত্র সন্তানহারা মায়ের আর্তনাদ।
এস এম আক্কাছ | প্রকাশিতঃ ২৩ অগাস্ট ২০২৫ | ৫:১৩ অপরাহ্ন


একমাত্র ছেলে মাহিনকে হারিয়ে মা খতিজা আকতার নির্বাক, পাথর হয়ে গেছেন। বাড়ির উঠানে স্বজনদের ভিড় আর কান্নার রোল, কিন্তু তাঁর চোখে এক ফোঁটা জলও নেই। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। কিছুক্ষণ পরপরই মূর্ছা যাচ্ছেন। সান্ত্বনার সব ভাষাই যেন তাঁর কাছে অর্থহীন। শুক্রবার চুরির অপবাদে তাঁর ১৫ বছর বয়সী ছেলে মো. রিহান উদ্দিন ওরফে মাহিনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। শনিবার সকালে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর গ্রামে গিয়ে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্যই দেখা গেল।

মাহিনের বাবা মুহাম্মদ লোকমান বাড়ির পাশেই একটি মুদির দোকান চালান। একে একে তিন সন্তানকে হারানোর পর মাহিনই ছিল তাঁদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘অনেক অপেক্ষার পর ওকে পেয়েছিলাম। ছেলেটা সেভেনে পড়ত, আমাকে কাজে সাহায্য করত। আমাদের সব স্বপ্ন তো ওকে ঘিরেই ছিল। এখন আমার সব শেষ হয়ে গেল।’

এই পাশবিক ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার, কাঞ্চননগর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের চেঙ্গের ব্রিজ এলাকায়। এ ঘটনায় মাহিনের সঙ্গে থাকা তার দুই বন্ধু মানিক ও রাহাত এবং তাকে বাঁচাতে গিয়ে বাবা লোকমানও গুরুতর আহত হন। পুলিশ এ পর্যন্ত দুজনকে আটক করেছে।

যেভাবে ঘটল নৃশংসতা

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার মাহিন, মানিক ও রাহাত চট্টগ্রাম শহর থেকে এক আত্মীয়ের বাড়ি হয়ে ফিরছিল। চেঙ্গের ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয় একটি পক্ষ তাদের ধাওয়া করে। ভয়ে তারা পাশের একটি নির্মাণাধীন ভবনের ছাদে আশ্রয় নেয়। কিন্তু হামলাকারীরা সেখান থেকে তাদের জোর করে নামিয়ে এনে ব্রিজের ওপরই প্রকাশ্যে পেটাতে শুরু করে। নির্মম প্রহারে ঘটনাস্থলেই মাহিনের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত মানিক ও রাহাতকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

মাহিনের মা খতিজা আকতার বলেন, তাঁর ছেলে নির্দোষ। তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘আমি কি আমার সন্তান হত্যার বিচার পাব?’ ক্ষোভ ও হাতাশা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের খুনিদের ফাঁসি না হলে আমি নিজেই বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করব। এর দায় বিচারককে নিতে হবে।’

‘এক গ্লাস পানিও চাইল, দিতে পারিনি’

কান্নায় ভেঙে পড়ে নিহত মাহিনের ফুফু সুখি বেগম বলেন, ‘ব্রিজের ওপর যখন ছেলেটা ব্যথায় কাতরাচ্ছিল, তখন এক গ্লাস পানি চেয়েছিল। কিন্তু ওদের (হামলাকারী) হুমকিতে কেউ পানিটুকু দেওয়ার সাহস পায়নি। এই কষ্ট আমি কীভাবে সহ্য করব?’ তিনি দাবি করেন, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং এর সঙ্গে এলাকার শতাধিক মানুষ জড়িত।

মাহিনের সত্তরোর্ধ্ব দাদি সাজু বেগম সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেশী জানে আলম, তৈয়ব, রোমন, আজাদসহ আরও অনেকে মিলে আমার নাতিকে পিটিয়ে মেরেছে। আমি আল্লাহর কাছে তাদের বিচার চাই।’

ঘটনার খবর পেয়ে চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. সাইফুল ইসলাম সানতু, ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নজরুল ইসলাম ও ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূর আহমদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

ইউএনও মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সবাইকে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।’

ফটিকছড়ি থানার ওসি নূর আহমদ বলেন, ‘ইতিমধ্যে মামলায় দুজনকে আটক করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত মূল অভিযুক্তরা পালিয়েছে। হত্যাকাণ্ডের আসল কারণ উদ্‌ঘাটন এবং অভিযুক্ত সবাইকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।’