এ কেমন বর্বরতা! এ কেমন রক্তের টান! চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার হাইলধর ইউনিয়নে যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে, তা শুনে পাষাণও হয়তো কেঁদে উঠবে। সামান্য পূর্ব শত্রুতার জেরে আপন বড় ভাই আহমদ ছফা ও তার ছেলে রিটনের নির্মমতার শিকার হয়েছেন নাজিম উদ্দীন। গরু চুরির মতো জঘন্য এক মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তারা নাজিম উদ্দীনকে শুধু মারধরই করেনি, তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে পশুর মতো পিটিয়েছে।
আজ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) প্রতিটি নিঃশ্বাসের জন্য যুদ্ধ করছেন অসহায় নাজিম উদ্দীন। তার শরীরজুড়ে শুধু আঘাতের চিহ্ন নয়, তার আত্মাজুড়ে রয়েছে আপনজনের দেওয়া অবিশ্বাস্য বিশ্বাসঘাতকতার যন্ত্রণা।
সম্প্রতি এই ঘটনার একাধিক ভিডিও ফুটেজ একুশে পত্রিকার হাতে এসেছে, যা এই নির্মমতার চিত্রকে আরও স্পষ্ট করেছে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, নাজিম উদ্দীনকে মাটিতে ফেলে রাখা হয়েছে এবং তার বড় ভাই আহমদ ছফা ও ভাতিজা রিটনসহ আরও কয়েকজন মিলে লাঠি দিয়ে তাকে নির্দয়ভাবে পেটাচ্ছে। অন্য একটি সংক্ষিপ্ত ক্লিপে মারধরের পর নাজিম উদ্দীনকে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, এই পৈশাচিক দৃশ্যটি যখন ঘটছিল, তখন চারপাশে উৎসুক জনতার ভিড় ছিল। অনেকেই পৈশাচিক এই মারধরের দৃশ্য দেখছিল, কেউ কেউ তা মোবাইল ফোনে ধারণ করছিল, কিন্তু অসহায় নাজিমকে বাঁচাতে কেউ সেভাবে এগিয়ে আসেনি।
ঘটনার দিনের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন প্রত্যক্ষদর্শী, হাইলধর ইউনিয়নের সাত নম্বর ওয়ার্ডের চৌকিদার আব্দুর রহিম। তিনি জানান, গত রবিবার (২৬ অক্টোবর) সকালে রিটন তাকে ডেকে নিয়ে যায়। রিটন জানায়, মোজাফফর প্রকাশ কেনো নামে এক ব্যক্তি স্বীকার করেছে যে, নাজিম উদ্দীন গরু চুরির সাথে জড়িত।
আব্দুর রহিম বলেন, “রিটন আমাকে নিয়ে নাজিমকে ঘর থেকে ডেকে আনে সৈয়দ বাড়ীর মোড়ে। এরপরই তারা নাজিমকে দড়ি দিয়ে বাঁধতে শুরু করে। আমি চিৎকার করে বাধা দিয়েছিলাম, বলেছিলাম নাজিম এমন লোক নয়। আমার সাথে নাজিমের ভালো সম্পর্ক, আমি জানি সে চোর না। আসলে, নাজিম ওইদিন পাশের ফকির বাপের বাড়ীর মোহাম্মদ আলীর মায়ের মৃত্যুতে সেখানে ছিলেন রাত পর্যন্ত। কবর খনন এসব কাজে সহায়তা করেছিলেন। কিন্তু তারা আমার কোনো কথাই শোনেনি।”

আব্দুর রহিম কান্নাজড়িত কণ্ঠে আরও বলেন, “আমার চোখের সামনে তারা নাজিমকে এমনভাবে মারতে থাকলো, যা দেখে আমি সহ্য করতে পারিনি। এই দৃশ্য আমাকে এতোটা আঘাত করেছে যে, আমি এরপর ঠিকমতো নাওয়া-খাওয়া করতে পারছি না। তারা জেনেশুনেই উদ্দেশ্যমূলকভাবে নাজিমকে মেরেছে।”
কিন্তু এই মিথ্যা অপবাদের শুরু কোথায়? যার মুখে শুনে এই নির্মমতা, সেই মোজাফফর প্রকাশ কেনো যা বললেন, তা আরও ভয়ংকর। কেনো জানান, “আমাকে রিটন আর তার বাবা আহমদ ছফা ধরে নিয়ে গিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করে। তারা আমাকে মারতে মারতে বলে, ‘তুই নাজিমের নাম বল, বললেই তোকে ছেড়ে দেব। না হলে মেরে পুলিশে দিব।’ প্রাণের ভয়ে, মারের চোটে আমি নাজিমের নাম বলতে বাধ্য হয়েছি। নাজিম ভাই ভালো মানুষ। নাজিমের ভাই-ভাতিজা আমাকে দিয়েই মিথ্যা বলিয়েছে।”
এই পরিকল্পিত নির্মমতার নেপথ্যের সাক্ষী, মোজাফফর প্রকাশ কেনোর একটি ভিডিও বক্তব্যও এই ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। আহত অবস্থায় ধারণ করা সেই ভিডিওতে কেনো সরাসরি অভিযোগ করেন, আহমদ ছফা, রিটন ও তাদের আরেক সঙ্গী নুরুচ্ছফা তাকে পরিকল্পনা করে মারধর করে। কেনো স্পষ্টই জানান, নিজের জীবন বাঁচানোর জন্যই তিনি ভয়ে নাজিমের নাম বলতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বলেন, হামলাকারীরা তাকে মারতে মারতে বলে নাজিমের নাম বল, না হলে প্রাণে মেরে ফেলবে। মোজাফফর আরও অভিযোগ করেন, এই চক্রটি তার বাড়িতে গিয়ে ভাঙচুর করেছে এবং তার পরিবারের নারীদেরও মারধর করার হুমকি দিয়েছে। তিনি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।
এই পৈশাচিকতার পেছনে ছিল পুরনো ঝামেলার ক্ষোভ। ভুক্তভোগী নাজিম উদ্দীনের বোন পারভিন আক্তার কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “আমার বড় ভাই আহমদ ছফা আর তার ছেলে রিটন আগের ঝামেলার জের ধরে আমার নিরীহ ভাইটাকে এভাবে মারলো! আমার ভাই নাজিম জীবনে কোনো চুরি-চামারির সাথে জড়িত ছিল না। একজন আপন মা-পেটের ভাই হয়ে আরেক ভাইকে কী করে এমনভাবে মারতে পারে!”
এদিকে, স্বামী নাজিম উদ্দীনের জন্য হাসপাতালের বারান্দায় আহাজারি করছেন স্ত্রী মুক্তা। তিন তিনটি অবুঝ সন্তানকে বুকে চেপে ধরে তিনি বলেন, “আমার স্বামী নাজিমকে সকালবেলা ঘুম থেকে ডেকে নিয়ে গেল তার ভাতিজা রিটন। আর ফিরে এলো রক্তাক্ত হয়ে। মানুষ সাপ দেখলে যেভাবে মারে সেভাবে মেরেছে। আজ এক সপ্তাহ ধরে আমি আমার ছোট ছোট তিনটা সন্তানকে নিয়ে বিচারের আশায় মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছি। আমার স্বামী আইসিইউতে মৃত্যুর সাথে লড়ছে।”
এদিকে, স্বামী নাজিম উদ্দীনের জন্য বিচারের দাবিতে আহাজারি করছেন তার স্ত্রী মুক্তা। সম্প্রতি ধারণ করা অন্য এক ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি তার তিন অবুঝ সন্তানকে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। মুক্তা আহাজারি করে বলেন, “আমার স্বামী আইসিইউতে মৃত্যুর সাথে লড়ছে, আর রিটন (আহমদ ছফার ছেলে) আমাদের হুমকি দিচ্ছে। তারা আমাকেও মেরে ফেলবে। আমি আমার সন্তানদের নিয়ে কোথায় যাবো? আমি এই খুনিদের বিচার চাই।” তার বড় ছেলেও কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবার ওপর এই নির্মমতার বিচার দাবি করে। এই পরিবারটি এখন কেবল নাজিম উদ্দীনের জন্যই নয়, নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়েও চরম শঙ্কায় রয়েছে।
বিচারের আশায় থানায় গিয়েও যেন আরেক দফা হতাশ হতে হয়েছে পরিবারটিকে। স্ত্রী মুক্তা জানান, তিনি আনোয়ারা থানায় গিয়েছিলেন, কিন্তু ওসি মনির হোসেন তাদের আদালতে মামলা করার পরামর্শ দিয়েছেন।
যখন একজন মানুষ আপন ভাইয়ের নির্যাতনে হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায়, তখন বিচার পাওয়ার এই দীর্ঘসূত্রতার পরামর্শ তাদের হতাশাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে আনোয়ারা থানার ওসি মনির হোসেন জানান, তিনি ভুক্তভোগী নাজিম উদ্দীনের পরিবারকে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি আরও অনুরোধ করেন, এই ঘটনা নিয়ে যেন কোনো সংবাদ প্রকাশিত না হয়।
নাজিম উদ্দীনের স্ত্রী মুক্তা আর বোন পারভিন আক্তারের একটাই প্রশ্ন— আহমদ ছফা আর রিটনের এই নির্মমতার বিচার কি তারা পাবেন? তিনটি ছোট সন্তান কি তাদের বাবাকে আবার সুস্থ অবস্থায় ফিরে পাবে?