শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

ভোটের আগে ঐক্য হবে তো আনোয়ারা বিএনপিতে?

জিন্নাত আয়ুব | প্রকাশিতঃ ১৫ নভেম্বর ২০২৫ | ৬:০৯ অপরাহ্ন


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ডামাডোল বাজতে শুরু করলেও চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে ভিন্ন এক উত্তাপে পুড়ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নির্বাচনের প্রস্তুতি ছাপিয়ে দলীয় কোন্দল এখন সব আলোচনার কেন্দ্রে। সাবেক সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণার পর থেকেই এই অস্থিরতা তীব্র আকার ধারণ করেছে; মনোনয়নবঞ্চিত লায়ন হেলাল উদ্দিনের অনুসারীরা প্রার্থী বদলের দাবিতে রাজপথ উত্তপ্ত করে রেখেছেন।

একদিকে সরওয়ার জামাল নিজামের অনুসারীরা ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের পক্ষে প্রচারণায় নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, অন্যদিকে হেলাল উদ্দিনের সমর্থকেরা প্রতিদিনই বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করছেন। এই দুই ধারার প্রকাশ্য সংঘাতে আনোয়ারা-কর্ণফুলীর রাজনীতিতে অচলাবস্থা সৃষ্টির পাশাপাশি জনমনেও ভোগান্তি বাড়িয়েছে।

দলীয় সূত্রমতে, গত ৩ নভেম্বর বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামকে চট্টগ্রাম-১৩ আসনের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই ঘোষণার পরপরই মনোনয়নপ্রত্যাশী চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব লায়ন হেলাল উদ্দিনের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।

এই অসন্তোষের সবশেষ বিস্ফোরক বহিঃপ্রকাশ ঘটে গত বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) সন্ধ্যায়। এদিন সরওয়ার জামাল নিজামের মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে শত শত বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মী কাফনের কাপড় গায়ে জড়িয়ে মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন।

নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সরওয়ার জামাল নিজাম দলের হাইকমান্ড ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ‘ভুল বুঝিয়ে’ এবং ‘সুকৌশলে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে’ মনোনয়ন ভাগিয়ে নিয়েছেন।

বিক্ষুব্ধদের দাবি, সরওয়ার জামাল নিজাম ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ এবং ‘সুবিধাভোগী’। তারা অভিযোগ করেন, গত ১৭ বছরে দলের কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম বা মিছিল-মিটিংয়ে তাকে দেখা যায়নি, এমনকি আনোয়ারা-কর্ণফুলীর তরুণ কর্মীরাও তাকে চেনেন না। তাদের ভাষায়, স্বৈরশাসনামলে তিনি বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় না থেকে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে মনোযোগী ছিলেন।

দলের জন্য ‘নিবেদিত ও ত্যাগী’ নেতাদের বঞ্চিত করায় কর্মীদের হৃদয়ে ‘রক্তক্ষরণ’ হচ্ছে উল্লেখ করে তারা এই ক্ষোভের প্রতিফলন ঘটাতে রাস্তায় নেমেছেন বলে জানান।

বৃহস্পতিবারের মশাল মিছিলটি কালাবিবির দিঘি মোড় থেকে শুরু হয়ে প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে কর্ণফুলী টানেলের মুখে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা প্রায় এক ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে রাখেন। এ সময় তারা সরওয়ার জামাল নিজামের কুশপুত্তলিকা দাহ করেন এবং তার ছবি সম্বলিত ব্যানার-ফেস্টুনে আগুন ধরিয়ে দেন।

এই পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে মনোনয়নবঞ্চিত নেতা লায়ন হেলাল উদ্দিন সরাসরি বিক্ষোভের দায় না নিলেও কর্মীদের অনুভূতির প্রতি একাত্মতা পোষণ করেন। তিনি বলেন, “দলের সর্বস্তরের নেতা–কর্মীরা দলের কাছে মনোনয়ন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন এতটুকু জানি। তবে এসব করার পক্ষে আমি নই। নেতাকর্মীদের দুঃসময়ে আমি পাশে ছিলাম, সুসময়েও থাকব—এটাই তারা বুঝতে পেরেছে। নেতাকর্মীরাতো জানে কে তাদের পাশে ছিল আর কে ছিল না।”

এক পক্ষের এই তীব্র আন্দোলনের মুখে বসে নেই মনোনীত প্রার্থীর সমর্থকেরাও। পরদিন শুক্রবার (১৪ নভেম্বর) বিকালেই সরওয়ার জামাল নিজাম সমর্থিত আনোয়ারা উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের একাংশ এই মশাল মিছিল ও বিক্ষোভের প্রতিবাদে পাল্টা মিছিল বের করে।

পাল্টাপাল্টি এই বিক্ষোভের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম-১৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম তার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি বলেন, “আমি প্রতিহিংসার রাজনীতি করি না। কখনো চাঁদাবাজি করিনি, অন্য কাউকেও চাঁদাবাজি করতে দেবো না।”

মনোনয়ন পাওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরে সাবেক এই সংসদ সদস্য আরও বলেন, “তারেক রহমান এমনি এমনি আমাকে মনোনয়ন দেননি—আমি যোগ্য বলেই আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।”

নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে এসে প্রধান দুই মনোনয়নপ্রত্যাশীর অনুসারীদের এমন প্রকাশ্য বিভাজন ও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে দলের তৃণমূলের কর্মীরা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। স্থানীয় সাধারণ মানুষ আশা করছেন, দলীয় এই বিবাদ দ্রুত মিটিয়ে বিএনপি ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাবে, অন্যথায় ভোটের মাঠে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।