শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

মানবতাবিরোধী অপরাধ: মৃত্যুদণ্ডই কি পাচ্ছেন শেখ হাসিনা?

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১৭ নভেম্বর ২০২৫ | ৯:৪২ পূর্বাহ্ন


গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার দুই সহযোগীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার রায় আজ (সোমবার) ঘোষণা করবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

শেখ হাসিনা (৭৮) ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল পলাতক থাকলেও মামলার অপর আসামি সাবেক পুলিশ প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন কারাগারে রয়েছেন।

সকাল ১১টায় আদালতের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউটর গাজী মনোয়ার হোসেন তামিম।

আসামিদের বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি অভিযোগ এনেছে প্রসিকিউশন, যার মধ্যে হত্যা প্রতিরোধে ব্যর্থতাও রয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড চেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।

এই রায়টি হবে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত নৃশংসতার ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়।

মামলার বৃত্তান্ত ও সাক্ষ্য

আসামিদের মধ্যে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে আছেন বলে ধারণা করা হয়। তিনি ট্রাইব্যুনালের আদেশে দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। আসাদুজ্জামান খান কামালও পলাতক।

তবে, চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দোষ স্বীকার করেছেন এবং রাষ্ট্রসাক্ষী হয়েছেন। ২০১০ সালে ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর এই প্রথম কোনো আসামি রাষ্ট্রসাক্ষী হলেন।

প্রসিকিউটররা আদালতকে তিন আসামির সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে বিতরণের আর্জি জানিয়েছেন। তবে আসামিপক্ষ খালাসের আশা প্রকাশ করেছে। শেখ হাসিনা তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মোর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ গত ১৩ নভেম্বর রায়ের জন্য ১৭ নভেম্বর দিন ধার্য করেন।

গত বছরের অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দায়ের হলে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তদন্ত শুরু করে এবং চলতি বছরের ১২ মে প্রধান প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়।

প্রসিকিউশন ৮,৭৪৭ পৃষ্ঠার নথিপত্র ও প্রমাণসহ ১৩৫ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দাখিল করে। গত ১ জুন ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়ে বিচার শুরুর আদেশ দেন। ১০ জুলাই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।

৪ আগস্ট প্রথম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে বিচারকাজ শুরু হয়। তালিকাভুক্ত ৮১ জন সাক্ষীর মধ্যে তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ ৫৪ জন সাক্ষ্য দেন, যাদের মধ্যে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনও রয়েছেন।

অভিযোগসমূহ

আসামিদের বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথম অভিযোগে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের সশস্ত্র কর্মীদের দ্বারা সংঘটিত হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নির্যাতন ও অন্যান্য অমানবিক কাজে সহায়তা, প্ররোচনা, সম্পৃক্ততা এবং তা প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগ আনা হয়েছে।

দ্বিতীয় অভিযোগে, ছাত্র বিক্ষোভকারীদের দমাতে প্রাণঘাতী অস্ত্র, হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহারের আদেশের অভিযোগ রয়েছে, যেখানে আসামিদের ঊর্ধ্বতন হিসেবে দায়বদ্ধ করা হয়েছে।

তৃতীয় অভিযোগটি ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সায়েদকে হত্যার ঘটনায় আদেশ প্রদান, প্ররোচনা ও সম্পৃক্ততা সংক্রান্ত।

চতুর্থ অভিযোগে, ৫ আগস্ট রাজধানীর চাঁনখারপুলে ছয়জন নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীকে সরাসরি আদেশের মাধ্যমে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।

পঞ্চম অভিযোগে, পাঁচজন বিক্ষোভকারীকে গুলি করে হত্যা ও অন্যকে আহত করার পর পাঁচটি মরদেহ ও একজন জীবন্ত বিক্ষোভকারীকে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় সম্পৃক্ততা ও প্ররোচনার অভিযোগ রয়েছে।

রায় ও আপিল প্রক্রিয়া

প্রসিকিউটর গাজী মনোয়ার হোসেন তামিম জানান, আইন অনুযায়ী, পলাতক আসামি আপিল করার অধিকার পাবেন না।

তিনি জানান, কোনো দণ্ডিত ব্যক্তিকে আপিল করতে হলে তাকে অবশ্যই গ্রেপ্তার হতে হবে বা আত্মসমর্পণ করতে হবে। রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল বিভাগে আপিল করতে হয় এবং আইন অনুযায়ী আপিল বিভাগকে ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে হবে।

এদিকে, গতকাল বরিশালে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, সরকার ট্রাইব্যুনালের রায় বিলম্ব না করে কার্যকর করবে।

ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত অনুমোদনের সাপেক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি চ্যানেলগুলোতে এই রায় সরাসরি সম্প্রচারের কথা রয়েছে।

উল্লেখ্য, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আইসিটিতে আরও তিনটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে দুটি গুম সংক্রান্ত এবং একটি ২০১৩ সালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড বিষয়ক। আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধেও গুমের দুটি মামলা রয়েছে।