শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

‘একটাও ছাড়ব না’: শিক্ষার্থীদের হত্যার সেই নির্দেশেই হাসিনার মৃত্যুদণ্ড

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১৮ নভেম্বর ২০২৫ | ৪:৩২ অপরাহ্ন


ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অবস্থান নির্ণয়ে ড্রোন ব্যবহার এবং তাদের হত্যার উদ্দেশ্যে হেলিকপ্টার ও প্রাণঘাতী অস্ত্র (লেথাল উইপেন) ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে উঠে এসেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে শেখ হাসিনার টেলিফোন আলাপের অডিও রেকর্ড পর্যালোচনা করে ট্রাইব্যুনাল এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঐতিহাসিক রায়ে সোমবার শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড এবং রাজসাক্ষী হওয়ায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল ঘোষিত রায়ে উল্লেখ করেছেন, শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন পরস্পর যোগসাজশে ও সহযোগিতায় যৌথভাবে এই নৃশংসতা ঘটিয়েছেন।

ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছে, তাপস ও ইনুর সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথন-সংক্রান্ত পেনড্রাইভ ও সিডি সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং বিশেষজ্ঞদের মতে এসব কথোপকথন সঠিক বা ‘জেনুইন’। এগুলো এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করা নয়।

রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের সাক্ষ্যে উন্মোচিত হয় যে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব জাহাংগীর, এসবি প্রধান, ডিবি প্রধান, র‍্যাব মহাপরিচালক, এনটিএমসি প্রধানসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি ‘কোর কমিটি’ গঠিত হয়েছিল। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাইয়ের পর প্রতি রাতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসায় তারা বৈঠকে বসতেন এবং সেখান থেকেই শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী ড্রোন ও লেথাল উইপেন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শেখ হাসিনা লেথাল উইপেন ব্যবহারের নির্দেশ দিলে অতিরিক্ত ডিআইজি জোয়ারদার সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং এই বার্তা সারা দেশের পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।

ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণ করে বলেছে, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও জনগণের বিরুদ্ধে অপারেশনটি অভিযুক্তরা ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’ বা যৌথ অপরাধমূলক উদ্যোগ হিসেবে পরিচালনা করেন। শেখ হাসিনার আদেশের পাশাপাশি আসাদুজ্জামান খান ও আবদুল্লাহ আল মামুনের তত্ত্বাবধানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীরা সারা দেশে আন্দোলনকারীদের ওপর আক্রমণ চালায়। হেলিকপ্টার ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের ফলে প্রায় ১৫০০ লোকের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে ঢাকার চানখাঁরপুল ও আশুলিয়ার ঘটনাগুলো উল্লেখযোগ্য।

রায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য মাকসুদ কামালের সঙ্গে গত বছরের ১৪ জুলাই শেখ হাসিনার কথোপকথনের প্রসঙ্গও টেনে আনা হয়। সেখানে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “রাজাকারদের তো ফাঁসি দিয়েছি, এবার তোদেরও তাই করব। একটাও ছাড়ব না, আমি বলে দিচ্ছি।” ট্রাইব্যুনাল মনে করে, শেখ হাসিনার এমন উসকানিমূলক বক্তব্য তার দলের কর্মী ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে প্ররোচিত করেছে এবং কার্যত আন্দোলনকারীদের হত্যা ও নির্মূল করার আদেশ হিসেবে কাজ করেছে।

শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনের পরিবর্তে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘রাজাকার’ সম্বোধন করে যে অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন, তা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে কারাদণ্ড প্রদান করা হলো।