শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের চেয়েও নাজুক বাংলাদেশের ব্যাংক খাত

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ৯:৪২ পূর্বাহ্ন


রাশিয়ার সঙ্গে চার বছর ধরে পুরোদস্তুর যুদ্ধে লিপ্ত ইউক্রেন। অথচ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির চেয়েও বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের অবস্থা এখন বেশি নাজুক। ইউক্রেনের ব্যাংক খাতে যেখানে খেলাপি ঋণের হার ২৬ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে এই হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬ শতাংশে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও গবেষণা সংস্থার তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, খেলাপি ঋণের এই হার বর্তমানে বিশ্বে সর্বোচ্চ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। গত বছরের ডিসেম্বরেও এই হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র ৯ মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা, যা নজিরবিহীন।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চরম অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশগুলোর তুলনায়ও বাংলাদেশের পরিস্থিতি খারাপ। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে থাকা তিউনিসিয়ায় খেলাপি ঋণের হার ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। ইসরায়েলের হামলায় বিধ্বস্ত লেবাননে এই হার ২৪ শতাংশের নিচে। এমনকি মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় থাকা রাশিয়ার খেলাপি ঋণের হার মাত্র ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে। দেউলিয়া ঘোষণা করা শ্রীলঙ্কায় খেলাপি ঋণের হার ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। পাকিস্তানে ৭ দশমিক ৪, নেপালে ৪ দশমিক ৪ এবং ভারতে এই হার মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, অতীতে ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ ‘কার্পেটের নিচে’ চাপা দিয়ে রাখত। অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে প্রভাবশালীদের দেওয়া ঋণ খেলাপি দেখানো হতো না। গত এক বছরে সেই চাপা দেওয়া ঋণ বেরিয়ে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটনের চেষ্টা করেছে বলেই খেলাপি ঋণের এই হার দেখা যাচ্ছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, খেলাপি ঋণের হার ৩৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়া মোটেই অপ্রত্যাশিত নয়। গত দেড় দশক ধরে চলা অনিয়ম-দুর্নীতির ফল এটি। এতদিন তথ্য গোপন করা হলেও এখন তা প্রকাশ করতে বাধ্য হচ্ছে ব্যাংকগুলো। তবে আগামীতে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।

অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেওয়া পদক্ষেপগুলো ক্ষতের তুলনায় যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে অন্যরা শিক্ষা নিত। কিন্তু এখনো সে ধরনের পদক্ষেপ দেখা যায়নি। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আগামী দুই মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দৃশ্যমান কিছু করে দেখাতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণে ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন ঘাটতিও চরমে পৌঁছেছে। সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকায়। অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ আমানত এখন ঝুঁকির মুখে।

উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সময় দেশে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। গত দেড় দশকে বাছবিচারহীন ঋণ বিতরণ ও অনিয়মের কারণে এই অংক এখন পাহাড়সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে।