রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

‘মা পরোটা বানিও’—ছেলের সেই শেষ আবদার এখন শুধুই দীর্ঘশ্বাস

মাইজভান্ডারে ইবাদত বন্দেগি শেষে ফিরছিলেন বাড়ি, পথেই থামল স্বপ্নবাজ নয়নের যাত্রা
রবিউল হোসেন | প্রকাশিতঃ ৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ২:৪১ অপরাহ্ন


ভোরের কুয়াশা তখনও কাটেনি। চট্টগ্রামের পটিয়ার বাথুয়া গ্রামের একটি রান্নাঘরে ব্যস্ত হাতে ছেলের জন্য পরোটা ভাজছিলেন মা। আগের রাতেই ফোনে আবদার করেছিল বড় ছেলে নয়ন ইসলাম, “মা, সকালে বাড়ি আসছি, তোমার হাতের পরোটা খাব।”

ছেলের পছন্দের নাস্তা তৈরি করে পথের পানে চেয়ে ছিলেন মা। ঘড়ির কাঁটা গড়িয়েছে, পরোটা জুড়িয়ে ঠান্ডা হয়েছে, কিন্তু যে মানুষটির জন্য এই আয়োজন—সেই নয়ন আর ফিরে আসেননি। ফিরেছে কেবল তার নিথর দেহ। মাত্র কয়েক মুহূর্তের এক অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় তছনছ হয়ে গেছে একটি পরিবারের স্বপ্ন, মায়ের বুকচাপা কান্না আর হাহাকারে এখন ভারী পটিয়ার বাতাস।

শুক্রবার সকালে পটিয়া উপজেলার জিরি ফকিরা মসজিদ এলাকায় এক মর্মান্তিক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তরুণ ব্যাংক কর্মকর্তা নয়ন ইসলাম। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, বাড়ির সীমানায় পৌঁছেও ঘরে ঢোকা হলো না তার।

স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পটিয়া উপজেলা আশিয়া ইউনিয়নের বাথুয়া গ্রামের মজিবুর রহমানের বড় ছেলে নয়ন ইসলাম পেশায় ছিলেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-র চকবাজার শাখার মেসেঞ্জার বা পিয়ন। সংসারের হাল ধরা এই তরুণ বৃহস্পতিবার অফিস শেষ করে বন্ধু রবিউল আকবরকে সঙ্গে নিয়ে ফটিকছড়ির মাইজভান্ডার দরবার শরীফ জিয়ারতে গিয়েছিলেন। সারারাত ইবাদত বন্দেগি শেষে শুক্রবার সকালেই বাড়ির পথ ধরেছিলেন।

কিন্তু নিয়তি যে পথের বাঁকে ওঁত পেতে ছিল, তা কে জানত? বাড়ির খুব কাছাকাছি যখন পৌঁছে গেছেন, ঠিক তখনই ঘটে বিপত্তি। তীব্র শীত থেকে বাঁচতে গায়ে জড়ানো কাপড়টি হঠাৎ বাতাসের ঝাপটায় চোখের সামনে চলে আসে। মুহূর্তেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মোটরসাইকেলটি সজোরে আছড়ে পড়ে রাস্তার পাশের গাছের সঙ্গে। দুমড়েমুচড়ে যায় বাইকটি। গুরুতর আহত হন নয়ন ও তার বন্ধু রবিউল আকবর।

স্থানীয়রা দ্রুত তাদের উদ্ধার করে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে দায়িত্বরত চিকিৎসক লিটন চৌধুরী নয়নকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগে মায়ের হাতের সেই পরোটা আর খাওয়া হলো না তার।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক লিটন চৌধুরী জানান, হাসপাতালে আনার আগেই নয়নের মৃত্যু হয়েছিল। অন্যদিকে, আশিয়া গ্রামের মো. মুছার ছেলে এবং নয়নের বন্ধু রবিউল আকবরের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।

শুক্রবার সকালে বাথুয়া গ্রামে নয়নের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। যে উঠানে মোটরসাইকেল থামিয়ে মায়ের কাছে ছুটে যাওয়ার কথা ছিল নয়নের, সেখানে এখন স্বজনদের ভিড়। সন্তানের মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকেই বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা। তার আহাজারিতে উপস্থিত কেউই চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না। বিলাপ করে তিনি খুঁজছেন তার আদরের ধনকে, যে কি না একটু আগেই নাস্তা খাওয়ার বায়না করেছিল।

নয়নের চাচাতো ভাই নাছিম ইভান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন সেই শেষ কথোপকথনের কথা। তিনি বলেন, ‘‘নয়ন ভাই ছিলেন আমাদের পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস। তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় তিনি, ছোট দুই ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ থেকে শুরু করে সংসারের সব দায়িত্ব ছিল তার কাঁধে। আসার সময়ও মাকে ফোন দিয়ে পরোটা বানাতে বলেছিলেন। মা ঠিকই পরোটা বানিয়ে অপেক্ষা করছিলেন, কিন্তু ভাই আর এলেন না।’’

নয়নের এমন অকাল মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার কর্মস্থলেও। ইসলামী ব্যাংক চকবাজার শাখার ম্যানেজার অপারেশন্স ওয়াহেদ মোরশেদ খবর পেয়ে ছুটে আসেন সহকর্মীর বাড়িতে। তিনি বলেন, ‘‘নয়ন কেবল একজন সহকর্মী ছিলেন না, তিনি ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী। বৃহস্পতিবারও আমরা একসঙ্গে অফিস করেছি। তার পেশাদারিত্ব ছিল অনুকরণীয়।’’

নয়নের চাচা ও আশিয়া ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ মো. মাহবুব জানান, আচার-ব্যবহারে নয়ন ছিলেন গ্রামের সবার প্রিয়। বৃহস্পতিবার সকালে জীবিকার সন্ধানে বাড়ি থেকে বের হওয়া ছেলেটি যে আর জীবিত ফিরবে না, তা কেউ কল্পনাও করেনি। শুক্রবার জুমার নামাজের পর তাকে দাফন করা হবে বলে জানান তিনি।

একটি দুর্ঘটনা কেবল একটি প্রাণ কেড়ে নেয় না, কেড়ে নেয় একটি পরিবারের একমাত্র অবলম্বনকেও। শীতের সকালে মায়ের হাতের গরম পরোটা খাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ফেরা নয়ন এখন শুয়ে আছেন হিমশীতল কফিনে। পেছনে ফেলে গেছেন বৃদ্ধ মা-বাবা, ছোট দুই ভাই এবং টেবিলে সাজানো সেই জুড়িয়ে যাওয়া নাস্তা—যা আর কোনোদিন তার স্পর্শ পাবে না।